ভারতের উত্তর-পূর্বের অন্যতম রাজ্য আসামে এই মুহূর্তে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বে জোট সরকার ক্ষমতায়। সেখানে মুখ্যমন্ত্রী পদে রয়েছেন কংগ্রেসের এক সময়ের প্রভাবশালী নেতা হিমন্ত বিশ্বশর্মা। সারদা আর্থিক কেলেঙ্কারি মামলা এবং লুইস বার্জার কেলেঙ্কারিতে তার নাম রয়েছে। কিন্তু হিমন্ত বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পরই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার তৎপরতা থমকে যায়। ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (সিবিআই) এবং আর্থিক তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) যখন বিজেপিবিরোধী দলগুলোর ওপর কার্যত খড়গহস্ত, তখন হিমন্তের মতো দলত্যাগী নেতাদের তদন্তের ক্ষেত্রে সংস্থাগুলোর কুম্ভকর্ণের ঘুম নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে লোকসভা ভোটের আগে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মতো নেতাকেও বিজেপি সরকার রেহাই দিচ্ছে না। ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে বারবার প্রশ্ন উঠেছে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোর স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়ে। কারণ কংগ্রেসসহ বিজেপিবিরোধী সব দলের অনেক প্রভাবশালী নেতার ক্ষেত্রেই তা সত্য। বিজেপি সারা ভারতের যেসব জায়গায় শক্তিবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়েছে, সেসব জায়গায় অন্য দলের নেতাদের ভাগিয়ে নিতে কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্তকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত ২৫ জন বিরোধী নেতার খবর পাওয়া যায়, যারা বিজেপি কিংবা তার নেতৃত্বাধীন জোট ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্সের (এনডিএ) শিবিরে ভিড়েছেন, তারা প্রায় সবাই তদন্ত থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছেন। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২৫ জনের ২৩ জনই কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্ত থেকে রেহাই পেয়েছেন। এর মধ্যে তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বাকি ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলার তদন্ত কার্যত ঠা-াঘরে চলে গেছে। গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা শুভেন্দু অধিকারী হঠাৎ যোগ দেন বিজেপিতে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়ে দিয়ে তিনি বিধায়ক হন এবং পরে বিজেপির বিরোধীদলীয় নেতাও বনে যান। তিনি আর্থিক প্রতারণার মামলায় সিবিআইয়ের অভিযোগপত্রে এফআইআরভুক্ত আসামি। অথচ একই প্রতারণার মামলায় তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। কিন্তু শুভেন্দু নির্বিঘ্নে ঘুরছেন। আবার সম্প্রতি বরাহনগরের বিধায়ক তাপস রায়ের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে কেন্দ্রীয় সংস্থা তার বাসায় অভিযান চালায়। কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি বিজেপিতে যোগ দিয়ে উত্তর কলকাতায় লোকসভার প্রার্থী হয়েছেন। দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পরে বিজেপিতে যাওয়া নেতাদের তালিকায় আছেন কংগ্রেসের ১০ নেতা, মহারাষ্ট্রের শারদ পাওয়ারের এনসিপির চারজন, উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনার চার জন, তৃণমূলের তিন, তেলেগু দেশম পার্টির (টিডিপি) দুজন নেতা রয়েছেন। অখিলেশের সমাজবাদী পার্টি (এসপি) এবং ওয়াইএসআরসিপির এক জন করে নেতাও রয়েছেন এই তালিকায়।
কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্তের মুখে পড়া যেসব নেতা বিজেপি বা এনডিএতে গিয়ে তদন্ত থেকে রেহাই পেয়েছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- অজিত পওয়ার (এনসিপি), প্রফুল্ল পটেল (এনসিপি), প্রতাপ সরনায়েক (শিবসেনা), হিমন্ত বিশ্বশর্মা (কংগ্রেস), হাসান মুশরিফ (এনসিপি), ভাবনা গাওলি (শিবসেনা), যামিনী এবং যশবন্ত যাদব (শিবসেনা), সিএম রমেশ (টিডিপি), পাঞ্জাবের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অমরিন্দর সিংহের ছেলে রনিন্দর সিংহ (কংগ্রেস), সঞ্জয় শেঠ (এসপি), কে গীতা (ওয়াইএসআরসিপি), ছগন ভুজবল (এনসিপি),
কৃপাশঙ্কর সিংহ (কংগ্রেস), দিগম্বর কামথ (কংগ্রেস), অশোক চৌহারন (কংগ্রেস), নবীন জিন্দল (কংগ্রেস), অর্চনা পাদিল (কংগ্রেস), গীতা কোড়া (কংগ্রেস), বাবা সিদ্দিকি (কংগ্রেস), জ্যোতি মির্ধা (কংগ্রেস) এবং সুজনা চৌধরি (টিডিপি)। বিজেপি দল ভাঙিয়ে সরকার পরিবর্তন করার কৌশল অনেক রাজ্যেই প্রয়োগ করেছে। আবার যেসব জায়গায় শক্তি কম সেখানেও তারা সেই কৌশল কাজে লাগিয়েছে। বিশেষ করে আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরাসহ উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোতে বিজেপি দল ভাঙানোর খেলায় মেতেছে। সেক্ষেত্রে অন্য দলের যেসব নেতার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে সেসব হাতিয়ার করেছে দলটি।