বারবার বিনা ভোটে ভাইস চেয়ারম্যান!

কুমিল্লার লাকসামে বিনা ভোটে নির্বাচিত হওয়ার যে স্টাইল ইউনিয়ন পরিষদে দেখা গেছে, উপজেলায়ও তা বজায় রয়েছে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আবার উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন মহব্বত আলী। তিনি টানা তৃতীয়বারের মতো এই পদে নির্বাচিত হচ্ছেন।

প্রথম ধাপে যে ১৫০ উপজেলা পরিষদের নির্বাচন হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে লাকসাম একটি। তবে এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নির্বাচনের আমেজ নেই। ভোট নিয়ে চায়ের দোকান, রাস্তার মোড়ের আড্ডায়ও নেই আলোচনা।

জানা গেছে, মহব্বত আলী ছাড়াও ভাইস চেয়ারম্যান পদে অনলাইনে কাগজপত্র জমা দিয়েছেন রাসেল আহমেদ নামে একজন। যাচাই-বাছাই শেষে তার কাগজপত্রে ভুল থাকায় তাকে বাদ দিয়েছে জেলা নির্বাচন কমিশন। এতে করে মহব্বত আলীর প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো প্রার্থী মাঠে নেই। তিনি আগেরবারও একই পদে বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

এ বিষয়ে রাসেল আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, উপজেলা পরিষদের সামনে তার একটি কম্পিউটারের দোকান রয়েছে। কীভাবে ফরম পূরণ করতে হয়, সেটি জানতে তার ফরম পূরণ করা। আর কিছু না। জেলা নির্বাচন কমিশনার তার ফরম বাতিল করেছে।

বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান মহব্বত আলী বলেন, ‘মন্ত্রীর আত্মীয়রা কেউ ভালো পোস্টে থাকলে তারা কি নির্বাচন করতে পারবেন না। আর দল সবকিছু উন্মুক্ত করে দিয়েছে। যে কেউ নির্বাচন করতে পারবেন। কেউ যদি দলীয় প্রভাব খাটিয়ে অন্যায় কিছু করে তার শাস্তি তাকেই পেতে হবে। এতে আমি হই আর যে কেউ হই।’ তিনিও চান সবার অংশগ্রহণের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন।

অন্যদিকে চেয়ারম্যান পদে তিনজন মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে দুজন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাদের একজন হলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. ইউনুস ভূঁইয়া। অন্যজন হলেন উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সহসভাপতি ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদস্য শম্ভু সাহা। ইউনুস ভূঁইয়া এ নিয়ে টানা তিনবার প্রার্থী হয়েছেন। ২০১৪ সালে ভোটে, ২০১৯ সালে বিনা ভোটে চেয়ারম্যান হয়েছেন তিনি। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর অনুসারী তিনি। ইউনুস ভূঁইয়া ও শম্ভু সাহা উপজেলা আওয়ামী লীগের একই কোরামের লোক। ফলে শম্ভু সাহাকে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটাররা ‘ডামি’ প্রার্থী হিসেবে দেখছেন। যদিও মো. ইউনুস ভূঁইয়া বলেন, ‘নির্বাচন হবে। প্রার্থী আছেন। ভোটাররা যাকে ইচ্ছা ভোট দেবেন।’

নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা যায়, চেয়ারম্যান পদে ইউনুস ভূঁইয়া ও শম্ভু সাহা ছাড়াও বিকাশ চন্দ্র সাহা নামে আরেকজন প্রার্থী রয়েছেন। বিকাশ জাসদের (ইনু) নেতা। তবে লাকসামে দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম খুবই সীমিত। আর মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হয়েছেন পড়শী সাহা ও মিতা সাহা। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ২২ এপ্রিল। ভোটগ্রহণ হবে আগামী ৮ মে।

মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের (এমপি) সন্তান, পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয়-স্বজনদের উপজেলা পরিষদ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু কুমিল্লা-৯ আসনের লাকসাম ও মনোহরগঞ্জ উপজেলার চিত্র ভিন্ন।

ওই নির্বাচনী এলাকার এমপি ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম নিরপেক্ষ থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আওয়ামী ও সহযোগী সংগঠনের যে কেউ চাইলে প্রার্থী হতে পারেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ কোথাও একে অন্যের বিরুদ্ধে বিষোদগার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। দলীয় মনোনয়ন না থাকায় এবারের উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। যারা কাজের মাধ্যমে জনগণের মন জয় করতে পেরেছেন, অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন, মানুষকে ন্যায়বিচারের মাধ্যমে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেছেন, তারা উপজেলা নির্বাচনে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।

নাম না প্রকাশ করার শর্তে উপজেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেন, বড় ভাই নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। তাদের সঙ্গে কী আর কেউ নির্বাচন করতে পারে। তাই এ উপজেলায় নির্বাচনের আমেজ নেই।

এর আগে লাকসাম ও মনোহরগঞ্জ উপজেলার সব ইউনিয়ন পরিষদে বিনা ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। মেম্বারদের প্রায় সব পদে ভোট হয়নি। ওই সময় সম্ভাব্য বেশ কয়েকজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিতে না পেরে ঢাকায় এসে নির্বাচন ভবনের সামনেও মানববন্ধন করেছেন।