ভারতকে বার্তা দিতে চায় বিএনপি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতীয় পণ্য বর্জনের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করলেও রাজনৈতিকভাবে সেই আন্দোলনে যুক্ত করতে চায় না বিএনপি। কারণ প্রতিবেশী প্রভাবশালী দেশ ভারতকে বিব্রত করার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে চায় দলটি। তবে বিএনপি ভারত সরকারকে এই বার্তা দিতে চায় যেন তারা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনোভাব বিবেচনায় নেয়।

গতকাল বুধবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য দেশ রূপান্তরকে এসব কথা বলেন। তাদের মতে, ভারতকে বুঝতে হবে, দেশের জনগণ মনে করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ জনগণের ‘ভোটাধিকার হরণ’ করেছে, কথা বলার স্বাধীনতা ‘কেড়ে’ নিয়েছে, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের ‘খুন, গুম ও নির্যাতন’ করছে। বাংলাদেশের জনগণ মনে করছে, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আসতে ‘সহযোগিতা’ করেছে ভারত সরকার। এসব কারণে জনগণ শুধু আওয়ামী লীগের ওপর নয়, ভারতের ওপরও ক্ষুব্ধ। ফলে তারা ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক দিয়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভারতীয় পণ্য বর্জনের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে আন্দোলন চলছে, সেটা দেশের সাধারণ মানুষ করছে। দেশের মানুষ কি করবে না করবে, তা তো আমরা ঠিক করে দিতে পারি না। এটা আমাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়।’  

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে খোদ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীরা ভারতকে জড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন। সরাসরি বলছেন যে ভারত না থাকলে তারা ক্ষমতায় আসতে পারতেন না। ভারত সরকারের উচিত এ বিষয়ে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করা। ভারতের বক্তব্য জনগণ না পেলে মনে করবে আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্য সঠিক। তাতে জনগণ আরও বেশি ভারতবিদ্বেষী হয়ে উঠবে।’ 

এর আগে ২০ মার্চ নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলমান ভারতীয় পণ্য বর্জনের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন। সংবাদ সম্মেলনের পর কার্যালয়ের নিচতলায় নিজের ব্যবহার করা ভারতীয় চাদর ছুড়ে ফেলে দিয়ে বিএনপির ভারত বিরোধিতার বিষয়টি আলোচনায় নিয়ে আসেন। রিজভীর পর বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুকও ভারতীয় পণ্য বর্জনের বিষয়ে বক্তব্য দেন।

গত সোমবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির ভার্চুয়াল সভা হয়। বৈঠকে থাকা দলটির এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভারতীয় পণ্য বর্জনের বিষয়ে এক সদস্য আলোচনার সূত্রপাত করেন। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাকে জনগণের একটি অংশ সাড়া দিচ্ছে। বিএনপির অবস্থান কী হতে পারে। মানুষের আগ্রহ থাকায় দলের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া দরকার। মতামত রাখতে গিয়ে আরেক সদস্য বলেন, ‘ভারত আমাদের বন্ধুপ্রতিম ও প্রভাবশালী দেশ। জনগণের ক্ষোভ থাকতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক দল হিসেবে কৌশলগত কারণে আমাদের সতর্ক অবস্থান নিতে হবে। পাশাপাশি জনগণের সেন্টিমেন্টের কথা ভারতকে ভাবতে হবে। বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচনের আগে ভারত সরকারের কাছে অনুরোধ রেখেছিলাম তারা যেন জনগণের পক্ষে থাকে। কিন্তু নির্বাচনের পর সরকারের মন্ত্রীরা যেভাবে বক্তব্য দিচ্ছেন, তাতে মনে হচ্ছে প্রতিবেশী দেশ ভারত জনগণের পক্ষে অবস্থান না নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শীর্ষ এক নেতা বলেন, অধিকাংশ সদস্যই মত দিয়ে বলেছেন, জনগণ মনে করছে, আওয়ামী লীগকে এতটা ‘বেপরোয়া’ এবং ‘দুর্বিনীত’ করতে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে ‘সহযোগিতা’ করছে ভারতের ক্ষমতাসীন সরকার ও রাষ্ট্রযন্ত্র। এতে বিএনপি প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এটি যেহেতু সামাজিক আন্দোলন, তাই এতে সম্পৃক্ত হওয়া সঠিক হবে না। তবে বাংলাদেশের রাজনীতি, সীমান্ত হত্যাসহ নানা ইস্যুতে প্রতিবেশী ভারতের নেতিবাচক ভূমিকার সমালোচনা দেশের স্বার্থে অব্যাহত রাখা উচিত। দলীয় অবস্থান থেকে কীভাবে ভারতের সমালোচনা করা যায়, তার একটি কৌশল ঠিক করার কথাও ভেবে দেখার কথা বলেছেন নেতারা।

ভারত বিরোধিতার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে এক নেতা বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর ভারতের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক স্থাপনের আশায় নানা মহলের পরামর্শে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নির্দেশে দেশটির সমালোচনা বন্ধ করেছিল বিএনপি। দলটির নেতারা মনে করেছিলেন, দলীয় প্রধানের ওই সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না তার বড় প্রমাণ ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর ও ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচন। ২০১৪ সালের মতো পরবর্তী দুটি নির্বাচনেও ভারত ক্ষমতাসীন আওয়ীমী লীগের পক্ষেই ছিল। গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান না নেওয়ায় ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের পর ভারতের বিষয়ে বিএনপির নেতাকর্মী, সমর্থক এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে একধরনের ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। সেখান থেকেই কিছু রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি ভারতীয় পণ্য বর্জন আন্দোলন শুরু করে।