স্বাধীনতা সূচকে ২২ বছর ধরে অবনতি বাংলাদেশের

বৈশ্বিক স্বাধীনতা ও সমৃদ্ধি প্রতিবেদনে (গ্লোবাল ফ্রিডম অ্যান্ড প্রসপারিটি রিপোর্ট) বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৪ দেশের মধ্যে ১৪১তম। এর মধ্যে স্বাধীনতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান অধিকাংশ ক্ষেত্রে ‘স্বাধীনতা বঞ্চিত’ ক্যাটাগরিতে। এই সূচকে টানা ২২ বছর ধরে অবনতি হচ্ছে বাংলাদেশের। অবশ্য গেল বছর সমৃদ্ধি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৪টি দেশের মধ্যে ৯৯তম এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ‘অসমৃদ্ধ’ ক্যাটাগরিতে। এই সূচকে  দক্ষিণ এশিয়ার দুই দেশ ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে ভালো অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। সমৃদ্ধি সূচকে ভারতের অবস্থান ১৪৬তম এবং পাকিস্তানের অবস্থান ১৫০তম। অন্যদিকে স্বাধীনতা সূচকে দেশ দুটির অবস্থান যথাক্রমে ১০৪তম ও ১১৩তম।

যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক থিংকট্যাংক আটলান্টিক কাউন্সিলের স্বাধীনতা ও সমৃদ্ধি কেন্দ্রের ‘ফ্রিডম অ্যান্ড প্রসপারিটি ইন বাংলাদেশ’ (বাংলাদেশে স্বাধীনতা ও সমৃদ্ধি) শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল ঢাকার যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে ইউনাইটেড স্টেটস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ইউএসএআইডি) এবং দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘প্রসপারিটি অ্যান্ড গুড গভার্নেন্স’ (সমৃদ্ধি এবং সুশাসন) শীর্ষক সম্মেলনে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। পরে সংক্ষেপিত প্রতিবেদনটি দূতাবাসের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। 

আটলান্টিক কাউন্সিলের প্রতিবেদনটি তৈরিতে সমৃদ্ধি সূচকের তালিকা করার জন্য স্বাস্থ্য, বৈষম্য, পরিবেশগত অবস্থা, সংখ্যালঘু অধিকার এবং শিক্ষাসহ মাথাপিছু জিডিপির মতো বিভিন্ন কারণ বিবেচনা করা হয়েছে। অন্যদিকে স্বাধীনতা সূচকের তালিকা করার জন্য রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং আইনি অবস্থার পরিমাপ করা হয়েছে। এর আলোকে গবেষণায় দেখা গেছে, মৌলিক স্বাধীনতা জোরদার করলে সেটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে গতিশীল করে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের মূল প্রতিবেদনে সমৃদ্ধি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে বলা হয়েছে ১৯৯৫ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সমৃদ্ধি সূচকে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্যভাবে ১৩ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। তালিকায় বারবার ওঠানামা হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ উন্নতি করেছে এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার আঞ্চলিক গড় পয়েন্ট থেকে ৩.৯ পয়েন্ট বেশি আছে। বাংলাদেশ বৈশ্বিক গড়ের সঙ্গেও ব্যবধান কমিয়ে এনেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুরুতে বাংলাদেশ বৈশ্বিক গড় থেকে ৯.১ পয়েন্ট পিছিয়ে থাকলেও বর্তমানে ৪.৮ পয়েন্ট পিছিয়ে রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অগ্রগতি সামগ্রিক সমৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক অগ্রগতির ওপর জোর দিয়ে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক প্রতিপক্ষের চেয়ে এগিয়ে রাখছে।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো ক্ষেত্রগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও বৈষম্য এবং পরিবেশগত স্থায়িত্বের বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলায় বাংলাদেশের আরও বেশি অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিতের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান আরও খারাপ হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত তিন দশকে বাংলাদেশে আয়ের ভালো উন্নতি হয়েছে। ১৯৯৫ সালের ১৩৮তম অবস্থান থেকে ২০২২ সালে বাংলাদেশ ১১২তম স্থানে উঠে এসেছে। গত তিন দশকে বাংলাদেশের আয়ের স্কোর ১৯.৮ পয়েন্ট বেড়েছে।

ন্যায়সঙ্গত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে এবং আয়ের বৈষম্য কমাতে আটলান্টিক কাউন্সিল প্রগতিশীল কর নীতিমালা বাস্তবায়ন, শিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধির কর্মসূচিতে বিনিয়োগ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের উদ্যোগের জন্য একটি সক্ষম পরিবেশ গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কর্মসংস্থানের কাঠামোগত সমস্যা সমাধান করা উচিত এবং একটি সর্বজনীন ও সমৃদ্ধিশালী অর্থনীতি তৈরি করতে ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা উচিত। আটলান্টিক কাউন্সিল মনে করে, বাংলাদেশকে একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে। শুধু সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি এবং শিক্ষার প্রসার বৃদ্ধিই নয়, শিক্ষার মান উন্নয়নের দিকেও লক্ষ রাখতে হবে।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় ধারাবাহিক অগ্রগতি এবং কাঠামোগত প্রচেষ্টার অভাব খুঁজে পাওয়া গেছে। বাংলাদেশকে এ সংকট সমাধানে আইনি কাঠামো এবং আইনি প্রতিষ্ঠানগুলোকে উন্নত করার দিকে মনোনিবেশ করতে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশে স্বাধীনতা ও সমৃদ্ধি শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি কর্র্তৃত্ববাদী দলীয় ব্যবস্থার দিকে শক্তিশালী পরিবর্তন এসেছে। বিরোধী দলকে বয়কট করে সেটি পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ তার পনেরো বছরের শাসনকাল টিকিয়ে রেখেছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা নারী সরকার প্রধান হতে যাচ্ছেন। এটি স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দিলেও কর্র্তৃত্ববাদী দলীয় ব্যবস্থাগুলো প্রায়ই বিভিন্ন ঝুঁকির মুখোমুখি হয় যা সুশাসনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এই ঝুঁকিগুলো কমানোর জন্য রাজনীতি, সরকারব্যবস্থা এবং অর্থনীতিতে সুস্থ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।

গতকাল সম্মেলনে বক্তৃতা দেওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাস বলেন, আটলান্টিক কাউন্সিল যে ১৬৪টি দেশকে তালিকাভুক্ত করেছে সেখানে (স্বাধীনতা সূচকে) ‘অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরাধীন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত দেশগুলো ‘সমৃদ্ধিশালী’ দেশ হিসেবে (সমৃদ্ধি সূচকে) তালিকাভুক্ত হয়নি। এটি থেকে বোঝা যায়, সমৃদ্ধিশালী হওয়ার জন্য বাংলাদেশকে জনগণের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আইনি স্বাধীনতা বৃদ্ধি করতে সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে।

তিনি বলেন, প্রতিটি দেশ দুর্নীতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার সুরক্ষিত করার ক্ষেত্রে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। সমস্যাগুলো এড়িয়ে না গিয়ে বরং সমস্যা মেনে নেওয়া ও সক্রিয়ভাবে সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করাই আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।

সম্মেলনের মূল বক্তা আটলান্টিক কাউন্সিলের স্বাধীনতা ও সমৃদ্ধি কেন্দ্রের পরিচালক জোসেফ লেমোইন প্রতিবেদনের মূল ফলাফলগুলো তুলে ধরেন। প্রতিবেদনে স্বাধীনতা সূচক এবং সমৃদ্ধি সূচকের ওপর ভিত্তি করে গণতান্ত্রিক এবং শাসন সূচক ব্যবহার করে একটি জাতির অর্থনৈতিক অবস্থানের মূল্যায়ন করা হয়েছে।

জোসেফ লেমোইন বলেন, তথ্যগুলো থেকে দেখা যায়, অধিক স্বাধীনতার দেশগুলো বেশি সমৃদ্ধি উপভোগ করে এবং কম স্বাধীনতার দেশগুলোর সমৃদ্ধি নিচের দিকে। একটি দেশ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে উন্নত করে একটি শক্তিশালী আইনি পরিবেশ তৈরি করার মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আরও বেশি স্বাগত জানাতে পারে।

তার মতে, অধিক স্বাধীন দেশগুলো কম স্বাধীন দেশের তুলনায় প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি পায়। সামগ্রিকভাবে স্বাধীনতা সূচক প্রস্তাব করে, স্বাধীনতার প্রতি দৃঢ় প্রতিশ্রুতি বিদেশি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করার মূল চাবিকাঠি।

সম্মেলনে সরকারের প্রতিনিধি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, দাতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের লোকজন উপস্থিত ছিলেন।