ঈদের ছুটিতেও মনে পড়ে ক্যাম্পাসের কথা

৫ এপ্রিল, ২০২৪। ঘুম থেকে উঠতেই মনে পড়ল, আরেহ! ক’টা বাজে, ক্যাম্পাসে যেতে হবে তো! ফোনের স্ক্রিনে চোখ পড়তেই দেখি নয়টা বাজে। হুলুস্থুল একটা ভাব নিয়ে উঠতেই পরক্ষণে মনে পড়ল, ওহ হো, ক্যাম্পাস তো বন্ধ! তাও আবার আঠারো দিন। যদিও এত দিন হতো না। আঠারো দিন শেষে এক ‘ভয়ংকর সময়’ করছে অপেক্ষা।

‘ভয়ংকর সময়’ কথাটা কি ভুল? হয়তো হ্যাঁ, হয়তোবা না। কারণ ছুটির পরেই শুরু হবে সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা। ধুর, ক্যাম্পাসটা খোলা থাকলে কি সমস্যা হতো! ক্যাম্পাস খোলা থাকা অবস্থায় সকাল নয়টার ক্লাস ধরা আর ল্যাব করা; খারাপ লাগত আবার লাগত না। শুধু ভাবতাম সকালের ক্লাসটা যদি ক্যানসেল হতো, কী যে ভালো হতো! এখন ছুটির দিনে মনে হচ্ছে, কেন ক্যাম্পাস খোলা না? এই পাহাড় সমান সিলেবাস আমি একা কীভাবে শেষ করব?

ক্লাসের দিনগুলোতে নয়টা বাজতেই উপস্থিত হতাম মেডিসিনাল কেমিস্ট্রি ক্লাসে, স্ট্রাকচার দেখেই ভাবতাম দাঁড়িয়ে থাকব কি পরের ক্লাসে! পরে শুরু ফার্মাসিউটিক্যাল অ্যানালাইসিসের স্পেক্ট্রোস্কোপির ক্লাস; খুঁজে পাই না স্ট্রাকচারের পজিশনে এ বি সি ডি’র মান। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফার্মেসির ক্যাপসুল ক্লাসের লেকচারে মেশিনের স্টোরি শুনে ইন্ডাস্ট্রিতে করব কী তা ভাবতে থাকি আনমনে। ফার্মাকোলজির অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের লেকচার শুনে অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে পড়ে যাই গভীর দুশ্চিন্তাতে।

শিক্ষকদের পড়ানোয় ছিল না কোনো ঘাটতি। মাঝে মাঝে তাদের বকুনি শুনতেও খুব বেশি খারাপ লাগত না। পরীক্ষার আগে তাদের থেকে অতিরিক্ত ক্লাস মিস করছি বড্ড বেশি। ক্লাসের ফাঁকে গল্পে গল্পে চলত পড়ার আড্ডা। ছুটির এই দিনগুলোতে ‘তোরা ছিলি, তোরা আছিস, জানি তোরাই থাকবি, বন্ধু...?’ বলতে পারছি না চায়ের আড্ডায়। মিস করছি তোদের।

মনে পড়ছে, আমাদের গ্রুপ স্টাডির কথা। এক ঘণ্টার স্টাডিতে কম করে হলেও প্রায় অর্ধেক সময় পার করেছিলাম হাসি, ঠাট্টা, গল্প আর আড্ডায়। তবে এ সময়টাতে যতটুকু পড়ার বিষয় নিয়ে আলোচনা করতাম, তা একা একা ঘণ্টাব্যাপী পড়ার চেয়েও বেশি কার্যকর হতো। পড়া না বোঝার ব্যাপারটাও হয়তো সুন্দর। সবাই মিলে বসে তা সমাধান করা এবং নতুন আঙ্গিকে শেখার মাঝেও ভালো কিছু লুকানো থাকে।

ছুটিতে সেই সময়গুলো মনে পড়লে মনের কোণে মেঘ জমে। রোজা ও ঈদের ছুটিতে কোলাহলে পরিপূর্ণ ৩২ একরের গণ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসও বসবাস করছে নির্জনতায়। যে ক্যাম্পাস হাজারো শিক্ষার্থীকে পরম স্নেহে বুকে আগলে রাখত, সেই ক্যাম্পাসই এখন দিন কাটাচ্ছে চরম একাকিত্বে। বন্ধের আগেও যেখানে ছিল হৈ-হুল্লোড়, গানের আড্ডা তা সবই আজ নিস্তব্ধ।

তবে প্রকৃতি হার মানার নয়। ক্যাম্পাস তার হাজারো শিক্ষার্থী সন্তান থেকে দূরে থাকলেও এ সময়ে সে নিজেকে প্রাণবন্ত করে তুলবে। শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে সে নিজেকে মেলে ধরবে। বাড়বে সবুজের সমারোহ। মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে দূর্বাঘাস, বাড়বে পাখিদের আনাগোনা। গাছে গাছে আমের মুকুল আসবে, ভ্রমর করবে গুঞ্জন। সবুজের মাঝে লাল ইটের গাঁথুনি বাড়িয়ে দেবে তার নান্দনিক রূপ। মানুষের জীবন প্রকৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যেখানে প্রকৃতি নেই, সেখানে জীবনের সন্ধান নেই। তার স্বতন্ত্র প্রমাণ দিচ্ছে এই ক্যাম্পাস।

ইভা আক্তার

শিক্ষার্থী, গণ বিশ্ববিদ্যালয়