উদ্দেশ্যই ছিল ব্যাংক থেকে টাকা চুরি করা

রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে যেসব ব্যাংক দেওয়া হয়েছিল তার কোনোটাই ভালো করছে না। এসব ব্যাংকের উদ্দেশ্যই ছিল ব্যাংক থেকে টাকা চুরি করা। পদ্মা ব্যাংকের মতো এগুলোকে নাম বদলে ভালো করার চেষ্টা না করে লিকুইডেট করে দেওয়াটা সবচেয়ে ভালো।

গতকাল শনিবার ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি অয়োজিত ‘ব্যাংকিং খাতে সুশাসন জোরদারে ব্যাংক একীভূতকরণ’ বিষয়ক এক ছায়া সংসদ বিতর্ক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ।

রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ব্যাংক অনুমোদনের বিরোধিতা করে সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাড়তে বাড়তে এখন বাংলাদেশে ব্যাংকের সংখ্যা ৬১টি। অনেক আগেই বলেছিলাম এত ব্যাংকের অনুমোদন দিলে মার্জারের সিদ্ধান্তে যেতে হবে। দেরিতে হলেও মার্জার অ্যাকুইজেশনের সিদ্ধান্তটা ভালো। তবে মার্জারের মাধ্যমে ব্যাংক লুটেরা বা দুর্নীতিবাজরা যাতে পার না পেয়ে যায় সে বিষয়ে খুব গুরুত্ব সহকারে নজর রাখতে হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক এই গভর্নর বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকেরও নীতিগত দুর্বলতা আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক জোর দিয়ে বলতে পারে যে আমরা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ব্যাংক অনুমোদন দেব না। কোনো সিদ্ধান্ত নিতে গেলে ওপরে নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকলে হবে না। অর্থনীতির স্বার্থে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং তার যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হয়। আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আইন থাকলেও তার বাস্তবায়ন হয় না।

ব্যাংক খাতকে শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, প্রলেপ দিয়ে ব্যাংক খাতের চিকিৎসা করা যাবে না। অর্থনীতির স্বার্থে এটাকে শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। আমাদের দেশে মার্জারের ভালো উদাহরণও রয়েছে। যেমন ইস্টার্ন ব্যাংক এখন একটি সবল ব্যাংক। তবে খেয়াল রাখতে হবে ভালো ব্যাংক যেন দুর্বলের প্রভাবে নড়বড়ে হয়ে না যায়। পাশাপাশি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যাংক কর্মকর্তা ও ব্যাংক থেকে অর্থ আত্মসাৎকারী গ্রাহকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

সাবেক এই গভর্নর বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অডিট রিপোর্ট বছরের পর বছর ধরে পড়ে থাকে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। অন্যদিকে পরিচালকরা তাদের ঋণ ভাগাভাগি করতে থাকে। এগুলো অর্থনীতির জন্য খুবই খারাপ। এজন্য ব্যাংকের আইনে কিছু সংস্কার প্রয়োজন।

ডলারের অস্থিরতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই যে ফরেন এক্সচেঞ্জের যে অস্থিরতা। আমার সময়ে ৭৯, ৮০, ৮২ ছিল। কেন বারেবারে বিক্রি করে করে ৮৫, ৮৬, ৮৫ ধাম করে ১০৭ এ চলে গেল। এই যে ক্রলিং পেগ এসবের তো দরকার ছিল না। এসব হয়েছে ডলার বিক্রি করে করে। ১২ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ থেকে বিক্রি হয়েছে। রিজার্ভের টাকা বিক্রি করে কেন স্থিতিশীল করা হবে। বাইরে দেখাবেন আমার টাকা খুব স্ট্রং। ওরা কি জানে না আপনার টাকা যে উইক। আমরা দুই বছর আগে থেকে বলছি এটা অসুবিধা হচ্ছে। আজ ভুলের কারণে ব্যাংক থেকে ধার নেওয়া লাগছে। সোয়াপ-টোয়াপ করে কী হবে? এসব তো সাময়িক।

আমরা রাজনৈতিকভাবে এখনো পরিপক্ব হতে পারিনি। বর্তমানে এমন অবস্থা, যিনি রাজনীতি করেন, আবার ব্যবসা করেন, আবার মিডিয়া হাউজের মালিক, তিনি আবার বলেন আমি জনগণের পক্ষে। একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি যখন সবগুলো একসঙ্গে চালাবে তখন মনের ভেতর একটা জিনিস থাকবে। এসব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের

সংস্কৃতি আমাদের জন্য একটা বড় কালো দাগ। ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম ভয়াবহ ক্যানসারের রূপ নিচ্ছে। একের পর এক ঋণ কেলেঙ্কারি, অর্থ আত্মসাৎ, রিজার্ভ চুরি, বেসিক ব্যাংকের জালিয়াতি, ফারমার্স ব্যাংকের পতন, পিপলস লিজিং, হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, ডেসটিনির জালিয়াতি, পুঁজি বাজারের কারসাজি, শেয়ার মার্কেট লুট ইত্যাদি কলঙ্কিত ঘটনা আর্থিক খাতকে ব্যাপক দুর্বল করে ফেলেছে। ব্যাংক খাত আজ তছনছ হয়ে যাচ্ছে। সোনালী ব্যাংক লুট হয়েছে। জনতা ব্যাংক লুট হয়েছে। বেসিক ব্যাংক ধ্বংস হয়েছে। পদ্মা ব্যাংক কলঙ্কের ইতিহাস রচনা করেছে।

তিনি বলেন, সম্প্রতি পদ্মা ব্যাংক এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হয়েছে। একীভূত হওয়ার পর রেড জোনে থাকা পদ্মা ব্যাংকের গ্রাহকদের নগদ অর্থ উত্তোলনের পরিমাণ বেড়ে গেছে। অন্যদিকে এক্সিম ব্যাংকের আমানতকারীদের মধ্যেও টেনশন তৈরি হয়েছে। খেয়াল রাখতে হবে পদ্মা ব্যাংকের ভাইরাস যাতে এক্সিম ব্যাংকে সংক্রমিত না হয়। একই সঙ্গে এক্সিম ব্যাংককেও নিজেদের কোনো অনিয়ম

থাকলে দ্রুত তা সমাধান করা উচিত। তা না হলে এক্সিম ব্যাংকও পদ্মায় ডুবে যেতে পারে। মনে করা হয় ফারমার্স ব্যাংককে বাঁচতে দিয়ে পদ্মা ব্যাংক হতে দেওয়াটা ছিল বড় ভুল। ফারমার্স ব্যাংকটিকে বন্ধ করে দিলে হয়তো এত বড় আর্থিক ক্ষতি কিছুটা হলেও কম হতো। কীসের ভিত্তিতে ব্যাংক একীভূত করা হচ্ছে, দুর্বল ব্যাংকের দায়-দেনা কে পরিমাপ করবে, দুর্বল ব্যাংকের ক্ষতির দায় কে নেবে, ভালো ব্যাংকটি খারাপ অবস্থায় পড়বে কি না, একীভূত ব্যাংক দুটি কীভাবে পরিচালিত হবে এগুলো এখন বড় প্রশ্ন। তিনি বলেন, কতিপয় রাজনৈতিক চক্র, স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী যাতে আর আর্থিক খাতে অনিয়ম করতে না পারে তার জন্য সরকারকে কঠোর অবস্থানে থাকতে হবে।