বাংলা বর্ষবরণ বা নববর্ষ উদযাপন বাঙালির সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব। সারা দেশে নানা আয়োজনের মাধ্যমে উৎসবটি পালিত হয়। দেশব্যাপী শিক্ষালয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। ব্যবসায়ীরা এই দিনে পুরনো বছরের হিসাব শেষ করে নতুন বছরের হিসাব খোলেন। এ উপলক্ষে ব্যবসায়িক অংশীদার, ক্রেতা-বিক্রেতাকে চিঠি দিয়ে আমন্ত্রণ জানান ও মিষ্টিমুখ করান। নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর এই চিরায়ত কর্মসূচির বাইরেও দেখা যায় অভিনব উদ্যোগ। এমনই একটি উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবার নড়াইলের গুয়াখোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
গুয়াখোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায় একটি জায়গায়। অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কেউ হেঁটে, কেউ বাসে কিংবা কেউ ব্যক্তিগত গাড়িতে চড়ে উপস্থিত হয় বিদ্যালয়ে, কিন্তু গুয়াখোলা মাধ্যমিকের তিন শতাধিক শিক্ষার্থীসহ শিক্ষক-কর্মচারীর সবাই সাইকেলের সাহায্যে বিদ্যালয়ে আসেন। ব্যতিক্রমী এই বৈশিষ্ট্যের কারণে ইতিমধ্যেই বিদ্যালয়টি সারা দেশের মানুষের কাছে সুপরিচিত হয়ে উঠেছে। নববর্ষকে স্বাগত জানাতে তারা ঠিক করলেন এই বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরবেন। নববর্ষে তারা আয়োজন করলেন আশপাশের ১১টি গ্রাম জুড়ে ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সাইকেল শোভাযাত্রার।
পহেলা বৈশাখের সকালে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট পোশাক পরে মুখে শুভ নববর্ষ লিখে, সাইকেলের সামনে চিত্রিত কুলা নিয়ে শুরু করে এই ব্যতিক্রমী সাইকেল শোভাযাত্রা। কৃষক, শ্রমিক, বাউলসহ নানা সাজে সজ্জিত ও আল্পনা এঁকে শিক্ষার্থীরা সাইকেল র্যালিতে অংশ নেয়। এ সময় শিক্ষার্থীদের হাতে ছিল বর্ষবরণের প্লাকাড ও ফেস্টুন। সকাল ৭টায় শুরু হয় এই শোভাযাত্রা। সাইকেল র্যালির প্রথমে ছিল একটি ট্রাক ও সাউন্ড সিস্টেম। ট্রাক থেকে ভেসে আসছিল বর্ষবরণের গান। ১৫ কিলোমিটার সাইকেল র্যালিটি গুয়াখোলা, হাতিয়াড়া, বাকলি, মালিয়াট, কমলাপুর, রঘুরামপুর, দোগাছি, ঘোড়ানাছ, বেনাহাটী, বাকড়ীসহ পার্শ্ববর্তী ১১টি গ্রাম প্রদক্ষিণ করে। শিক্ষার্থীরা প্রতিটি গ্রামে ও যাত্রাপথের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে র্যালি বিরতি দিয়ে পথচারী ও গ্রামবাসীদের কুশল বিনিময় করে এবং মিষ্টিমুখ করায়। এ সময় তারা গান ও নৃত্য পরিবেশন করে। ব্যতিক্রমধর্মী এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে এলাকার মানুষের মাঝে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
ব্যতিক্রমধর্মী সাইকেল র্যালি চলাকালে রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত সাধারণ মানুষের হাত নেড়ে শিক্ষার্থীদের নববর্ষের শুভেচ্ছা জানান ও উৎসাহ জানায়। শিক্ষার্থীরাও সাইকেল থেকে হাত নাড়িয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষকে শুভেচ্ছা জানায়।
বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী অনন্যা সিংহ জানায়, বাংলা নববর্ষ উৎসব বাঙালি সংস্কৃতির সর্বজনীন উৎসব। এই উৎসবকে ঘিরে আমরা সাইকেল র্যালি করেছি। বিভিন্ন স্থানে বাংলা নববর্ষকে বরণ করতে ভ্রাম্যমাণ সংগীত ও নৃত্য পরিবেশন করা হয়েছে। মিষ্টিমুখ করা হয়েছে। আগেও আমরা নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নিয়েছি। আমাদের খুব ভালো লেগেছে।’
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পুষ্পিতা ভৌমিক এই আয়োজনে তার অংশগ্রহণ সম্পর্কে বলে, ‘বাঙালি জীবনে খুবই আনন্দের একটি দিন হলো পহেলা বৈশাখ। আমরা বাঙালি। তাই বাংলা বছরকে আমরা প্রতি বছরই উৎসবমুখর পরিবেশে বরণ করে থাকি। এ বছরও আমরা বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বরণ করেছি। এই অনুষ্ঠানে কোনো জাতি-ধর্ম ভেদাভেদ নেই। আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে দিনটা পালন করি। এই পহেলা বৈশাখ পালনের জন্য আমরা সাতদিন ধরে প্রস্তুতি নিয়েছি। আমরা সবার মুখে শুভ নববর্ষ লিখেছি। মাথায় ক্যাপ পরেছি। বিভিন্ন ধরনের প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন বানিয়েছি। পাখি, মাছ, নৌকা, পালকি, কৃষকসহ বিভিন্ন ধরনের বর্ষবরণ উপকরণ তৈরি করেছি। বর্ষবরণ উদযাপন করতে পেরে খুবই আনন্দিত।’
শিক্ষার্থীদের এমন আয়োজনে এলাকার মানুষও ভীষণ খুশি। স্থানীয় বাসিন্দা সাগর সেন জানান, বাংলা নববর্ষকে বরণ করতে দেশব্যাপী নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কিন্তু গুয়াখোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সাইকেল র্যালি করে ১১টি গ্রাম প্রদক্ষিণ করে গ্রামবাসীকে নববর্ষেও শুভেচ্ছা জানিয়েছে। এমন ব্যতিক্রমধর্মী অনুষ্ঠান অন্য কোথাও হয় বলে আমার জানা নেই।
সুকান্ত গোস্বামী বলেন, ‘গুয়াখোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের তিন শতাধিক ছাত্রছাত্রী সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাতায়াত করে থাকে। বর্ষবরণেও তারা সাইকেল নিয়ে ১১টি গ্রামে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছে। আমরা আশা করি, আগামীতেও এ ধরনের অনুষ্ঠান চালিয়ে যাবে।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ মন্ডল বলেন, গুয়াখোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের তিন শতাধিক শিক্ষার্থীকে নিয়ে আমরা সাইকেল র্যালি সহকারে এগারো খানের প্রত্যেকটি গ্রামে গিয়েছি এবং বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা বার্তা পৌঁছে দিয়েছি। যদি আমরা হেঁটে যেতাম তাহলে ১১টি গ্রাম প্রদক্ষিণ বা নববর্ষের শুভেচ্ছা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হতো না। এই প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ ছেলেমেয়ে ৬-৭ কিলোমিটার দূর থেকে সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাতায়াত করে। সে কারণে আমরা সাইকেল র্যালি করেছি। বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পরামর্শ নিয়ে এ বছর সাইকেল র্যালির পাশাপাশি বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে গান ও নৃত্য পরিবেশন করে বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নেওয়ার কর্মসূচি নিয়েছি। ভ্রাম্যমাণ সাংস্কৃতিক পরিবেশনার এই আয়োজনের মাধ্যমে আমরা চেষ্টা করেছি সংস্কৃতির সম্প্রীতির বার্তাকে ছড়িয়ে দিতে। আমরা আশা করি, ইতিবাচক সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টিতে এই আশানুরূপ ভূমিকা রাখবে। এ সময় সাধারণ মানুষকে মিষ্টিমুখ করা হয়েছে। আগামীতেও ব্যতিক্রমধর্মী অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকবে বলে আশা করি।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ মন্ডল, সহকারী শিক্ষক তাপস পাঠকসহ অন্য শিক্ষকরা। এর আগেও বিদ্যালয়টি ব্যতিক্রমধর্মী নানা আয়োজনে বাংলা নববর্ষকে বরণ করে আসছে।