প্রাকৃতিক সম্পদের মূল্য না জানলে প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষা করা কঠিন। এজন্য সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিতে প্রথমবারের মতো দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের মূল্য হিসাব করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর পাশাপাশি একজন মানুষ সারা জীবনে কত পানি ও অক্সিজেন ব্যবহার করে এবং এসবের আর্থিক মূল্য কত সেটিও নিরূপণ করা হবে।
এ জন্য ন্যাশনাল রিসোর্স অ্যাকাউন্টস (এনআরএ) তৈরি করছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। জাতিসংঘের এনভায়রনমেন্টাল ইকোনমিক অ্যাকাউন্টিং সিস্টেমের আওতায় এ কাজ করবে এনআরএ। ‘ন্যাশনাল রিসোর্স অ্যাকাউন্টস আন্ডার ইউএন সিস্টেম অব এনভায়রনমেন্টাল ইকোনমি অ্যাকাউন্টিং’ শীর্ষক এক সেমিনারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিসংখ্যান ভবন অডিটোরিয়ামে বিবিএস এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা-এফএও যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে। পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব ড. শাহনাজ আরেফিনের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়কমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. শহীদুজ্জামান সরকার এবং এফএও’র প্রতিনিধি জিয়াকুন সাই।
সেমিনারে সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে সম্পদের পরিমাণ এবং কোথায় আছে সেটা জানতে হবে। একইসঙ্গে এই সম্পদের মূল্য আমাদের জানতে হবে। এটার জন্য সম্পদের মূল্য হিসাব করা ছাড়া উপায় নেই। এ জন্য দেশে প্রথমবারের মতো প্রাকৃতিক সম্পদের মূল্য হিসাব করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিবেশমন্ত্রী বলেন, একটি প্রচলিত ধারণা হলো পরিবেশ ও উন্নয়ন পরস্পরবিরোধী। কিন্তু এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এ জন্যই টেকসই উন্নয়নের নীতি গ্রহণ করা হয়েছে, যেন দুটোই করা সম্ভব হয়। এখন বিশ্বব্যাপী পরিবেশের সঙ্গে যুদ্ধ চলছে। কিন্তু এই যুদ্ধে প্রকৃতি কখনই হারবে না। তাই পরিবেশকে বাদ দিয়ে উন্নয়ন হবে না।
তিনি বলেন, আগে গায়ের জোরে অনেকেই বন ও পরিবেশ ধ্বংস করত। কিন্তু এখন প্রভাব খাটিয়ে কিছু করা চলবে না। সবার আগে দেখতে হবে জাতীয় স্বার্থ। এজন্যই অ্যাকাউন্টস দরকার। সরকার বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ প্রকল্প হাতে নিচ্ছে জানিয়ে সাবের হোসেন বলেন, এর আওতায় আরও ১১টি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হবে। তখন প্রাকৃতিক সম্পদেরও লাইভ তথ্য পাওয়া আরও সহজ হবে। এসডিজি বাস্তবায়ন এখনো অনেক দূরে।
সনাতনী পদ্ধতিতে ইট পোড়ানো পরিবেশ ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি দাবি করে সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, আমরা ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। সনাতন পদ্ধতিতে ইট বানানোর কারণে বছরে ১৩ কোটি মেট্রিক টন মাটি ইটে ব্যবহার হচ্ছে। এতে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। পরিবেশ ও খাদ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বন উজাড় হচ্ছে, কৃষিজমির ক্ষতি হচ্ছে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মো. শহীদুজ্জামান সরকার বলেন, বেঁচে থাকাটাই এখন মানুষের অন্যতম চিন্তা। এই চিন্তা মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আর এই বেঁচে থাকার জন্য প্রকৃতির দ্বারস্থ হতে হয়। প্রাকৃতিক সম্পদের জরিপ বিষয়টি আমাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতোভাবে জড়িত, এটি বাঁচামরার বিষয়।
তিনি বলেন, এর ফলে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যভান্ডার আরও সমৃদ্ধ হবে। আমাদের তথ্যভান্ডার যত সমৃদ্ধ হবে ততই আমরা টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা নিতে পারব। এজন্য সঠিক জরিপ প্রয়োজন।
ড. শাহনাজ আরেফিন বলেন, প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে কিছু করার সুযোগ নেই। প্রকৃতির মধ্য থেকেই উন্নয়ন এগিয়ে নিতে হবে। প্রাকৃতিক সম্পদের যে অ্যাকাউন্টস করা হচ্ছে সেটির জন্য সবার সহায়তা প্রয়োজন।
সেমিনারে বিবিএস জানায়, দেশের, মাটি, পানি, বাতাস, বন, প্রাণিসম্পদসহ সব ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদের মূল্য হিসাব করা হবে। টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পরিবেশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। যেকোনো নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে এই অ্যাকাউন্টস ব্যাপক কাজে আসবে বলেও জানায় বিবিএস। এছাড়া প্রাকৃতিক সম্পদ, জীব-বৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধানে জাতিসংঘের সহায়তায় এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখানে ১৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ একসঙ্গে কাজ করবে।
বিবিএস বলছে, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, ঝড়-বৃষ্টিসহ বিভিন্ন ধরনের জলবায়ু পরিবর্তনশীলতা সাপেক্ষে ঘনঘন, নিয়মিত এবং বিধ্বংসী দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগ ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে স্থিতিস্থাপক দেশ। ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এদেশে একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুধু যে ঘন ঘন ঘটছে তা-ই নয়, এগুলোর বিধ্বংসী ক্ষমতাও বাড়ছে। ফলে, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে; দারিদ্র্য বাড়ছে; স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়ছে সর্বোপরি মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে আর্থ-সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া দরিদ্র মানুষই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বেই এসব ঘটছে। আমরা সিডর-আইলা-বুলবুলের মতো ধ্বংসাত্মক ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়েছি। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে বায়ুমন্ডলে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ ব্যাপক মাত্রায় বেড়েছে এবং উন্নত বিশ্বই মূলত এর জন্য দায়ী।