দুটি ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় ১৯৫ জনের প্রাণহানির পরও পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম, দোকান ও কারখানা সরেনি। বড় ধরনের প্রাণহানি না ঘটলেও আগুনের ঘটনাও থামেনি। ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সরকারের বিভিন্ন দপ্তর বিরোধিতা করলেও রাসায়নিকের ব্যবসা চলছে। উল্টো যারা কেরানীগঞ্জ বা অন্যত্র সরে গিয়েছিলেন, তারাও ফিরে এসেছেন। এখনো ছোট-বড় মিলে ২ হাজার ১৬৭টি রাসায়নিকের গুদাম, দোকান ও কারখানা অগ্নিঝুঁকি তৈরি করে পুরান ঢাকায় রয়ে গেছে।
২০১০ সালের ৩ জুন রাতে পুরান ঢাকার নিমতলীতে অগ্নিকা-ে মারা গেছে ১২৪ জন। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ ম্যানশনে আগুন লেগে মৃত্যু হয় ৭১ জনের। দুটি অগ্নিকা-ের কারণই রাসায়নিক। এ দুটি অগ্নিকা-ের পর গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। কমিটি প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে। ঘিঞ্জি এলাকা হিসেবে পরিচিত পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম, দোকান ও কারখানা উচ্ছেদ করতে সুপারিশ করেছে। সরিয়ে নিতে আশপাশের বিভিন্ন স্থানে জায়গায়ও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি।
সম্প্রতি রাসায়নিক কারখানাগুলো নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি বিশেষ বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে বলা হয়েছে, কতিপয় রাজনীতিবিদদের আশকারায় রাসায়নিকের ব্যবসায়ীদের পুরান ঢাকা থেকে সরানো যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে কিছু ব্যবসায়ীকে কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর করা হলেও তারা গোপনে আবার আগের স্থানে ফিরে আসছেন।
গত দুই মাসের ব্যবধানে পুরান ঢাকায় কয়েকটি বড় অগ্নিকা-ের ঘটনায় আবার নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। বিভিন্ন সময়ে তদন্ত কমিটির দাখিল করা প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিশেষ নির্দেশনাও মিলেছে। ঈদের পর কারখানা, দোকান ও গুদাম কেরানীগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জে স্থানান্তর করতে বিশেষ অভিযান চালাবে বলে পুলিশের একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে।
তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাসায়নিক পল্লীর কাজ এখনো শেষ হয়নি। বর্তমানে বালু ভরাট ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ চলছে। তারাও চান ঘিঞ্জি এলাকা থেকে ব্যবসা সরিয়ে নিতে।
পুরান ঢাকার চকবাজারের ইসলামবাগ, মিটফোর্ড সড়ক, শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী সড়ক, আরমানিয়ান স্ট্রিট, মাহুতটুলী, নিমতলীসহ বেশিরভাগ জায়গায় রাসয়ানিক কারখানা গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন বাসাবাড়িতে আছে শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত রাসায়নিকের দোকান ও গুদাম। ইসলামবাগেই কয়েকশ রাসায়নিক, পলিথিন ও প্লাস্টিক তৈরির কারখানা রয়েছে। ভবনের মালিকরা বেশি ভাড়া পাওয়ার লোভে বাসার পরিবর্তে গুদাম বা কারখানা হিসেবে ভাড়া দিচ্ছেন। অনেক স্থানে ভবনজুড়েই রয়েছে গুদাম।
অভিযোগ উঠেছে, রাসায়নিকের ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক নেতাদের বলয়ে থাকার কারণে তাদের সরানো যাচ্ছে না। এমনকি ব্যবসায়ীদের মধ্যে কেউ কেউ রাজনৈতিক নেতাও।
চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির পর সিটি করপোরেশন, শিল্প মন্ত্রণালয়, আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা, বিস্ফোরক পরিদপ্তরসহ বেশ কয়েকটি সংস্থার সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। যেসব কারখানা সরাতে হবে তার একটি তালিকাও মন্ত্রিসভায় জমা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) এক গবেষণায় এসেছে, পুরান ঢাকায় ২৫ হাজার রাসায়নিকের গুদাম, দোকান ও কারাখানা রয়েছে। এর মধ্যে ১৫ হাজার আছে বাসা-বাড়িতে। মাত্র আড়াই হাজার প্রতিষ্ঠানকে ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে সিটি করপোরেশন। বাকি ২২ হাজারের মতো প্রতিষ্ঠান অবৈধ। এগুলোতে ২০০ ধরনের ক্ষতিকর ও ঝুঁঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের ব্যবসা চলছে।
জানা গেছে, আবাসিক এলাকায় রাসায়নিকের কারখানা চালানো, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও গুদাম করা সম্পূর্ণ অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বৈধভাবে এ ধরনের ব্যবসা করতে গেলে সরকারের একাধিক সংস্থার অনুমোদন বাধ্যতামূলক। ফায়ার সার্ভিস, সিটি করপোরেশন, স্থানীয় থানা, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, শিল্প মন্ত্রণালয়সহ কমপক্ষে ছোট-বড় অন্তত ৯টি সরকারি দপ্তরের অনুমোদন নিতেই হয়। বৈধভাবে ওই সব দপ্তর থেকে ছাড়পত্র নেওয়াও কঠিন। সরকারের নিয়মনীতি মেনে আবাসিক এলাকায় এ ধরনের ব্যবসা করার কোনো সুযোগই নেই। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। পুরান ঢাকায় যুগ যুগ ধরে চলছে বিপজ্জনক এই ব্যবসা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চোখের সামনে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার লোকজনকে ম্যানেজ করে ব্যবসা চালানো হচ্ছে। বহুতল ভবনের নিচতলায় বিশাল গুদাম আর ওপরে মানুষের বসবাস এমন স্থাপনা রয়েছে অঢেল।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুরান ঢাকায় ছোট-বড় মিলে ২ হাজার ১৬৭টি রাসয়নিক কারখানা আছে বলে তারা তথ্য পেয়েছেন। এর আগে এ সংখ্যা অনেক কম ছিল। গোপনে ব্যাঙের ছাতার মতো কারখানা গড়ে তোলা হচ্ছে। তদন্ত কমিটির সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন না করা তাদেরই ব্যর্থতা। তিনি বলেন, একটি চক্রের কারণে কারখানা সরানো যাচ্ছে না। এবার সময় এসেছে কারখানাগুলো সরাতেই হবে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, পুরান ঢাকা থেকে সব ধরনের রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা সরানোর জন্য নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে সপ্তাহখানেক আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিশেষ বৈঠক করেছেন। ওই বৈঠকেই অবৈধ রাসায়নিক কারবারিদের বিরুদ্ধে ‘হার্ডলাইনে’ যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুরান ঢাকায় কোনো রাসায়নিক কারখানা থাকতে পারবে না। সরকার যেখানে কারখানা সরাতে বলেছে, সেখানেই নিতে হবে। পুরান ঢাকার রাসায়নিক গুদাম সরিয়ে নেওয়ার জন্য জায়গা দিয়েছে সরকার। বিগত সময়ে তদন্ত কমিটির দেওয়া সুপারিশ দ্রুত সময়ে বাস্তবায়ন করা হবে।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন বলেন, ‘পুরান ঢাকা এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানে আবার রাসায়নিকের দোকান, গুদাম ও কারখানা আছে। ব্যবসা করার ক্ষেত্রেও কোনো নিয়ম মানা হয় না। বিষয়টি আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে কারখানাগুলো সরাতে হবে। আর না হয় আবার বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।’
কিছুদিন আগে পুরান ঢাকার ইসলামবাগে টাইগার গলিতে ‘কমিশনার বিল্ডিং’ নামে একটি ভবনে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। ভবনটিতে রাসায়নিক ব্যবহার করে প্লাস্টিক রিসাইকেল করে গরুর পায়ের নিচে দেওয়ার রাবার ম্যাট তৈরি করা হতো। চারতলা ওই ভবনের বিভিন্ন ফ্লোরে প্লাস্টিক দানা ও রাসায়নিক দ্রব্য স্তূপ করা ছিল। যে কারণে ভবনে ঢুকতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের বেগ পেতে হয়েছে। ভবনটির পাশেই ছিল বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার।
এলাকার বেশ কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ওই এলাকায় প্রায় সব আবাসিক ভবনে কারখানার ছড়াছড়ি।
লালবাগ ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন মাস্টার মুস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, ভবনটিতে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। এখানে আশপাশে অসংখ্য লাগোয়া ভবন ও বাড়ি আছে। যদি এই আগুন ছড়িয়ে পড়ত বা বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার বিস্ফোরিত হলে ভয়াবহ অবস্থা হতো।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন করলে অগ্নিঝুঁকি কমে আসবে।