ঈদের নামাজ আদায়ের সুযোগ পেলো সোমালিয়ান দস্যুদের হাতে আটক এমভি আবদুল্লার ২৩ নাবিক। এর আগে রোজা ও ইফতারের সুযোগও দিয়েছিল দস্যুরা। আর ঈদের দিন বিরিয়ানি ও সেমাই খেয়েছে নাবিকরা। একইসঙ্গে সকলেই ঈদের নামাজ শেষে স্বজনদের সঙ্গে কথাও বলেছেন। ঈদের নামাজ শেষে স্বজনদের কাছে একটি গ্রুপ ছবিও সকলে শেয়ার করেছেন।
জিম্মি থাকা নাবিক মোহাম্মদ নুর উদ্দিনের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসের সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘তিনি বিকেল ৫টায় ফোন দিয়েছিলেন। সকালে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন।’
ঈদের দিনে কি খেয়েছেন, বলেছেন কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন,‘বিরিয়ানি ও সেমাই খেয়েছেন বলে আমাকে জানিয়েছেন।’
জাহাজে কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,‘ শুধু পানির সমস্যা রয়েছে। এজন্য সপ্তাহে দুই দিন গোসল করতে দিচ্ছেন। আর এতে সকলের শরীরে চর্মরোগ দেখা দিচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন।’
এদিকে জাহাজে নাাবিকরা কোথায় ঈদের নামাজ আদায় করে? এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিনার্স অফিসার্স এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, ‘সব জাহাজে নামাজের একটি কক্ষ থাকে। সেখানে জামায়াতের সঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করা হয়ে থাকে। আবার কখনো কখনো ব্রিজের (জাহাজ চালকের কক্ষ) সামনের খালি জায়গায় আদায় হয়। তবে এমভি আবদুল্লাহর জিম্মি নাবিকদের জাহাজের ডেকে হ্যাজের কভারের উপরে নামাজ পড়তে দিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, নামাজ শেষে তারা যে ছবিটি পাঠিয়েছে সেই ছবিতে নাবিকদের হাস্যেজ্জ্বল ছবি দেখে ভালো লাগছে। পরিবারের সদস্যরাও আশ্বস্ত হবে। একইসঙ্গে দস্যু ও নাবিকদের মধ্যে যে একটি ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছে এটি তারই বহিঃপ্রকাশ। আবার ছবিতে অনেকে ভি চিহ্নও প্রদর্শন করেছেন।
তিনি আরও জানান, মুক্তিপণের টাকা পাওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়ায় সোমালিয়ান জলদস্যুরা জিম্মি নাবিকদের এই সুযোগ দিয়েছে। ঈদের আগেই প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গেছে মুক্তিপণের টাকার বিষয়টি। এখন শুধু কীভাবে এই টাকা পাঠানো হবে এবং নাবিকদের কীভাবে আনা হবে তা নিয়ে আলোচনা চূড়ান্ত হয়নি। ঈদের পর পরই তাদের উদ্ধার করে নিয়ে আসার কথা। এছাড়া তাদের উদ্ধারের জন্য বিকল্প নাবিক টিমও প্রস্তুত রেখেছে জাহাজ মালিক প্রতিষ্ঠান কেএসআরএম।
ঈদের আয়োজন বিষয়ে কথা হয় কেএসআরএমের মিডিয়া উপদেষ্টা মিজানুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন,‘সকালে খুব সুন্দর পরিবেশে নাবিকদের ঈদের নামাজ আদায় করতে দিয়েছে দস্যুরা। এখন আর নাবিকদের সঙ্গে দস্যুদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না।’
উল্লেখ্য, গত ১২ মার্চ দুপুর দেড়টার দিকে সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসু থেকে প্রায় ৬০০ নটিক্যাল মাইল দূরে ভারত মহাসাগর থেকে এমভি আবদুল্লাহর সেকেন্ড অফিসার মোজাহেদুল ইসলাম চৌধুরীকে প্রথম অস্ত্র ঠেকিয়েছিল সোমালিয়ান জলদস্যুরা। সেদিন দুপুর তিনটা ১২ মিনিটে অস্ত্র ঠেকানোর পর জাহাজের ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ আবদুর রশিদ সিটাডেলে আশ্রয় নেয়া সব নাবিকদের ব্রিজে আসার নির্দেশনা দেন। সেকেন্ড অফিসার ও ডিউটি ইঞ্জিনিয়ার সিটাডেলে আশ্রয় নেয়নি। জাহাজটি মোজাম্বিক থেকে ৫৫ হাজার টন কয়লা নিয়ে দুবাই যাচ্ছিল। জাহাজটি ছিনতাইয়ের পর সোমালিয়ার উত্তর-পূর্ব উপকূলের গ্যরাকাদে নোঙ্গর করে। এখনো একই এলাকায় অবস্থান করছে। জাহাজ থেকে নাবিকদের উদ্ধারে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্রিটিশ রয়েল নেভি এবং ভারতীয় নৌ বাহিনী অভিযান চালানোর অভিপ্রায় ব্যক্ত করলেও জাহাজ মালিক ও বাংলাদেশ সরকার অভিযানের অনুমোদন দেয়নি। রক্তপাতহীন জিম্মিদের মুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করতেই মালিক পক্ষের কাছ থেকে অভিযানের অনুমোদন দেয়া হয়নি। এখনো আন্তর্জাতিক বাহিনী এমভি আবদুল্লাহকে নজরদারিতে রেখেছে।
এর আগে একই মালিক গ্রুপের এমভি জাহান মনিকে ২০১০ সালে জিম্মি করেছিল একই গ্রুপের জলদস্যুরা। সেবারও মুক্তিপণ দিয়ে তাদের উদ্ধার করা হয়। সোমালিয়ান জলদস্যুরা ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ৮টি জাহাজ জিম্মি করেছিল। এর আগে ২০০৯ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে জিম্মি করেছিল ৩৫৮টি জাহাজ।