গত সপ্তাহেও ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ত্রাণকর্মীদের ওপর হামলা ও ত্রাণ সরবরাহে বাধা দেয়ার দায়ে প্রচণ্ড আন্তর্জাতিক চাপে ছিলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে ইরানের হামলার যেনো নতুন করে জীবন পেয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। বিবিসির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে কিছু তথ্য।
বিশেষ করে চলতি মাসের প্রথম দিনেই গাজায় ইসরায়েলের হামলায় সহায়তা সংস্থা ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের সাত ত্রাণকর্মী নিহত হওয়ার ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে পুরো বিশ্ব। এ ঘটনার পর বন্ধুতে ফাটল ধরেছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও নেতানিয়াহুর।
যদিও ১ এপ্রিল সিরিয়ার দামেস্কে ইরানি কনস্যুলেটেও হামলা চালায় ইসরায়েল। এতে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডারসহ সাত কর্মকর্তা নিহত হন। এর মধ্য দিয়ে দূতাবাসে হামলা চালানোর ওপর যে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তা লঙ্ঘন করে নেতানিয়াহু সরকার।
তবে ত্রাণকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় এক বিবৃতিতে ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কারণ ফিলিস্তিনের বেসামরিক লোকজন ও ত্রাণকর্মীদের রক্ষায় যথেষ্ট তৎপর ছিল না ইসরায়েল সরকার।
ওই ঘটনার পর নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন বাইডেন। সে সময় গাজায় বিপুল পরিমাণ ত্রাণ সরবরাহের সুযোগ, ত্রাণ প্রবেশে আরও সীমান্ত ক্রসিং খোলাসহ ইসরায়েলকে কিছু ছাড় দেওয়ার কথা তুলেছিলেন তিনি। এছাড়া ইসরায়েলের আশদাদ বন্দরও খুলে দেওয়ার কথাও বলেছিলেন বাইডেন। নেতানিয়াহুও পরিস্থিতি পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিলেও তেমন কিছুই করা হয়নি।
এছাড়া হোয়াইট হাউসের পাশাপাশি নিজ দেশেও সংসদে উগ্র জাতীয়তাবাদীদের চাপের মধ্যেও ছিলেন নেতানিয়াহু। তাঁদের সমর্থনেই ইসরায়েলে ক্ষমতায় রয়েছে নেতানিয়াহুর জোট সরকার। এই জাতীয়তাবাদীরা শুধু গাজায় অবাধ ত্রাণ সরবরাহের বিরোধীই নন, চলমান সংঘাত উপত্যকাটিতে আবার অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনের সুযোগ করে দেবে বলেও বিশ্বাস করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বৃদ্ধির সাথে সাথে আরেকটি জল্পনা তৈরি হয়েছিল যে ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা অস্ত্র ব্যবহারের ওপর শর্ত আরোপ করবে হোয়াইট হাউস। শনিবার ইরানের হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসে একটি মতামত প্রকাশ করা হয়। সেই মতামতে বলা হয়, নেতানিয়াহু ও তাঁর সরকারের কট্টরপন্থীরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘বিশ্বাস ভঙ্গ’ করেছেন।
এরপরই ইসরায়েলে প্রথমবারের মতো হামলা চালায় ইরান, যে হামলায় নতুন জীবন ফিরে পান নেতানিয়াহু। ইরানের ছোড়া তিন শতাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র রুখতে ইসরায়েলকে সহায়তা করে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্ররা। এছাড়া আরব দেশগুলোর জর্ডানও শনিবার ইরানের হামলা ঠেকাতে তৎপর ছিল।
ইরানের হামলার পর থেকেই আন্তর্জাতিক চাপ অনেকটাই কমে এসেছে নেতানিয়াহুর ওপর। মার্কিন সামরিক সহায়তার ক্ষেত্রে আরোপ বিভিন্ন শর্তের বদলে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন দেখাচ্ছে ওয়াশিংটন। এতে রাজনৈতিকভাবে নতুন কিছু সুযোগ পেয়েছেন নেতানিয়াহু।
তবে ইরানের হামলার পর নেতানিয়াহুর ওপর চাপের ধরন বদলেছে। বাইডেন স্পষ্টভাবেই ইসরায়েলকে পাল্টা আঘাত না হানার পরামর্শ দিয়েছেন। এছাড়া ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ‘লৌহবর্মের’ মতো মন্তব্য করেছেন বাইডেন। অর্থাৎ ইসরায়েলের পাশেই আছে যুক্তরাষ্ট্র।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যেন বড় পরিসরে যুদ্ধ ছড়িয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে দৌড়ঝাঁপ করছেন বাইডেন ও তাঁর প্রশাসন। যদিও একই সঙ্গে গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে ইসরায়েলকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র সরবরাহ করে যাচ্ছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এত সমর্থন পাওয়ার পরেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কোন আহ্বানই কানে তুলছেন না নেতানিয়াহু।
ইরানের হামলা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রসহ মিত্রদেশগুলোর সহায়তার কয়েক দিন পরও ইসরায়েল সেই আগের অবস্থান ধরে রেখেছে বলে মনে হচ্ছে। তারা শুধু বাইডেনের সংযত থাকার আহ্বানই এড়িয়ে যাচ্ছে না, একই সঙ্গে হামলা ঠেকাতে সহায়তাকারী অন্য দেশগুলোর অনুভূতিও উপেক্ষা করছে।
নেতানিয়াহুর দৃষ্টিভঙ্গিতে ইসরায়েলের সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু ইরান। তারা মনেপ্রাণে ইসরায়েলকে ধ্বংস করতে চায়। নেতানিয়াহুর মতো একই দৃষ্টিভঙ্গি অনেক ইসরায়েলির।
এদিকে ইসরায়েল হামলা চালালে আরও কঠোরভাবে জবাব দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ার করেছে ইরান। তাদের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান হোসেইন বাকেরি বলেছেন, ইসরায়েলে যে হামলা চালানো হয়েছে, তা ‘সীমিত’ ছিল। ইসরায়েল পাল্টা জবাব দিলে এবার তাদের ‘অনেক বড়’ খেসারত দিতে হবে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র বলছে ইসরায়েল ইরানে পাল্টা হামলা চালালে তাতে সহায়তা করবে না মার্কিন বাহিনী। তবে এটা বিশ্বাস করা কঠিন। কারণ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেছেন, ইসরায়েলের নিরাপত্তা রক্ষায় তাঁর প্রতিশ্রুতি ‘লৌহবর্মের’ মতো।
সব মিলিয়ে বলা চলে বড় ধরনের যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য। একই সঙ্গে গভীর হতে যাচ্ছে বৈশ্বিক সংকট।