বৈশাখ মাস আসার আগেই আকস্মিক ঝড় ও বজ্রপাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল রবিবার সকালে বয়ে যাওয়া এই ঝড় লন্ডভন্ড করে দেয় ঘরবাড়ি, গাছপালা ও ফসলি জমি। কোথাও গাছ উপড়ে পড়েছে, জেলের নৌকা ডুবে গেছে।
স্থানীয়রা জানান, গতকাল সকাল ১০টার দিকে আকাশে ঘনকালো মেঘ দেখা দেয়। প্রথমে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ও বজ্রপাত এবং দমকা হাওয়াসহ ঝড় শুরু হয়। বজ্রপাতে ভোলা, নেত্রকোনা ও যশোরে কৃষক, পটুয়াখালীর বাউফলে শিশু, খুলনায় যুবক, ঝালকাঠিতে দুই নারী ও এক কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া বাউফলে গাছ উপড়ে ঘরের ওপর পড়ে বৃদ্ধা ও ভোলায় এক ভিক্ষুকের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে পটুয়াখালীর বাউফলে নৌকাডুবে এক জেলের মৃত্যু হয়েছে। দুমকিতে ঘূর্ণিঝড়ে লন্ডভন্ড হয়েছে পল্লীবিদ্যুৎ লাইন এবং বাগেরহাটে শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
যশোরে বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যু : যশোরের ঝিকরগাছায় বজ্রপাতে আবদুল মালেক পাটোয়ারী (৬৫) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। ওই গ্রামের সাবেক মেম্বার জাহান আলী জানিয়েছেন, সকালে আবদুল মালেক ইরি ধানের জমিতে কীটনাশক স্প্রে করে বাড়ি ফিরছিলেন। এ সময় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। মাঠের মধ্যে হঠাৎ বজ্রপাতে ঘটনাস্থলে তার মৃত্যু হয়। এ সময় তার দুই ছেলে একটু দূরে থাকায় তাদের কোনো ক্ষতি হয়নি।
বাউফলে নিহত ৩, আহত অর্ধশত : পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ১৫ ইউনিয়নের ঘরবাড়ি, গাছপালা ও ফসলি জমি বিধ্বস্ত হয়েছে। গতকাল বেলা পৌনে ১১টায় মাত্র ৫ মিনিটের ঝড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়। ঝড়ে ৩০-৪০টি ঘরের সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত এবং অর্ধশতাধিক ঘরের আংশিক ক্ষতি হয়। ঘরের ওপর গাছচাপায় নিহত হয়েছেন শতবর্ষী সাফিয়া বেগম নামে এক বৃদ্ধ। এ ছাড়া উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের তাতের কাঠি গ্রামে বজ্রপাতে রাতুল (১৩) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর আহত অন্য দুজনকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এদিকে, তেঁতুলিয়া নদীতে মাছ শিকারে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়ে ডুবে যায় জেলের নৌকা। এ সময় জেলে ইব্রাহিম ফরাজিকে খোঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে ইব্রাহীমের লাশ নদী থেকে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
খুলনায় বজ্রপাতে যুবকের মৃত্যু : খুলনায় বজ্রপাতে ওবায়দুল্লাহ গাজী (৩০) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। ডুমুরিয়া উপজেলার কানাইডাঙ্গা বিলে মাছের ঘেরে ঘাস কাটার সময় বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। ডুমুরিয়া থানার ওসি সুশান্ত কুমার সাহা বজ্রপাতে ওবায়দুল্লাহ গাজীর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
ভোলায় গাছচাপা ও বজ্রপাতে দুজনের মৃত্যু : ভোলার লালমোহনে ঝড়ে ঘরের ওপর গাছ উপড়ে পড়ে চাপায় হারিস নামে এক ভিক্ষুক ও বজ্রপাতে বাচ্চু নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। সকালে উপজেলার বদরপুর ইউনিয়নের সাতবাড়িয়া এলাকায় ও চরভূতা ইউনিয়নের লেঙ্গুটিয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া একই সময় ঝড়ে জেলার মনপুরা ও তজুমদ্দিন উপজেলা শতাধিক ঘরবাড়ি এবং গাছপালা বিধ্বস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে মাঠে প্রশাসন কাজ করছে।
নেত্রকোনায় মরিচক্ষেতে গিয়ে বজ্রপাতে নিথর হলো কৃষক : নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলায় বজ্রপাতে শহিদ মিয়া (৫২) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার মেন্দিপুর ইউনিয়নের রাজঘাট নামের হাওরে এ ঘটনা ঘটে।
ঝালকাঠিতে ঝড়ের সময় বজ্রপাতে দুই নারী ও এক কিশোরী নিহত : ঝালকাঠিতে বজ্রপাতে দুই নারী ও এক কিশোরী নিহত হয়েছে। নিহতরা হলো হেলেনা বেগম (৪০), মিনারা বেগম (৩৫) ও মাহিয়া আক্তার ঈশানা (১১)। কালবৈশাখী ঝড়ের সময় মাঠ থেকে গবাদি পশু আনতে গিয়ে তিনজনই বজ্রপাতে নিহত হয়।
নিহত হেলেনা বেগমের বাড়ি ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলার উত্তর তালগাছিয়া গ্রামে, মিনারা বেগমের বাড়ি ঝালকাঠি সদর উপজেলার শেখেরহাট গ্রামে ও মাহিয়া আক্তার ঈশানার বাড়ি একই উপজেলার পোনাবালিয়ার ছিলারিশ গ্রামে। এর মধ্যে হেলেনা বেগম ও মিনারা বেগম গৃহিণী এবং মাহিয়া আক্তার ঈশানা স্থানীয় আফসার মেমোরিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। ঝালকাঠির পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আফরুজুল হক টুটুল এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
দুমকিতে লন্ডভন্ড পল্লীবিদ্যুৎ লাইন : পটুয়াখালীর দুমকিতে আকস্মিক ঝড়ে শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত ও গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রচন্ড বেগের আকস্মিক ঝড়ে বাঁশবুনিয়ার নুর ইসলাম মৃধা, নলদোয়ানীর আবদুল কাদের হাং ও চরবয়েড়ায় মফিজ উদ্দিন, শ্রীরামপুরের সেলিম হাওলাদারের বসতঘরসহ বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ছাউনি উড়ে গাছচাপা পড়াসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ঝড়ের তান্ডবে জলিশা কদমতলা কলেজের ছাউনি উড়িয়ে নিয়ে গেছে এবং এলএএম কলেজের টিনশেড ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। এ ছাড়া গাছপালা, কলাবাগান, রবি ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ের তান্ডবে বিভিন্ন স্থানে পল্লীবিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে ও উপড়ে পড়ে তার ছিঁড়ে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। রাজাখালী, মুরাদিয়া, আংগারিয়া ও পাঙ্গাশিয়ায় অর্ধশতাধিক স্পটে তার ছিঁড়েছে। ৪০টি পয়েন্টে মেইন লাইনের ওপরে গাছ পড়ে থাকার খবর পাওয়া গেছে। ঝড়ের কবলে পড়ে বিদ্যুৎকর্মীরা কাজ শুরু করেছেন। তবে কখন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে তা বলা যাচ্ছে না।
বাগেরহাটে শতাধিক বাড়িঘর বিধ্বস্ত : বাগেরহাটে কালবৈশাখী ঝড়ে শতাধিক কাঁচাপাকা ও টিনের বসতঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। ঝড়ে ভেঙে ও উপড়ে গেছে বৈদ্যুতিক খুঁটি ও গাছপালা। পৌরসভা ও পল্লীবিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সকাল সাড়ে ৯টায় বাগেরহাট পৌরসভা, সদর উপজেলার গোবরদিয়া, পুঁটিমারী, ও খেগড়াঘাট গ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঝড়ে ঘরবাড়ি ভেঙে যাওয়ায় পরিবারগুলো দুর্ভোগে পড়েছে। তবে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা জানাতে পারেনি প্রশাসন।