বান্দরবানের রুমা ও থানচিতে হামলা এবং ব্যাংক ডাকাতি ও অস্ত্র লুটের ঘটনার পর পাহাড়ের নতুন সশস্ত্র গোষ্ঠী কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যার অংশ হিসেবে গত রবিবার রাতে থানচি ও বান্দরবান সদর থেকে ব্যাংক ডাকাতির সময় কেএনএফ সদস্যদের বহনকারী একটি গাড়ি জব্দসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আরেক অভিযানে সাতটি আগ্নেয়াস্ত্র, গুলিসহ কেএনএফের সক্রিয় দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল সোমবার জেলার রুমা উপজেলার বেথেলপাড়ায় যৌথবাহিনীর তল্লাশি অভিযানে তাদের আটক করা হয়। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এ ছাড়া গতকাল বেথেলপাড়া থেকে সন্ত্রাসবিরোধী যৌথবাহিনীর অভিযানে কেএনএফ সদস্য সন্দেহে ৪৯ জনকে আটক করে যৌথবাহিনী। তাদের মধ্যে ১৮ নারী। গতকাল সন্ধ্যায় এ তথ্য নিশ্চিত করেন বান্দরবানের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হোসাইন মো. রায়হান কাজেমী।
তিনি আরও জানান, গতকাল বিকেলে আটক ওই ৪৯ জনকে বান্দরবান সদর থানায় নিয়ে আসা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার সকালে তাদের আদালতে হাজির করা হবে।
এর আগে রবিবার কেএনএফের অন্যতম এক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। চেওশিম বম নামে ওই নেতা কেএনএফের আদি সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (কেএনডিও) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং কেএনএফ প্রধান নাথান বমের ঘনিষ্ঠজন বলে ভাষ্য র্যাবের।
এদিকে বান্দরবানের উপজেলাগুলোতে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে চারটি সাঁজোয়া যান (এপিসি) আনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলার পুলিশ সুপার। তিনি বলেন, চলমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় এসব সাঁজোয়া যান রুমা-থানচি উপজেলায় ব্যবহার করা হবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় তা আরও বাড়ানো হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, গত রবিবার রাতের অভিযানে আটক চারজনের মধ্যে একজন গাড়িচালক। অন্য তিনজন কেএনএফ সদস্য। এ সময় জব্দ করা গাড়িটি রুমায় ব্যাংক ডাকাতির সময় ব্যবহৃত হয়েছে।
গ্রেপ্তার চারজনের মধ্যে একজনকে থানচি থেকে ও অন্য তিনজনকে বান্দরবান সদরের রেইসা চেকপোস্ট এলাকা থেকে আটক করা হয়।
ব্যাংক ডাকাতি ও অস্ত্র লুটের ঘটনায় জেলার রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচি উপজেলায় অভিযান জোরদার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। অভিযানে গত রবিবার বান্দরবান সদরের রেইসা চেকপোস্ট এলাকায় রুমার ঘটনার সঙ্গে জড়িত তিনজনকে আটক করা হয়। তারা হলোÑ রোয়াংছড়ির রৌনিনপাড়ার জিংচুন নুং বমের ছেলে ভাননুন নুয়াম বম, থানচির সিমতলাংপিপাড়ার লালমুন চম বমের মেয়ে জেমিনিউ বম ও ছেলে আমে লমচেউ বম। একই দিন থানচিতে ব্যাংক ডাকাতির ঘটনায় জড়িত সন্ত্রাসীদের গাড়িতে পরিবহনের অভিযোগে কফিল উদ্দিন নামে এক গাড়িচালককে আটক করা হয়। থানচি সদরের টিঅ্যান্ডটিপাড়া থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার কফিল উদ্দিন গত ৩ এপ্রিল ব্যাংক ডাকাতি করতে আসা কেএনএফ সদস্যদের তার গাড়িতে পরিবহন করেছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
বান্দরবানের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান কাজেমী দেশ রূপান্তরকে বলেন, কেএনএফের সদস্যরা ব্যাংক ডাকাতি করতে আসার জন্য দুটি গাড়ি ব্যবহার করেছে। ওই দুই গাড়ির একটি জব্দ ও চালক কফিল উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
বান্দরবানের পুলিশ সুপারের দপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ব্যাংক ডাকাতির ঘটনায় গ্রেপ্তার চারজনই জড়িত।
৭ আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি উদ্ধার : বান্দরবানের রুমা উপজেলার বেথেলপাড়ায় গতকাল যৌথবাহিনীর তল্লাশি অভিযানে অস্ত্র-গুলিসহ কেএনএফের দুই সদস্যকে আটক করা হয়। আইএসপিআর পরিচালকের পক্ষ থেকে সহকারী পরিচালক রাশেদুল আলম খান স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। উদ্ধার করা অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ৭টি দেশে তৈরি বন্দুক ও ২০ রাউন্ড গুলি। এ ছাড়া ল্যাপটপ, ইউনিফর্ম ও বুট উদ্ধার করা হয়।
বান্দরবানের জেলা প্রশাসক শাহ্ মোজাহিদ উদ্দিন বলেন, ‘জেলার প্রত্যেকটি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। জনবল ও শক্তি বৃদ্ধি করা হয়েছে। সন্ত্রাসীদের আমরা কঠোর হস্তে দমন করতে চাই। কোনো ধরনের পদক্ষেপ যাতে তারা না নিতে পারে সে রকম প্রস্তুতি আমাদের রয়েছে।’
ব্যাংকিং কার্যক্রমের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ব্যাংকিং কার্যক্রম স্বাভাবিক আছে। যে উপজেলাগুলোতে ব্যাংকিং কার্যক্রম হচ্ছে না, সেগুলো জেলা থেকে পরিচালনা করা হচ্ছে। আতঙ্কিত হওয়ার কিছুই নেই। আমরা জনগণের পাশে আছি।’
ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংকে সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলা ও লুটের ঘটনার পর বান্দরবানের রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচি এই তিন উপজেলায় সোনালী ও কৃষি ব্যাংকের কার্যক্রম গত বৃহস্পতিবার থেকে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। সেখানকার শাখাগুলোর কার্যক্রম বান্দরবান কার্যালয় থেকে চালানো হচ্ছে।
কৃষি ব্যাংকের বান্দরবানের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মোস্তফা এহতেশাম হায়দার মজুমদার জানান, তাদের রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচি শাখার লেনদেন কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ আছে।
গত ২ ও ৩ এপ্রিল রুমা এবং থানচিতে সোনালী ও কৃষি ব্যাংকে ডাকাতি, ব্যাংক ব্যবস্থাপক অপহরণ, টাকা লুট ও পুলিশ-আনসারের ১৪টি অস্ত্র ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ব্যাংক ব্যবস্থাপক উদ্ধার হলেও লুট হওয়া অস্ত্র ও টাকা উদ্ধার করা যায়নি। পাহাড়ের নতুন সশস্ত্র সংগঠন কেএনএফ এসব সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটিয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে। সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার, অস্ত্র ও টাকা উদ্ধারের অভিযানে অংশ নিচ্ছেন সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা। অভিযান সমন্বয় করছে সেনাবাহিনী।