চৈত্রের প্রথম দিকে মেঘলা আকাশ আর হঠাৎ হঠাৎ বৃষ্টির কারণে গরম ততটা তীব্র হয়নি। তবে মাসের অর্ধেকের পর বাড়তে শুরু করে তাপমাত্রা। কয়েকটি অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যায় তাপপ্রবাহও। এর মধ্যে চুয়াডাঙ্গায় থার্মোমিটারের পারদ চড়েছে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপর। অবশ্য এরপর আবার দুদিন ধরে মেঘ-বৃষ্টিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। ঈদের দিন অবধি চলমান এ অবস্থা থাকতে পারে বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা। তবে এরপর থেকে আবার শুরু হতে পারে গরমের পর্ব।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আপাতত এ স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে না। এল নিনোর প্রভাব কমলেও গত বছরের মতো এবারও তাপপ্রবাহ দীর্ঘ হবে। তীব্র তাপমাত্রার কারণে যেমন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে, তেমনি কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতেও সংকট দেখা দেবে।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, চলতি মাসের শুরু থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বইছে। এবারের এপ্রিলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি গরম থাকবে তা আগেই জানিয়েছিল আবহাওয়া অধিদপ্তর। এ সময় স্বাভাবিক তাপমাত্রা থাকার কথা ৩৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে তা ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়ার বেড়ে থাকছে ৩৫ ডিগ্রির বেশি।
তারা বলছেন, এপ্রিল মাস বছরের উষ্ণতম মাস। এ ছাড়া এল নিনোর প্রভাব রয়েছে। আবহাওয়ার এ বিশেষ অবস্থা জুন পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। চলতি মাসে কয়েকটি মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহের শঙ্কা রয়েছে। এ মাসে বৃষ্টিপাতও স্বল্প হবে। মাস জুড়ে গরমের আধিক্য থাকবে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বড় ভূমিকা রয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও রয়েছে। এর ফলে দেশে তাপপ্রবাহের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল জলবায়ু নিয়ে গবেষণা করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। ওই গবেষণায় ১৯৮০ থেকে ২০২০ সালের প্রতিদিনের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা পর্যালোচনা করা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, বিভিন্ন ঋতুতে তাপমাত্রার পরিবর্তন হচ্ছে। গবেষণায় দেখা যায় ক্রমেই জলবায়ু পরিস্থিতি উষ্ণ হচ্ছে। সব ঋতুতেই তাপমাত্রা আগের চেয়ে বাড়ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকাসহ আট বিভাগেই বর্ষাকালে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বেড়েছে। এর মধ্যে খরাপ্রবণ রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়েছে, শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এমনকি বৃষ্টিপ্রবণ সিলেটেও এ সময় তাপমাত্রা বেড়েছে একইরকম মাত্রায়। ঢাকা, রংপুর ও চট্টগ্রামে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির এ হার ছিল শূন্য দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
তাপমাত্রা এমন পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের দেশে ৭১ শতাংশ বৃষ্টি হয় বর্ষাকালে। স্বাভাবিকভাবে জুনের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে বর্ষা সেট হয়। এ সময় টানা বৃষ্টি হতো। কিন্তু এখন লক্ষ করলে দেখা যায় টানা বৃষ্টি নেই। কোথাও কোথাও হালকা বৃষ্টি বা একদিন বৃষ্টিপাত হচ্ছে। বর্ষার যে ধরন, সেটা পরিবর্তন হচ্ছে। বর্ষা আসছে দেরিতে, যাচ্ছেও দেরিতে। অনেক সময় দেখা যায় অস্বাভাবিক বৃষ্টি হচ্ছে। আবার যখন বৃষ্টি হওয়ার কথা তখন না হয়ে অন্য সময় বৃষ্টি বেশি হচ্ছে।
গত বছরের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, স্বাভাবিকভাবে জুলাইয়ে বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু গত বছর জুলাইয়ে বৃষ্টি কম হয়েছে। আবার আগস্টে দেখা গেছে প্রচুর বৃষ্টিপাত। দীর্ঘ সময় আর্দ্রতা বেশি থাকছে। ফলে মানুষের গরমের যে অনুভব সেটা বেড়ে যাচ্ছে। দশ-বারো বছর ধরে এ সমস্যা হচ্ছে। বৃষ্টির ধরন পরিবর্তন হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, প্রথমত বৈশ্বিক উষ্ণতা, আবার নির্বিচারে গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। এর একটি বড় প্রভাব রয়েছে বৃষ্টিপাত কম হওয়ার পেছনে।
এ বছর তাপপ্রবাহ কেমন থাকবে জানতে চাইলে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা গত বছর যেটা বলেছিল যে এ বছর তাপমাত্রা অনেক বাড়বে। তবে তারা এখান থেকে সরে এসেছে। এর কারণ হচ্ছে এল নিনো জুন পর্যন্ত কন্টিনিউ করবে বা এর আগেই দেখা যাচ্ছে কমে যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে আমরা দেখছি বাংলাদেশে গতবারের মতো অত হিট ওয়েভ হবে না। তবে বৃষ্টি কম হলে তাপটাও বাড়বে।
সারা দেশে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহ ও গরম অনুভূত হওয়ার জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি বায়ুদূষণও অন্যতম দায়ী বলে মনে করেন বায়ুম-ল দূষণ অধ্যায়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ধূলিকণা এবং দূষিত গ্যাসের তাপ শোষণ করার ক্ষমতা থাকার কারণে বর্তমানে অত্যধিক দূষিত ধূলিকণা এবং গ্যাসীয় পদার্থগুলো সূর্যের তাপমাত্রাকে শোষণ করে তাপপ্রবাহ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি সালফার ডাইঅক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাইঅক্সাইড তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। মানে অক্সিজেনকে সরিয়ে অন্যান্য দূষণ জায়গা করে নিচ্ছে। অক্সিজেন কমে যাওয়া মানে শীতলতা কমে যাওয়া। এটা হলো সরাসরি প্রভাব। দ্বিতীয় বাতাসের মধ্যে যখন অন্যান্য দূষণ আসে, সেই দূষণগুলোর কতগুলো ওয়ার্মিং বৈশিষ্ট্য থাকে। বাতাসে যদি কার্বন ডাইঅক্সাইড বেড়ে যায় এটা তখন উষ্ণতা তৈরি করে। তারপর মিথেন কার্বন ডাইঅক্সাইড থেকে ৮০ বেশি উষ্ণতা তৈরি করতে পারে।
তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকলে দেশ কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান বলেন, আমরা কিন্তু এখনই ভবিষ্যতের একটা ডেমো দেখতে পাচ্ছি। আমাদের ঋতুর পরিবর্তন হচ্ছে। গরম দীর্ঘ হয়ে গেছে। বর্ষা সংক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছে, অল্প সময়ে বেশি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। আবার যখন গরম পড়ছে তখন পরিমাণ এবং স্থায়িত্বও বেড়ে যাচ্ছে। মরূকরণের প্রাথমিক একটি লক্ষণ। মানে একটি এলাকায় যখন মরূকরণ শুরু হয় তার আগে এ ধরনের লক্ষণ দেখা যায়। সেগুলো এখন আমাদের প্রকৃতিতে দেখতে পাচ্ছি। ফলে তাপপ্রবাহর পরিমাণ বাড়বে, জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য নষ্ট হবে। মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হবে। এ ছাড়া আমাদের বড় উৎপাদনশীল খাত কৃষিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ৩০ বছর আগেও আমাদের দেশের চাষাবাদে সেচ ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু তাপপ্রবাহ, তীব্র খরা এবং স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত না থাকায় এখন সেচনির্ভর চাষাবাদ হচ্ছে। খরার কারণে দেশের উত্তরের জেলাগুলো ধান চাষ বাদ দিয়ে আমের বাগান করছে। এভাবে যদি খরা বাড়তে থাকে দেখা যবে যে আমবাগানও থাকবে না। আবার দক্ষিণের জেলাগুলোতে খরার ফলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে সেখানে চাষাবাদ কমে যাচ্ছে। তার মানে খরার ফলে একেক অঞ্চলে একেক ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, আগে বর্ষার স্থায়িত্ব লম্বা ছিল। এখন সংক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ঠিক রয়েছে। স্বল্প সময়ে অধিক বৃষ্টিপাত হচ্ছে। অধিক পানি সেটাও ফসলের জন্য ক্ষতিকর হচ্ছে। যখন খরা বেড়ে যায় তখন কিন্তু ভূগর্ভের পানি নিচে নেমে যায়। কৃষকের পানি পায় না। এর ফলে দেশের অনেক জায়গায় ফসল উৎপাদন হচ্ছে না। আবার যেসব জায়গায় কৃত্রিমভাবে পানি সরবরাহ করে ফসল উৎপাদন করতে হচ্ছে। আবার খরার কারণে নানারকম রোগবালাই হচ্ছে সেটা দমন করতেও বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এর ফলে একদিকে যেমন আবাদ কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে উৎপাদন খরচও বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার প্রভাব পড়ে ভোক্তাপর্যায়ে। এ সংকট সামনে আরও প্রকট হবে।
তবে তাপপ্রবাহ কমানোর উদ্যোগটা কঠিন নয় বলে মনে করেন ক্যাপসের পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার। তিনি বলেন, আমরা যতই বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বলি না কেন, স্থানীয় পর্যায়ে পরিবেশগত যে পরিবর্তনটা হয়েছে, সেটাই তাপমাত্রা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। একসময় আমাদের তাপমাত্রা এতটা দেখা যেত না। যখন আমাদের পর্যাপ্তসংখ্যক জলাভূমি ছিল, সবুজ ছিল। কমসংখ্যক ইনফ্রাস্ট্রাকচার ছিল। এখন ইনফ্রাস্ট্রাকচার বাধা দিতে পারব না। তাহলে আমাদের কাজ হচ্ছে সবুজ এবং জলাভূমি রক্ষা করা। তাহলে কিন্তু তাপমাত্রার যে চরম অবস্থা, তা থেকে পরিত্রাণ পাব। আলাদা করে আর কোনো শর্টকাট পথ নেই যে এখান থেকে মুক্তি পাব।