ব্যর্থতায় শেষ ইসরায়েলের বড়াই!

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইকোমিস্ট’-এ গত ১১ এপ্রিল একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর মূলকথা ছিল ‘গাজায় ইসরায়েলি জেনারেলদের ব্যর্থতার পাশাপাশি জায়নবাদী নেতাদের নৈতিক শৃঙ্খলার অভাব ও নৈরাজ্যের কারণে গাজায় নৈতিক পরাজয় এবং সামরিক সংঘাতের বাড়বাড়ন্ত দেখছে ইসরায়েল।’ ওই প্রতিবেদেন ইসরায়েলি প্রশাসনের দুটি বিপর্যয়কর ব্যর্থতার চিত্র উন্মোচন করা হয়। একটি হচ্ছে- গাজায় সামরিক উদ্দেশ্য পূরণ হয়নি ইসরায়েলের এবং দ্বিতীয়টি হলো- ইসরায়েল অনৈতিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি যুদ্ধের আইন লঙ্ঘন করেছে। এসব কৃতকর্মের দায় রাষ্ট্র হিসেবে যেমন ইসরায়েলের, তেমনি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীরও (আইডিএফ)। বর্তমান ইসরায়েলি প্রশাসনের দ্বিধা প্রকাশ্যে এসেছে। গত ১৪ এপ্রিল ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে ইরান যেভাবে মুহুর্মুহু ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে, তার জবাবে ইসরায়েলের জবাব দেওয়ার কার্যক্রমে পরিপূর্ণ সংহতি দেখা যায়নি। সামরিক নেতৃত্বের দিক থেকে ইরানকে জবাব দেওয়ার প্রশ্নে সক্রিয়তার সংকট দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ আরব বিশ্বের বিশ্বাসঘাতক ইসরায়েলি মিত্ররা ইরানের শিয়া মতাবলম্বী ইসলামি বিপ্লবের সমর্থক গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কর্মকর্তাদের বক্তব্যকে হালকাভাবে নিচ্ছে না। ইরানের মিলিটারি স্পেস ফোর্সের কমান্ডার মেজর জেনারেল আমির আলি হাজিজাদেহ বলেছিলেন, ‘আমরা পুরনো অস্ত্র ব্যবহার করি। তবুও আমরা ন্যূনতম শক্তিতে ইসরায়েল ও পশ্চিমাদের অতিক্রম করেছি।’ ইরানি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ইসরায়েলের পাল্টা জবাব দেওয়া নিয়ে ইসরায়েলি সাংবাদিকরা ছিলেন উৎসাহী। যেমন জায়নবাদী মতাদর্শের গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিক এমিলি শ্রেডার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গত ১৯ এপ্রিল একটি চূড়ান্ত হঠকারী স্বপ্নের কথা তুলে ধরেন। তার ভাষ্য ছিল এমন ‘যুক্তরাষ্ট্র ও জায়নবাদী প্রশাসনের ইরানের ইসফাহান পরমাণু কেন্দ্রসহ মোট সাত শহরে হামলা চালানো উচিত।’ কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, ইসফাহানের আকাশে স্বল্পপাল্লার ড্রোনের মতো কিছু দেখার পর ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে তা ধ্বংস করে দেয়। ইরানকে এই হামলা ঠেকাতে কোনো ক্ষেপণাস্ত্রপ্রতিরোধী ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হয়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, পাল্টাপাল্টি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ইসরায়েলি প্রশাসন বুঝতে পারছে না যে, তাদের সক্ষমতা ইরানের যুদ্ধ সক্ষমতার চেয়ে শ্রেয়তর। কারণ ইসরায়েল একাই ইরানের আক্রমণ মোকাবিলা করতে পারেনি, বরং পশ্চিমা বিশ্ব ও আরব বিশ্বের মিত্রদের সহযোগিতায় তেল আবিব সেই হামলা রুখতে সমর্থ হয়েছে। স্পষ্টত, জায়নবাদী প্রশাসনের মিত্রদের ছাড়া ক্ষয়ক্ষতি হতে পারত আরও বেশি। ইরানের পরিচালনা করা ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ’ অভিযানের মাধ্যমে তেহরান মূলত কিছু নির্দিষ্ট জায়গায় আঘাত করেছে এবং ইসরায়েলি নেতৃত্বের মধ্যকার সংহতির অভাবকে উন্মোচন করেছে। বিষয়টি পরিষ্কার করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’। গোটা পরিস্থিতির সাপেক্ষে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষার যে ক্ষতি হলো তার জন্য প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে দায়ী করেছেন বিরোধীনেতা ইয়ার লাপিদ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার কথাটি ছিল এমন ‘প্রধানমন্ত্রী ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। এই ব্যর্থ সরকারকে বাড়ি যেতে হবে এবং সরকারের মন্ত্রীদের কথা কম বলতে হবে।’ এ অবস্থায় ইসরায়েলের তেল আবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে। অনেক ইহুদি ইউরোপে তাদের বৈধ বসবাসের অধিকারকে কাজে লাগিয়ে দেশত্যাগ করছে। ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’-এর ধারণা, গাজার ব্যর্থতা এবং ইরানের বিরুদ্ধে পরাজয়মূলক পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ইহুদি জনগোষ্ঠীর চলে যাওয়ার সংখ্যা ৪০ লাখে পৌঁছতে পারে। এর ফলে আরব এবং ইসরায়েলি জনগোষ্ঠীর মধ্যে জনসংখ্যার হিসাব-নিকাশ পাল্টে যেতে পারে।

ইসরায়েলি প্রশাসনের কর্মকান্ড অব্যাহত থাকলে ১৪ এপ্রিলের রাত ফিরে আসতে পারে। এর ফলে পারস্য সাগরের উপকূল থেকে ছোড়া ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র নেগেভ মরুভূমির নেভাতিম বিমানঘাঁটিতে পড়তে পারে যা আয়রন ডোম, ডেভিডস সিøংশট দিয়েও প্রতিরোধ করা যাবে না।