ড্যারিয়েন গ্যাপ! রহস্য আর ভীতিতে পরিপূর্ণ এক সরুপথ, যা অবস্থিত লাতিন আমেরিকার দেশ পানামায়। যুক্তরাষ্ট্রগামী ‘অবৈধ’ অভিবাসীরা প্রায়ই তাদের স্বপ্নযাত্রায় বেছে নেয় পথটিকে। আধুনিক বিশ্বে মার্কিন-মুল্লুকে যাওয়ার স্বপ্ন বোনার শুরু হয়েছে যখন থেকে, তখন থেকে ঠিক কত মানুষ যে এই পথে প্রাণ হারিয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। ভয়ংকর দুর্গম মৃত্যুযাত্রার পথটি আরও একবার আলোচনায়। কারণ পানামার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উপনীত হওয়া এক প্রার্থী পথটি চিরতরে বন্ধ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সত্যিই কি বন্ধ হবে? উত্তর বলবে, ‘সময়’। কারণ নানা পক্ষ পথটি বন্ধ করার কথা বললেও শেষ পর্যন্ত তা ফলপ্রসূ হয়নি। আবার মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো পথটি বন্ধের বিরুদ্ধে।
বিশ্বের অভিবাসীদের জন্য যে কয়টি বিপজ্জনক পথ রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম কলম্বিয়া-সীমান্তবর্তী পানামার সরুপথ ড্যারিয়েন গ্যাপ। দীর্ঘপথের পরতে পরতে বন্ধুর পথের নানা চ্যালেঞ্জই শেষ কথা নয়; বরং পথে পথে অভিবাসীদের পড়তে হবে মাদক কারবারির সামনে। সেই সঙ্গে থাকবে বিষাক্ত পোকামাকড় আর সাপের উপদ্রব। মাদক কারবারিদের কাছে সর্বস্ব হারাতে হতে পারে। নারীদের অভিবাসীদের নিপীড়নও এই পথের স্বাভাবিক বিপত্তি। এ পথের নানা জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে মানুষের মাথার খুলিসহ নানা অঙ্গ, যা বুঝিয়ে দেয় কতটা সংকটজনক এ রাস্তা।
গত বছর পাঁচ লাখ অভিবাসী ড্যারিয়েন গ্যাপ পাড়ি দিয়েছে, যাদের মধ্যে ১ লাখ ২৩ হাজারই শিশু। হাজারো প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও অভিবাসীরা এই পথের মাধ্যমে সোনালি স্বপ্ন ছোঁয়ার আশা ছাড়েনি।
পানামার বর্তমান নিরাপত্তামন্ত্রী জোসে রাহুল মুলিনো চলতি বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত টেক্সাসে হওয়ার পরিবর্তে পানামায় স্থানান্তরিত হয়েছে। আমরা ড্যারিয়েন গ্যাপ বন্ধ করতে যাচ্ছি। আমরা সবাইকে ফেরত পাঠাতে যাচ্ছি।’ অবশ্য তার এমন ঘোষণায় মানবাধিকার সংগঠনগুলো স্বভাবতই ফুঁসে উঠেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠী ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’-এর কর্মকর্তা জুয়ান প্যাপিয়ার বলেন, ‘আমার কোনো ধারণা নেই, তাদের মাথায় কী চলছে। ড্যারিয়েন গ্যাপ বন্ধ করা অসম্ভব।’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পথ বন্ধ হলে অন্য পথে আরও দুর্গম পথে পাড়ি জমাবে অভিবাসীরা।
ড্যারিয়েন গ্যাপের দৈর্ঘ্য ১৬০ কিলোমিটারের মতো এবং এর প্রস্থ ৬০ কিলোমিটার। পাহাড়, রেইনফরেস্ট আর সরু স্থলপথ নিয়ে পুরো গ্যাপটি বিস্তৃত। অনেক জায়গায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কোনো কর্তৃত্ব নেই। কয়েক দশক ধরে মাদক কারবারি গোষ্ঠীগুলোর অভয়ারণ্য এই পথ। ভেনেজুয়েলা, কিউবা, হাইতির মতো দেশগুলো থেকে মানুষ এই পথে পাড়ি জমায় বেশি। সারা বিশ্বের নানা পিছিয়ে পড়া দেশগুলো থেকেই মানুষ এই পথের আমেরিকা যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। সম্পূর্ণ ভুতুড়ে আর রোমহর্ষক এক যাত্রায় দশকের পর দশক থেকে পাড়ি জমাচ্ছে মানুষ।