যুক্তরাষ্ট্র না জড়ালে যুদ্ধ কি হবে?

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী এক দশকের বেশি সময় ধরে ইরানের সঙ্গে ছায়াযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। হত্যা ও হামলার বহু ঘটনা ঘটিয়েছেন। পরমাণু বিজ্ঞানী ও ইরানের ভাড়াটে বাহিনীর সৈন্যদের খুনের দায় স্বীকার না করলেও গুপ্ত হত্যা চলেছে অবাধে। কিন্তু ৭ অক্টোবরের পর ইসরায়েলের এই তালিকার ব্যাপ্তি আরও বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ ইরানের জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা সৈয়দ রাজি মৌসাভি দামেস্কে খুন হন। ইরানের প্রতিক্রিয়া তখনো ছিল পরোক্ষ ও দুর্বল। সিরিয়ার রাজধানীতে ইরান দূতাবাসের বর্ধিত অংশে বোমা হামলার পর দেশটির প্রতিক্রিয়ার ধরন বদলে দেয়। ওই হামলায় দেশটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা খুন হন।

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ নিয়ে নানা হিসাব-নিকাশ চলছে। আরও বড় পরিসরে এই দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হবে কি না, সেই সমীকরণ মেলাতে এখন ব্যস্ত সবাই। আপাত এই সংক্ষিপ্ত হামলা ও পাল্টা হামলায় কার কতটুকু লাভ বা ক্ষতি হলো, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশেষজ্ঞরা। আসলে এই যুদ্ধ কোন দিকে মোড় নেবে, তা বলা মুশকিল। কারণ, এই যুদ্ধ এখন আর ইরান-ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অনেক দেশই এই যুদ্ধে ইতিমধ্যেই নানাভাবে জড়িয়ে পড়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, ইসরায়েল যে তাৎপর্যপূর্ণ জবাব দেওয়ার কথা বলছে, তার ধরন কী হবে। ইরানও পাল্টা হামলা চালাবে কি না, সেই প্রশ্নও আছে জনমনে। পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। ইসরায়েলের সব থেকে বড় ব্যর্থতা হচ্ছে, অনেক চেষ্টা করেও এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি এই যুদ্ধে যুক্ত করতে পারেনি। ইসরায়েলকে রক্ষার অঙ্গীকার করলে যুদ্ধে যুক্ত হতে বা ইরানে হামলা করতে যুক্তরাষ্ট্র অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সম্ভবত এ কারণেই এই যুদ্ধ আর না-ও বাড়তে পারে।

দুটি জিনিস যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধ থেকে বিরত রাখতে পারে। আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়ায় দীর্ঘ যুদ্ধের ধকল টানতে টানতে যুক্তরাষ্ট্রসহ তার মিত্র এখন ক্লান্ত। ইউক্রেনের যুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি। এতেই প্রমাণিত হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র খুব বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে নেই; বিশেষ করে ইউরোপের পক্ষে নতুন করে আর কোনো বড় সংঘাতের বোঝা টানা সম্ভব নয়। যেখানেই যুদ্ধ শুরু হোক না কেন, শরণার্থীরা সব ইউরোপে এসে উপস্থিত হয়। সিরিয়া ও ইউক্রেনের মিলিয়ে এক জার্মানিতেই ৩০ লাখের মতো শরণার্থী অবস্থান করছে। এ অবস্থায় ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হলে দুই দেশ থেকেই দলে দলে শরণার্থী ইউরোপের দিকে যাত্রা শুরু করবে। শুধু এই দুই দেশই নয়; এদের প্রতিবেশী দেশের শরণার্থীরাও এই যাত্রায় যুক্ত হবে। এ অবস্থায় যুদ্ধের পক্ষে ইউরোপের সায় আগের মতো না-ও থাকতে পারে। বিপরীতে ইরান রাশিয়া ও চীনের সমর্থন পাচ্ছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির সঙ্গে কথা বলেছেন। চীন সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পরামর্শ দিয়ে বলেছে, ইরান একাই পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম। এর পাশাপাশি আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইরাক ও তুরস্কের সমর্থন মিলে যাবে ইরানের জন্য। এ অবস্থায় মৌন সম্মতির ইউরোপ, দূরের দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি, জর্ডান, মিসরের সমর্থন ইসরায়েলের জন্য সুবিধাজনক না-ও হতে পারে।

যথাসময়ে প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল। এই যথাসময় আগামী বছরও হতে পারে। যদি সব পক্ষকে যুদ্ধের জন্য রাজি করাতে পারে এবং ইরানের পেছন থেকে রাশিয়া ও চীনের ছায়া সরে যায়, তবে শিগগিরই ইসরায়েল হামলা করবে। কেউ কেউ বলছেন, ইরানের হামলায় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সুবিধা হবে। এমনিতেই তিনি স্বস্তিতে নেই। প্রতিনিয়তই ইসরায়েলে বিক্ষোভ হয়। অর্থনৈতিক অবস্থা খুব ভালো নয়। নতুন করে যুদ্ধ নেতানিয়াহুর রাজনীতিকে বাঁচিয়ে দিতে পারে। আবার এর বিপরীত মতও আছে। হামাস বা ইরানের হামলা ইসরায়েলের সামরিক খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। স্বভাবতই অতিরিক্ত সামরিক খরচের প্রভাব সার্বিকভাবে অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। ইরান ও হামাস সম্ভবত এটাই চাইছে। ইসরায়েলে হামলা করে তাদের খরচ বৃদ্ধি করা। সামরিক যুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে পেরে উঠবে না হামাস। ইরান পারবে কি না, তা-ও নিশ্চিত নয়। কিন্তু ইসরায়েল যে দুর্ভেদ্য বা অজেয় নয়, এটা যদি প্রমাণ করা যায়, তবে ইসরায়েলের নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার ভয় বাড়বে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতাকে যুক্ত করা গেলে ইসরায়েলের অবস্থা আরও নাজুক হবে। দ্রুত না হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এর সুফল পাওয়া যাবে। কারণ, ইসরায়েলের নাগরিকদের বেশির ভাগই অভিবাসী। তারা বিভিন্ন দেশ থেকে এসে বসতি স্থাপন করেছে। তাদের মধ্যে ইসরায়েল ত্যাগের হারও বাড়ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্নভাবে ইরানকে কোণঠাসা করে ফেলছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। সর্বশেষ সিরিয়ায় ইরানের দূতাবাসে হামলার পর ইরানের হাতে আর কোনো বিকল্প ছিল না। ইরান যদি পাল্টা হামলা না করত বা চুপচাপ হজম করে বসে থাকত, তবে পরবর্তী সময় ইসরায়েলের হামলা আরও বাড়ত ইরানের প্রতি। একই সঙ্গে ইরানি শাসকেরা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যও ইসরায়েলে হামলা করে থাকতে পারেন। সব থেকে বড় কথা হচ্ছে, এই যুদ্ধ ইরান হারুক বা জিতুক, যা-ই হোক না কেন, মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব কার্যত ইরানের হাতে এখন। কারণ, ইরান ছাড়া আর কোনো মুসলিম-অধ্যুষিত দেশ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এতটা সরাসরি কথা বলছে না। সুতরাং এই যুদ্ধ এখন আর ছায়াযুদ্ধ থাকছে না, এই যুদ্ধ প্রকাশ্য। তেহরান এখন আর লেবাননের হিজবুল্লাহ কিংবা ইয়েমেনের হুতিদের পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারবে না। নেতানিয়াহু তেহরানকে একরকম মল্লযুদ্ধে ডেকে এনেছেন।

 লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক

raihan567@yahoo.com