প্রতীক নেই দলের সমর্থনটুকু থাকুক

আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোট বর্জন করা বিএনপি-জামায়াতকে বেশ ভয় পাচ্ছে আওয়ামী লীগ। তাই প্রতীকহীন উপজেলা নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না দিলেও সমর্থন দিতে কেন্দ্রকে বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছেন তৃণমূল আওয়ামী লীগ নেতারা। যুক্তি তুলে ধরে তারা বলেছেন, তা না হলে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী বিএনপি-জামায়াতের ভোটে জেতার সুযোগ হবে। রংপুর বিভাগের আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তৃণমূল নেতারা এমন মত ব্যক্ত করেছেন।

গতকাল শনিবার রংপুর বিভাগের আট জেলার আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করে আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ সভায় ওই বিভাগের দলীয় সংসদ সদস্যরাও (এমপি) উপস্থিত ছিলেন। উপজেলা পরিষদ নির্বাচন উপলক্ষে ডাকা এই মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

তিনি বলেছেন, ‘আমি সংসদ সদস্য, আমি নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করব, আমার একজন থাকবে তাকে জেতানোর জন্য গোটা প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করব, এটা হতে পারবে না। যে উদ্দেশ্যে এই নির্বাচন উন্মুক্ত করা হয়েছে, সেই উদ্দেশ্যটা কোনো অবস্থাতেই ব্যাহত করা যাবে না।’

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘সামনে উপজেলা নির্বাচন। উপজেলা নির্বাচন এবার নতুনভাবে, নতুন পরিবেশে আপনাদের অনুরোধে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার সুযোগ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আমরা দেখতে চাই, এর মধ্য দিয়ে নির্বাচন কতটা প্রতিযোগিতামূলক, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হয়। নির্বাচনে যারা প্রার্থী হতে চান হবেন। আমরা একটা প্রভাবমুক্ত ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার নির্বাচন করতে চাই।’

সভায় উপস্থিত আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পঞ্চগড় জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম সুজন ও নীলফামারী-২ আসনের সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূর আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী না থাকলেও দল সমর্থিত প্রার্থী দেওয়ার বিশেষ অনুরোধ করেন।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে রংপুর, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী ও গাইবান্ধা জেলা আওয়ামী লীগের কোন্দলের বিষয়ে কথা হয়েছে। সমস্যার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন ওবায়দুল কাদের। এ বিষয়ে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা শাজাহান খান, হাছান মাহমুদ ও সুজিত রায় নন্দীকে নির্দেশনা দেন কাদের।

বৈঠকে উপস্থিত আওয়ামী লীগের দুজন কেন্দ্রীয় নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএনপি-জামায়াত নির্বাচনে এলে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা নেওয়া আছে আওয়ামী লীগের। মাঠের চিত্র বুঝেই সেদিকে যাবেন ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকরা। নির্বাচন উন্মুক্ত রাখা হলেও সব উপজেলায় যোগ্য, দক্ষ, জনপ্রিয় ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির প্রার্থীর ব্যাপারে বিভিন্নভাবে সমর্থন জানাবে আওয়ামী লীগ। এটা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। তবে কেন্দ্র হস্তক্ষেপ করবে না, জেলা থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

যেসব উপজেলায় বিএনপি ও জামায়াতের নেতারা নির্বাচন করবেন, সেসব উপজেলার বিষয়ে আওয়ামী লীগ বিকল্প চিন্তা করছে বলেও দলটির একাধিক সূত্রে জানা গেছে। সূত্রটির দাবি, যেখানে বিএনপি-জামায়াত নির্বাচন করবে, সেখানে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী যেন না থাকে সেজন্য একজনকে সমর্থন দেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া আছে আওয়ামী লীগের। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রের দিকনির্দেশনায় জেলা আওয়ামী লীগ একক প্রার্থীকে সমর্থন দেবে।

বৈঠকে উপস্থিত এক নেতা বলেন, আওয়ামী লীগে একাধিক প্রার্থী থাকলে হেরে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। তাই দল সমর্থিত প্রার্থী থাকার পক্ষে মত দেওয়া হয়। সে ক্ষেত্রে ঝুঁকি কম থাকে বলে তারা মনে করেন।

ওই নেতা আরও বলেন, উপজেলা নির্বাচনে জামায়াতের নেতারা ভোট করবেন। বিএনপি নেতারাও করতে পারেন। আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থীর কারণে তাদের বিজয় সহজ হয়ে যেতে পারে।

কোন কোন জেলায় বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থীরা নির্বাচন করবেন বা করতে পারেন সেগুলোর তালিকা করলে ভালো হবে বলে মত দিয়েছেন একাধিক জেলার নেতারা।

বৈঠক সূত্র জানায়, পঞ্চগড়ের দলীয় সংসদ সদস্য (এমপি) নূরুল ইসলাম সুজন বলেছেন, উন্মুক্ত থাকায় দল বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। তারা কার পক্ষে কাজ করবেন? কেন্দ্র থেকে জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সঙ্গে কথা বলে প্রতীক না থাকলেও একজনকে যদি সমর্থন দেওয়া যায়, তার জন্য কাজ করতে পারবেন।

একই সূত্র জানায়, নীলফামারীর এমপি আসাদুজ্জামান নূর বলেছেন, সম্মেলনে কাউন্সিলরদের ভোটে নেতা নির্বাচন করা হলে তাদের ক্ষমতা বাড়ে। কারণ অনেক সময় দেখা যায় ভোটাভুটি ছাড়াই মতামতের ভিত্তিতে কমিটি হয়ে যায়। উপজেলা নির্বাচন নিয়ে তিনি বলেন, কেন্দ্র, জেলা ও উপজেলা একজনকে সমর্থন দিলে নেতাকর্মীদের কাজ করতে সুবিধা হবে। না হলে জামায়াত জিতে যাবে। নীলফামারী সদর উপজেলায় একাধিক প্রার্থীর কারণে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীর বিজয়ের সম্ভাবনা বেশি বলে জানান নূর।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের রংপুর বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলীয় সমর্থন চেয়ে জেলা-উপজেলার নেতারা মতপ্রকাশ করেছেন। এটা ওনাদের প্রস্তাব। আমরা সেগুলো গুরুত্ব সহকারে শুনেছি। শেষ কথা হলো, নেত্রী (শেখ হাসিনা) যে সিদ্ধান্ত দেবেন সেটাই।’ তবে তিনি বলেন, নির্বাচন উন্মুক্ত থাকবে। যে প্রার্থী জনপ্রিয় তিনি বিজয়ী হবেন।

সুজিত রায় বলেন, বৈঠকে যেসব সমস্যার কথা উঠে এসেছে তা সমাধানের কথা বলা হয়েছে। যেমন রংপুর মহানগরের থানা কমিটি, নীলফামারীর জলঢাকা ও সৈয়দপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সমস্যা সমাধানের জন্য নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক মতিয়ার রহমান বলেন, উপজেলা নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকবে না। তবে বৈঠকে দু-একজন নেতা বলেছিলেন একাধিক প্রার্থী থাকলে দলের শৃঙ্খলা নষ্ট হবে। তাই একজনকে সমর্থন দেওয়া যেতে পারে। তবে কেন্দ্রীয় নেতারা কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। তারা বলেছেন, নেত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানাবেন।

জাতীয় নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কারণে বিভিন্ন জায়গায় নৌকার প্রার্থীরা যে বেকায়দায় পড়েছিলেন, সেটা নিয়েও বৈঠকে কথা উঠেছিল। সেখানে লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোতাহার হোসেন বলেছেন, তার আসনে সোনালী ব্যাংকের সাবেক এক এমডি প্রার্থী হয়েছিলেন। তিনি অনেক টাকাপয়সা খরচ করেছেন। নেতাকর্মীদের মধ্যে টাকার লোভ ঢুকিয়েছেন।

পঞ্চগড়-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার সাদাত সম্রাট। এ নির্বাচনের আগে তার স্থলে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু সারোয়ারকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করেছিলেন জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি নূরুল ইসলাম সুজন। বৈঠকে এ নিয়েও কথা বলেছেন সুজন।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, যেহেতু সাধারণ সম্পাদক ট্রাক প্রতীকে নির্বাচন করেছিলেন, সেজন্য যুগ্ম সাধারণ সম্পাদককে দায়িত্ব দিয়েছেন বলে সুজন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। যার জন্য সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি। জবাবে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, তিনি (সুজন) নির্বাচন করেছেন। তার সভাপতির দায়িত্ব কাকে দিয়েছেন জানতে চান কাদের। জবাবে সুজন বলেন, তিনি দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করেছেন। কাদের পাল্টা বলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য তো মাঠ উন্মুক্ত রাখা হয়েছিল।