‘আমার জীবন বাঁচাতে গিয়ে তারা আমার বাবার প্রাণটাই কেড়ে নিল। ছাত্রলীগ নেতা নিশানের অনুসারীরা ইট দিয়ে বাবার মাথা থেতলে দিল। আমি এখন কাকে বাবা বলে ডাকব’ মোবাইলের অপরপ্রান্ত থেকে দেশ রূপান্তরকে এসব কথা বলেন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া দন্ত চিকিৎসক কোরবান আলীর ফাজিল পড়ুয়া ছেলে আলী রেজা রানা।
বুধবার (১০ এপ্রিল) ভোরে নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে মারা যান ডা. কোরবান আলী। গত ৫ এপ্রিল বিকেলে আকবর শাহ থানার পশ্চিম ফিরোজ শাহ কলোনি এলাকায় ছেলেকে বাঁচাতে গেলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি গোলাম রসুল নিশানের অনুসারী কিশোর গ্যাং সদস্যরা কোরবান আলীকে মারধর করে রক্তাক্ত করে।
গত ৬ এপ্রিল তিনজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করলেও মূল হোতারা এখনও অধরা। স্থানীয় সূত্র জানায়, হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা হলেন- ছাত্রলীগ নেতা গোলাম রসুল নিশানের অনুসারী ফয়জুল আকবর চৌধুরী আদর, আরিফুল্লাহ রাজু, মাহির সামী, আকিব, সোহেল ওরফে বগা সোহেল, অপূর্ব ও প্রিন্স বাবু।
স্থানীয়রা জানান, গত ৫ এপ্রিল আসর নামাজের পর ডা. কোরবান আলীর ছেলে আলী রেজা রানা আকবর শাহ থানার পশ্চিম ফিরোজ শাহ কলোনি এলাকার এক রেস্তোরাঁয় ইফতার আনতে যান। এ সময় তাকে একা পেয়ে মাহির সামি, আকিব, বগা সোহেল, ফয়জুল আকবর চৌধুরী আদর, প্রিন্স বাবু, আরিফুল্লাহ রাজু, অপূর্ব, সাগর, রিয়াদ, সংগ্রাম ও শাফায়েত মিলে তাকে মারধর করে।
এ সময় মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে ফিরছিলেন তার বাবা ডা. কোরবান আলী। ছেলেকে বাঁচাতে এগিয়ে আসলে তার উপরও হামলা চালায় আকিব, রিয়াদ ও অপূর্ব। তারা ইট দিয়ে কোরবান আলীর মাথায় আঘাত করে। মারধরে রক্তাক্ত হয়ে অচেতন হয়ে পড়েন কোরবান আলী। পরে তাকে উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল সেন্টারের আইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আজ বুধবার ভোরে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় পরদিন আলী রেজা রানা বাদী হয়ে ১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। গত মঙ্গলবার তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ৬ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম ফিরোজ শাহ কলোনী এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনের ভেতরে তিন ছেলেকে মারধর করছিলেন চবির ছাত্রলীগ নেতা গোলাম রসুল নিশানের অনুসারীরা। এ সময় ওই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন ডা. কোরবান আলীর ছেলে আলী রেজা রানা। কয়েকজন স্কুল পড়ুয়া ছেলে এসে তাকে বিষয়টি জানান। রানা সেখানে গিয়ে দেখেন ৪০-৫০ জন যুবক তিনজনকে পেটাচ্ছেন। তাদের উদ্ধার করতে না পেরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ ফোন দেন। ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ আসে। এর আগে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে মাহির সামী নামে একজনকে আটক করে আবার ছেড়েও দেয় পুলিশ।
আলী রেজা রানা বলেন, ‘তিনটি ছেলেকে মারধর করে প্রায় আধমরা করে ফেলেছিল গোলাম রসুল নিশানের অনুসারীরা। ছেলেগুলোর বন্ধুদের আকুতি-মিনতিতে আমি তাদের বাঁচাতে যাই। তাদের বাঁচাতে আমি পুলিশকে খবর দিই। এটিই ছিল আমার অপরাধ। এ জন্য ৫ এপ্রিল আমাকে একা পেয়ে নিশানের নির্দেশে তার অনুসারীরা আমাকে এলোপাতাড়ি আঘাত করে। আমাকে বাঁচাতে গেলে বাবাকেও তারা মেরে রক্তাক্ত করে। হামলার পর থেকে বাবা অচেতন ছিলেন। বুধবার ভোরে চিকিৎসা ধীন অবস্থায় মারা যান বাবা।
পুলিশ জানায়, চট্টগ্রাম নগরে অন্তত ২০০ কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। একেক দলে রয়েছে ৫ থেকে ১৫ জন। পুলিশের হিসাবে, নগরে কিশোর গ্যাং সদস্যসংখ্যা অন্তত ১ হাজার ৪০০। কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকতা বা প্রশ্রয় দিচ্ছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ ৬৪ জন ‘বড় ভাই’। গত ৬ বছরে ৫৪৮টি অপরাধের ঘটনায় কিশোর গ্যাং জড়িত বলে জানায় পুলিশ। এর মধ্যে খুনের ঘটনা ঘটেছে ৩৪টি।
নিহত কোরবান আলীর মামাতো ভাই জসিম উদ্দিন বলেন, ময়নাতদন্ত শেষ হওয়ার পর পূর্ব ফিরোজ শাহ এলাকায় প্রথম জানাজা এবং দ্বিতীয় জানাজা গ্রামের বাড়ি সন্দ্বীপে অনুষ্ঠিত হবে। এরপর সেখানে লাশ দাফন করা হবে। আকবরশাহ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম রব্বানী জানিয়েছেন, ডা. কোরবান আলী হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
