বৃষ্টিহীন এপ্রিলে দেশ জুড়ে তীব্র থেকে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে; যাতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। এবারের গরম ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে চলতি এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় এসে। বৈশাখের শুরু থেকে দেশের বেশিরভাগ এলাকায় তাপপ্রবাহ শুরু হয়। এর মধ্যে গতকাল শনিবার এক দিনের ব্যবধানে রাজধানীসহ সারা দেশে তাপমাত্রা বেড়েছে ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, আগামী কয়েক দিনে তাপমাত্রা কমার সম্ভাবনা নেই; বরং তাপমাত্রা একই রকম থাকবে, সঙ্গে বাড়বে গরমও।
তীব্র গরমে শহর কিংবা উপকূলীয় এলাকা সবখানেই জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে গতকাল দেশের বিভিন্ন জায়গায় হিট স্ট্রোকে (গরমজনিত কারণে মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ) তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। হিট স্ট্রোক থেকে শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে আগামী এক সপ্তাহ স্কুল ও কলেজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
তীব্র তাপপ্রবাহ থেকে বাঁচতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনামন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন। তিনি বলেন, যারা বয়স্ক ও শিশু তারা যেন প্রয়োজন না থাকলে ঘরের বাইরে না যায়। সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে, যাতে করে কেউ কোনো রোগে আক্রান্ত না হয়। তা ছাড়া হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচতে ডাবের পানি, স্যালাইন ও তরল জাতীয় খাবার খেতে হবে।
এবারের এপ্রিলে যে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা থাকবে তা আগেই জানিয়েছিল আবহাওয়া অধিদপ্তর। কারণ চলতি মাসে কয়েকটি মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যাবে। এ মাসে বৃষ্টিপাতও হবে স্বল্প। মাস জুড়ে গরমের আধিক্য থাকবে।
এবারের এপ্রিলের তাপপ্রবাহের আরেকটি দিক হলো এর বিস্তৃতি বেশি। সারা দেশে এই তাপপ্রবাহ ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণত দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও রাজশাহী বিভাগের কয়েকটি জেলায় এপ্রিল মাসে বেশ কয়েকটি তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। এসব তাপপ্রবাহ তিন থেকে পাঁচ দিনের বেশি স্থায়ী হয় না। তবে এবার ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে এসব জেলায়। ধারাবাহিকভাবে এই অঞ্চলের সব জেলায় তাপপ্রবাহ দীর্ঘ হচ্ছে।
গতকাল অতি তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলাগুলোয়। সেই সঙ্গে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণও বেড়েছে। যে কারণে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে। গতকাল দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় যশোরে ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটি এই মৌসুমে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। এর পরের অবস্থানে ছিল চুয়াডাঙ্গা। এ জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪২ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ ছাড়া মোংলায় ৪১ দশমিক ৭, কুমারখালীতে ৪১ দশমিক ২, খুলনায় ৪১ দশমিক ২ এবং সাতক্ষীরায় ৪০ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়।
ঢাকায় তাপমাত্রা ও গরম দুটোই বেড়েছে : রাজধানী ঢাকার তাপমাত্রা গত শুক্রবার ৩৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠেছিল। তবে এক দিনের ব্যবধানে গতকাল তা ২ ডিগ্রি বেড়ে ৪০ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠেছে। এ সময় বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কমেছে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কমে গেলেও গরমের তীব্রতা কম ছিল না; বরং ঢাকায় গতকাল গরম অনুভূত হয়েছে ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে। জলীয় বাষ্প না কমলে গরম আরও কয়েক ডিগ্রি বেশি অনুভব হতো।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সারা দেশেই তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। কয়েক দিনের তুলনায় তাপপ্রবাহ বেড়েছে। আপাতত গরম থেকে নিস্তার পাওয়ার কোনো সুখবর নেই। চলতি মাস জুড়েই আবহাওয়ার পরিস্থিতি এমন থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সারা দেশের জন্যই হিট অ্যালার্ট দিয়েছি। শুধু সিলেট, চট্টগ্রাম ও রংপুরে তাপপ্রবাহ অন্য জেলার তুলনায় সামান্য কম। তবে গরমের অনুভূতি মোটেও কম না। বেশ ভালোই। চট্টগ্রামে দিনের তাপমাত্রা কম হলেও রাতে বেশি। দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণে গরম বেশি অনুভব হচ্ছে।’
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, রাজশাহী, পাবনা, টাঙ্গাইল জেলাসহ খুলনা বিভাগের ওপর দিয়ে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া চাঁদপুর, মৌলভীবাজার জেলাসহ ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগের অবশিষ্টাংশ এবং বরিশাল বিভাগের ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এই তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্ভাভাসে আরও বলা হয়, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের দুয়েক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে শিলা বৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া দেশের অন্যত্র অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে।
আজ রবিবারের পূর্বাভাসে বলা হয়, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের দুয়েক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে শিলা বৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া দেশের অন্যত্র অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। আজও বিরাজমান তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে। জলীয় বাষ্পের আধিক্যের কারণে অস্বস্তি বিরাজ করতে পারে।
আগামীকাল সোমবারের পূর্বাভাসে বলা হয়, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের দুয়েক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে শিলা বৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া দেশের অন্যত্র অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। একইভাবে বিরাজমান তাপপ্রবাহও অব্যাহত থাকতে পারে।