জলাশয় সবুজায়নে মিলবে রক্ষা

যে এলাকায় জলাশয় ও সবুজায়ন বেশি সেই এলাকায় তাপমাত্রার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কম। অর্থাৎ পুকুর-নদী ও সবুজ কমে যাওয়ার সঙ্গে তাপমাত্রা বাড়ার একটা সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়া বৈশ্বিক উষ্ণায়নও তাপমাত্রা বাড়ার জন্য দায়ী।

আর সেজন্যই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবুজায়ন বাড়ানো ছাড়া গতি নেই। আর তা নিশ্চিত করতে শহরগুলোতে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী ৬০ শতাংশের বেশি এলাকায় কংক্রিটের স্থাপনা করা যাবে না। পার্ক, ঈদগাহ ও খেলার মাঠগুলো কংক্রিটের চাদর থেকে বাইরে রাখতে হবে।

চট্টগ্রাম মহানগরীর এক সিআরবি রক্ষার জন্য সাধারণ মানুষ একটানা ৪৮৪ দিন আন্দোলন করেছিল। যাতে নগরীর মাঝখানের এই এলাকার গাছগুলো হাসপাতাল নির্মাণ থেকে রক্ষা পায়। সর্বশেষ আন্দোলন করেছিল এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র‌্যাম্প নির্মাণের জন্য যাতে শতবর্ষী গাছ কাটা না পড়ে। এখন এই সিআরবি ও নগরীর আগ্রাবাদ এলাকার অনুভূত তাপমাত্রার পার্থক্য প্রায় ৪ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের নগর অঞ্চল বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সভাপতি ড. রাশিদুল হাসান গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী প্রতিটি প্লটের আয়তনের ৬০ শতাংশে শুধু ভবন নির্মাণ করা যাবে। বাকি ৪০ শতাংশ জায়গা সবুজ রাখতে হবে। কিন্তু আমরা বাকি ৪০ শতাংশের পুরোটা জায়গায় পেভমেন্ট (ইট বা সিমেন্টের ঢালাই) করে ফেলি। এতে পুরো প্লটটি ইট-পাথরের প্লটে পরিণত হচ্ছে। এভাবে পুরো নগরীর ইট-পাথরের নগরীতে পরিণত হচ্ছে।’

রাশিদুল হাসানের বক্তব্যের সত্যতা খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, চট্টগ্রামের জমিয়তুল ফালাহ ময়দানের সামনের বিশাল মাঠটি একসময় সবুজ ছিল। কিন্তু এক দশক আগে পুরো ময়দানটি ইট-পাথরের কংক্রিট দিয়ে ঢালাই করে দেওয়া হয়েছে। নগরীর বিপ্লব উদ্যান একসময় সবুজ উদ্যান ছিল। এটি এখন পুরোটাই ইটের স্থাপনায় রূপ নিয়েছে। জাম্বুরি মাঠ একসময় সবুজ মাঠ ছিল, যা পরে সবজিক্ষেত হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এ মাঠের একপাশে শিশুপার্ক গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে কোনো সবুজ বা মাটি নেই। পুরো এলাকাটি পেভমেন্ট করে ফেলা হয়েছে। জাম্বুরি মাঠে দৃষ্টিনন্দন ফোয়ারা কিংবা ঘাস লাগালেও ফোয়ারার পানি চলাচলের ড্রেনেজটি পাকা, পুরো মাঠের অধিকাংশ জায়গা পেভমেন্ট করা। এভাবে নগরীর ফুটপাত থেকে শুরু করে নগরবাসীর বাসাবাড়ির সামনের জায়গাগুলো পেভমেন্ট দ্বারা আবৃত।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) বোর্ড সদস্য আশিক ইমরান বলেন, ‘পেভমেন্ট বেড়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই তাপমাত্রা প্রতিফলিত হয়। মাটিতে সবুজায়ন থাকে না। ফলে পুরো এলাকাটি উত্তপ্ত হয়ে পড়ে। আর এরই ফল ভোগ করছি আমরা।’

বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের প্রেসিডেন্ট আশিক বলেন, নগরীতে পুকুর ও জলাশয় যখন বেশি ছিল তখন গরমের অনুভূত তাপমাত্রা কম ছিল। কিন্তু পুকুর ও জলাশয় কমে যাওয়ায় এখন আর তাপ শোষণের কিছু নেই।

তার এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. সারা নওরিন। তিনি বলেন, ‘পুুকুর জলাশয় ও পেভমেন্ট এরিয়া বাড়লে গরমের মাত্রা বাড়বে তা জানার জন্য বিজ্ঞানী হতে হয় না। সাধারণ মানুষই বুঝতে পারে। কোনো এলাকায় ভূপৃষ্ঠস্থ পানি যত বেশি থাকবে এবং সবুজায়নের পরিমাণ বেশি থাকবে সেই এলাকায় গরমের মাত্রা অবশ্যই কমে আসবে।’

সবুজায়ন কমে যাওয়ার কারণে অনুভূত তাপমাত্রা যেমন বেড়ে গেছে তেমনি ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রাও বেড়ে গেছে বলে জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বিশ্ব জুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে আমাদের শহরগুলোতে যুক্ত হয়েছে ইট-পাথরের জঞ্জাল বেড়ে যাওয়া। আমরা ভবনগুলোতে যেমন উন্মুক্ত স্থান রাখি না তেমনিভাবে নগরায়ণের থাবায় ভরাট হয়ে যাচ্ছে পুকুর ও জলাশয়। এতে তাপ শোষণ হচ্ছে না।’

আবহাওয়া অধিদপ্তরের উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত শনিবার যখন যশোরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪২ দশমিক ৬, চুয়াডাঙ্গায় ৪২ দশমিক ৪, কুমারখালীতে ৪১ দশমিক ২ ও ঢাকায় ৪০ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড হয়েছে তখন দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রংপুর, দিনাজপুর, সিলেট, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কুমিল্লা কিংবা নোয়াখালীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৩৫ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ সিলেটে হাওর ও পাহাড় থাকার কারণে ওই এলাকায় তাপমাত্রার পারদ বেশি ওঠেনি। তেমনিভাবে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায়ও একই অবস্থা। ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনায় হাওরের আয়তন বেশি থাকায় ওই এলাকায় তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে কম।

এপ্রিল মাসে দেশে স্বাভাবিকভাবেই তাপমাত্রা বেশি থাকে। তবে এবার তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) একটি সমীক্ষায় দাবি করা হয়েছে, ১৯৯৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ঢাকার জলাশয় ৩১ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৬০ শতাংশ হয়েছে, যেখানে একটি শহরে কমপক্ষে ১২ শতাংশ জলাভূমি থাকা প্রয়োজন। চট্টগ্রামেও সবুজায়নের পরিমাণ কমে প্রায় ৭ শতাংশে নেমে এসেছে বলে স্থপতি আশিক ইমরান জানান।

গত কিছুদিন ধরে দেশে অত্যধিক মাত্রায় গরম পড়ছে। এতে সারা দেশে রেড অ্যালার্টও জারি করা হয়েছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে স্কুল-কলেজ।