ইরানকে জবাব দিতে দ্বিধায় ইসরায়েল

ইরান প্রথমবারের মতো ইসরায়েলের ভূখন্ডে সরাসরি আঘাত হানে গত শনিবার রাতে। ইসরায়েল ওই হামলার পর পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানাতে বারবার বৈঠক করেছে। সরাসরি আক্রমণ, ইরানি স্বার্থে কাজ করা সংগঠনের ওপর আক্রমণ কিংবা সাইবার হামলা এসবের নানা জল্পনা থাকলেও কোনো কিছুই এখনো হয়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভুল হিসাব-নিকাশ করেছেন সিরিয়ার ইরানি কনস্যুলেটে হামলা চালিয়ে। বলা হচ্ছে, এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক চালচিত্রে এমন কিছু ঘটনা ঘটল, যা ইসরায়েল এবং নেতানিয়াহুর জন্যও নয়। অন্যদিকে ইসরায়েল যদি তার হিসাব-নিকাশের ভুল চুকাতে ইরানে বড় পরিসরে হামলা চালায়, তাহলে তা আঞ্চলিক সংঘাতের দ্বার খুলে দিতে পারে।

সিরিয়ার দামেস্কে ইরানি কনস্যুলেটে হামলা চালিয়ে তেহরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) তিন শীর্ষ জেনারেলসহ ১৪ জনকে হত্যার জবাবে ইসরায়েলি ভূখ-ে তিন শতাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। এক হাজার কিলোমিটার দূরে ইসরায়েলের নাকাব বিমান ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। র‌্যামন ঘাঁটিতেও হামলা চালানো হয়, তাও আবার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে। ইরানের ধারণা, নাকাব ঘাঁটিতে মজুদ রয়েছে এফ-৩৫আই অ্যাডির স্টিলথ যুদ্ধবিমান, যা দিয়ে হামলা চালানো হয়েছিল দামেস্কে।

ইসরায়েলে হামলার সময় ইরান পরিপূর্ণ আয়োজন নিয়ে অগ্রসর হয়নি। হামলার আগে তারা প্রতিবেশী দেশগুলোকে এ নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছিল। রাডার জ্যাম করার মতো যুদ্ধকালীন কাজেও তারা যায়নি। মোটাদাগে হামলাটি প্রতীকী। ইরান গত কয়েক মাসে সিরিয়ায় তার বেশ কয়েকজন আইআরজিসি যোদ্ধাকে হারিয়েছে। এ কারণে তার জন্য হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়াটা ততটা কঠিন ছিল না। ইসরায়েলের অজেয় মনোভাবেই ধাক্কা দিতে চেয়েছে ইরান। দীর্ঘকাল দুপক্ষ ছায়াযুদ্ধের মধ্যে লিপ্ত থাকলেও এবার সরাসরি সংঘাতের মুখে দাঁড়িয়ে।

এ নিয়ে আইআরজিসির কমান্ডার হোসেই সালামি বলেন, ‘আমরা একটি নতুন সমীকরণ তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা তাদের (ইসরায়েল) বিরুদ্ধে প্রতিশোধ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছি।’

হামলার পর আঞ্চলিক সংঘাত এড়াতে পশ্চিমা বিশ্ব ইসরায়েলকে ইরান আক্রমণের দিক থেকে দূরে থাকতে আহ্বান জানিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইরানি হামলা ঠেকানোর ‘জয়ের মনোভাব’ গ্রহণ করতে আহ্বান জানাচ্ছেন। কিন্তু গতকাল ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সঙ্গে আলাপের পর নেতানিয়াহু নিজ সিদ্ধান্তে জবাব দেওয়ার কথা বলেছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বলছে, ইরানকে পাল্টা জবাব দেওয়ার প্রশ্নে বিতর্ক রয়েছে ইসরায়েলি যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায়। এ কারণে গত কয়েক দিন বারবার হামলার গুঞ্জন শোনা গেলেও তা সত্যি প্রমাণিত হয়নি।

অনেকে বলছেন, পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে, এর মাধ্যমে নেতানিয়াহুর ওপর চাপ আরও বাড়বে। গাজা যুদ্ধের মধ্যে জিম্মি মুক্তি নিয়ে তার সরকার কোনো ইতিবাচক কিছু করতে পারছে না। এর মধ্যে ইরানের হামলা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াবে দেশে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের হামলাটি নিয়ে ইসরায়েলি নাগরিকরা এখন প্রতিনিয়ত ভাবছে। নেতানিয়াহুর শাসনে ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত। গাজা থেকে হামাস কর্তৃক গত বছর ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইরানের আক্রমণ দেখল ইসরায়েলিরা। এ অবস্থায় নিজেকে ‘মিস্টার সিকিউরিটি’ পরিচয় দেওয়া নেতানিয়াহুর প্রশ্নে ইসরায়েলিদের ক্ষোভ আরও বাড়বে।

তেল আবিবভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডালিয়া শিন্ডলিন বলেন, ‘নেতানিয়াহুর বিষয়টি বিবেচনার বাইরে রাখলে, গোটা বিষয়টি ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠাতাদের ও ইসরায়েলি প্রজন্মগুলোর ব্যর্থতা। জায়নাবাদকে আপনি সমর্থন করুন বা না করুন, এটি ইহুদিদের নিরাপদ আবাসের নিশ্চয়তার কথা বলেছিল। একটি জায়গায় নিরাপদে সবার নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাসের কথা ছিল।’