রাশিয়াতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব যুব উৎসবে অংশগ্রহণের সুযোগ আমাকে দারুণভাবে আন্দোলিত করেছে। মার্চের প্রথম সপ্তাহে সোচি শহরে অনুষ্ঠিত মূল উৎসব শেষে মস্কোতে আসতেই রমজান মাস শুরু হয়। মস্কো থেকে খান্টি-মাস্কি অটোনামাসের ইয়োগরার উদ্দেশ্যে বিমানে রওনা হওয়ার রাতে আমার দ্বিতীয় সাহরি সম্পন্ন হয় বিমান থেকে সরবরাহ করা খাবারে।
আঞ্চলিক উৎসবে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়ে খান্টি- মাস্কি অটোনামাসের ইয়োগরার উদ্দেশে রওনা হই। মস্কো থেকে বিমানে প্রায় চার ঘণ্টা সময় লাগে। এখানে মস্কো থেকে সময়ের পার্থক্য তিন ঘণ্টা। পশ্চিম সাইবেরিয়ার এ এলাকায় রাশিয়ার সবচেয়ে বেশি তেল উৎপাদিত হয়। বরফ আচ্ছাদিত ইয়োগরা শহরে আমার দ্বিতীয় রোজা শুরু হয়। এখানে বলে রাখি, রাশিয়ায় বাংলাদেশের একদিন আগে রোজা শুরু হয়।
আঞ্চলিক উৎসবে আমরা ৩৩টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করি। এখানে মিসর, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, আলজেরিয়া, তানজানিয়াসহ আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি রয়েছে এবং আমরা অনেকেই মুসলিম হওয়ায় আমাদের রমজানের একটি আবহ অনুভব করেছি।
আঞ্চলিক উৎসবের দায়িত্বে থাকা স্বেচ্ছাসেবকরা আমাদের সাহরি ও ইফতারের জন্য হোটলে লবিতে নিয়মিত খাবার পৌঁছে দিতেন। তাদের অন্য ধর্মের প্রতি যথেষ্ট আন্তরিকতা রয়েছে, যা আমাকে ভীষণভাবে মুগ্ধ করেছে। আমাদের সম্মানে ইয়োগরার আঞ্চলিক সরকার ইয়োগরা শহরে একদিন ফ্যামিলি ডিনারের আয়োজন করে। তিনজনের একটি গ্রুপ করে ইয়োগরা শহরে একটি পরিবারের সঙ্গে ইফতার ও রাতের খাবার খাওয়ার আয়োজন রাখা হয়। আমার সঙ্গের গ্রুপের অন্য দুজন সদস্য হলেন মিসরের মরিয়ম এবং ইন্দোনেশিয়ার আজলিয়া। আমরা তিনজনই মুসলিম হওয়ায় আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় একটি মুসলিম পরিবারে।
আমরা মুসলিম পরিবারের ইফতারের দাওয়াতে উপস্থিত হয়ে তাদের আতিথেয়তায় অভিভূত হই। মূলত তারা কাজাকিস্তানে জন্মগ্রহণ করেছেন। তবে ২০১৩ সাল থেকে রাশিয়ায় বসবাস করছেন। ৩০ বছর বয়সী আমির ইয়োগরাতে ব্যবসা করেন এবং তার সহধর্মিণী ডিনারা ইয়োগরা ফেডারেলের একটি দপ্তরে রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত। তাদের আলী এবং আয়ান নামে দুটি শিশুসন্তান রয়েছে। আমরা তাদের সঙ্গে দারুণ সময় অতিবাহিত করি।
বিশেষ করে আমাদের দেশের ইফতার আয়োজনের সঙ্গে সেখানেও কিছুটা মিল খুঁজে পেলাম। খেজুরের সঙ্গে শরবত এবং ফলমূলের পাশাপাশি তেলে ভাজা চপ জাতীয় খাবারের আয়োজন ছিল আমাদের জন্য। এ ছাড়া রাতের খাবার হিসেবে বিভিন্ন খাবারের মধ্যে একটি বিশেষ খাবার ছিল যার নাম বেশবার্মা। বেশবার্মা মূলত কাজাক ভাষা এবং এর অর্থ হাতের পাঁচ আঙুল। খাবারটি হাতের পাঁচ আঙুল দিয়ে খেতে হয় এ জন্য এর নাম বেশবার্মা। গরুর মাংস, পেঁয়াজ, আলু এবং রুটির মতো উপকরণ ও তেল দিয়ে রান্না করা দারুণ পদ ছিল এটি। আমরা সাধারণ চামচ দিয়ে খাবার খেলেও এবার খাবারের নামকরণের স্বার্থকতা রাখতে হাত দিয়ে খাবারটি খেলাম। পারিবারিক আবহে সেদিন ইফতার ও রাতের খাবার খাওয়ার অভিজ্ঞতা আমার মনে থাকবে।
রমজানে রাশিয়ার দিনগুলোতে দেশীয় খাবার খাওয়ার আরেকটি অভিজ্ঞতা দিয়ে এই লেখা শেষ করব। ইয়োগরা থেকে মস্কো শহরে আসার পর। মস্কোতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করা কুষ্টিয়ার ডিকেন ভাই আমাদের জন্য বাঙালি খাবার নিয়ে হাজির হন হোটেল লবিতে। ইফতারের পর তার রাশিয়ান সহধর্মিণীর হাতে রান্না করা খিচুড়ি এবং চিংড়ি মাছ, বেগুন ভাজি, চপ দারুণ মজা করে খেয়েছি। আমার রাশিয়া সফরে বাঙালি খাবারের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ হয় ডিকেন ভাইয়ের কল্যাণে। এই খাবার খেয়ে মূলত সাহরিও করি আমরা। বেশ কয়েক দিন রাশিয়ার খাবার খেতে খেতে আমি বাঙালি খাবার মিস করছিলাম। অনেক দিন পর বাঙালি খাবারের সে স্বাদ ভুলবার নয়।
মো. সাঈদ মাহাদী সেকেন্দার
কথাশিল্পী ও গণমাধ্যমকর্মী