বিষণ্ন বেইলি রোডে ব্যবসায় ধস

নাটক সরণি হিসেবে পরিচিত রাজধানীর বেইলি রোড। মাসখানেক আগেও সড়কটির শান্তিনগর মোড় থেকে ভিকারুননিসা নূন স্কুলের মোড় পর্যন্ত রাস্তার দুপাশ জুড়ে থাকা দোকান, রেস্তোরাঁ ও বিপণিবিতান ছিল ক্রেতার ভিড়ে জমজমাট। তবে শুধু কেনাকাটা বা খাবারের জন্যই মানুষ যে সেখানে যেত তা নয়; গল্প, আড্ডা, মিটিং, পাত্রপাত্রী দেখা, প্রেমিক-প্রেমিকাদের সাক্ষাৎ করার জনপ্রিয় স্থানও ছিল এই বেইলি রোড। কিন্তু ব্যস্ততম বেইলি রোডে এখন আর নেই আগের মতো ভিড় আর উৎসবমুখর পরিবেশ। ২৯ ফেব্রুয়ারি সেখানকার গ্রিন কোজি কটেজ ভবনে লাগা আগুনে ৪৬ জনের প্রাণহানির পর পাল্টে গেছে চিরচেনা দৃশ্যপট।

ভয়াবহ ওই অগ্নিকাণ্ডের প্রায় এক মাস হতে চললেও আলো ঝলমলে বেইলি রোড এখনো অনেকটাই নি®প্রাণ। আগুন আতঙ্কে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বেইলি রোডে কেউ পা মাড়াচ্ছেন না। নেই আগের মতো ক্রেতার ভিড় ও হাঁকডাক, যেন বিষণ্ন বেইলি রোড। যার প্রভাবে সেখানকার দোকান, রেস্তোরাঁ ও বিপণিবিতানের বেচাকেনায় ভাটা পড়েছে। এসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লোকসমাগম অনেকটাই কম। বিক্রেতারা বলছেন, অগ্নিকাণ্ডে শুধু গ্রিন কোজি কটেজই পুড়েনি। পুড়েছে সব ব্যবসায়ীর কপাল। তবে জীবন থেমে থাকে না। তাই ব্যবসায়ীরাও চেষ্টা করছেন ঘুরে দাঁড়ানোর।

সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিবছরের মতো বেইলি রোডের রেস্তোরাঁ ও ইফতারসামগ্রীর দোকানগুলোয় তেমন ক্রেতা নেই। প্রতিবছরের চিরচেনা ভিড় আর উৎসবমুখর পরিবেশের পরিবর্তে এবার কিছুটা শান্ত ও অচেনা এক পরিবেশ। যারা নানা পদের ইফতারসামগ্রী নিয়ে হাজির হতেন, তারা বসেছেন মাত্র ১৫-২০ পদের খাবার নিয়ে। এখনো যারা সেখানে যাচ্ছেন, ক্ষণিকের জন্য হলেও থমকে দাঁড়ান সেই পোড়া ভবনটির সামনে।আগুনে ৪৬ জনের মৃত্যুর পর এখন বেইলি রোডে নিজেদের নিরাপদ মনে করছেন না লোকজন। তারা বলছেন, পরিবার নিয়ে এখন আর সেখানে যেতে চাচ্ছেন না তারা। আতঙ্ক কাজ করছে।

একই চিত্র বিপণিবিতানগুলোতেও। ঈদ ঘনিয়ে এলেও জমে ওঠেনি কেনাকাটা। বেইলি স্টার, বেইলি ফিয়েস্তা, টাঙ্গাইল শাড়িঘর, টাঙ্গাইল শাড়ি বিতান, প্যান্ট, থ্রি-পিস, টি-শার্ট সাজিয়ে বিক্রয়কর্মীরা অপেক্ষায় থাকলেও নেই ক্রেতা। তারা বলেন, অন্যান্য বছর ১০ রোজার পরে পোশাক বেচাকেনা জমজমাট হয়ে উঠত। এবার ১৫ রোজা পার হতে চললেও অলস সময় পার করতে হচ্ছে। মাঝেমধ্যে দু-একজন ক্রেতার দেখা মিললেও তাদের অধিকাংশই আগুন আতঙ্কে মার্কেটে খুব একটা বেশি সময় থাকছেন না।

বেইলি রোডের দোকানগুলোতে পাঞ্জাবি, ফতুয়া, থ্রি-পিসসহ বিভিন্ন পোশাকের বড় সংগ্রহ রয়েছে। সেখানে বাহারি নকশার পোশাকের মধ্যে সর্বনিম্ন ১ হাজার ৩০০ থেকে সর্বোচ্চ ৬ হাজার টাকার পাঞ্জাবি পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া হাফ সিল্ক শাড়ি ২ হাজার ৫৯৫-৫ হাজার, কটন ২ হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার, খাদিম ২ হাজার ২৯৫, কাতান ১ হাজার ৯৭০ থেকে ৩ হাজার ৩৭০, জর্জেট শাড়ি ২ হাজার থেকে ৬ হাজার এবং মসলিন ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ফ্যাশন হাউজ নকশী বাংলার ব্যবস্থাপক মাহফুজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রেস্তোরাঁয় খেতে আসা লোকজন আমাদের মূল ক্রেতা ছিল। প্রতিবছর ইফতারের পরপর তারা মার্কেটে চলে আসতেন। কিন্তু এ বছর অগ্নিকাণ্ডের আতঙ্কে ক্রেতা কম আসছেন। যারা আসছেন তারা না আসার মতোই বলা চলে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অন্য বছর ঈদবাজার উপলক্ষে যে কাপড় ওঠাতাম তার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বিক্রি হয়ে যেত। কিন্তু এবার ১৩ রোজা শেষ করেছি। মার্কেটে ক্রেতার দেখা নেই। যারা আসছেন তারাও তেমন একটা ঘুরেফিরে দেখছেন না। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে কর্মচারীদের বেতন দেওয়াই কঠিন হয়ে পড়বে।’

আরেকটি ফ্যাশন ব্র্যান্ড রিচম্যানের শোরুমের বিক্রয়কর্মী তমা বিশ্বাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ৪ বছর প্রতি রোজার ঈদে এখানে চাকরি করছি। কিন্তু এবারের মতো এতটা খারাপ পরিস্থিতি আর দেখিনি। অন্যান্য বছর এ সময় ক্রেতাদের ভিড় সামাল দেওয়াই কষ্টকর হয়ে যেত। কিন্তু এবার ক্রেতার কোনো চাপ নেই। আমরা অনেকটা অলস সময় পার করছি।’

ফ্যাশন ব্র্যান্ড অঞ্জন’সের শোরুমের ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের অনেক নিয়মিত ক্রেতাও পাশের ভবনে আগুন লাগায় এদিকে আসতে চাইছেন না। যারা আসছেন তারাও আগের চেয়ে কম সময় থাকছেন।’ তবে ঈদের আগে আগে ক্রেতার উপস্থিতি বাড়বে বলে আশাবাদী তিনি।

মার্কেটে আসা কয়েকজন ক্রেতার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তারা জানান, গ্রিন কোজি কটেজে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে বেইলি রোডে এলে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করে। কখন না আবার কোথায় আগুন লেগে যায়।

মেয়ের জন্য জামা কিনতে আসা মতিঝিল এলাকার বাসিন্দা তারিহ মাহবুব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ এলাকায় এলে গা ছমছম করে। কখন যেন কোথাও আগুন লেগে যায়। কদিন আগেই আগুনে পুড়ে ৪৬টি তাজা প্রাণ ঝরেছে। সেই ক্ষত এখনো তাজা। সেদিন চোখের সামনে কতগুলো মানুষকে আগুনে পুড়ে মরতে দেখেছি। সেই ভয় এখনো কাটেনি। মেয়েটা বায়না ধরেছে বলে রিস্ক (ঝুঁকি) নিয়ে মার্কেটে এসেছি। তবে এখানে এসে বারবার মনে হচ্ছে কখন বেরিয়ে যেতে পারব।’

বিপণিবিতান বেইলি ফিয়েস্তায় কে ক্র্যাফট নামে একটি দোকানে পাঞ্জাবি দেখছিলেন আমিনুল ইসলাম নামে এক ক্রেতা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ আগুন লাগে বেইলি রোডে। সেদিন কতগুলো মানুষ পুড়ে মারা গেছে। ঘটনার সময় তাদের বেঁচে ফেরার আকুতি অনুভব করতে গেলে অন্তরের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। ওই ঘটনার পর অনেক দিন এদিকে না এলেও ঈদ উপলক্ষে মার্কেট করতে এসেছি। তবে বেশি সময় মার্কেটে থাকতে ভয় হচ্ছে। আবার কখন না জানি আগুনের লেলিহান শিখা ধেয়ে আসে আমাদের দিকে।’