‘মটুকপুর, কোলকোন্দ, চিরাখাল, বিনবিনিয়া গ্রাম তিস্তার পেটত গেইছে। মটুকপুর গ্রামত মোর আট বিঘা জমি আছিল সউগ তিস্তা খাইছে। এলা ভিটামাটি যেখনা আছে সেখনাও ভাঙবার নাগছে। আবাদ করমো কি দিয়া টাকা নাই। কাইয়ো হামাক ধার দেয় না। তাই গরুর হাল ধরি চরত যাওছি। ভোটের সময় সবাই কয় তিস্তার কাম হইবে। ভোট শ্যাষ সব শ্যাষ।’
রংপুর, গঙ্গাচড়ার তিস্তাপাড়ের কৃষক আতিয়ার রহমানের এই বেদনা শুধু একজন কৃষকের নয়। এর মধ্যে আছে নদীর ভাঙনে ঘর, জমি ও জীবিকা হারানো হাজার হাজার মানুষের দীর্ঘশ্বাস। সরকারের পর সরকার এসেছে, প্রতিশ্রুতি এসেছে, কিন্তু তিস্তার ভাঙন থামেনি। হবো হবো করে মহাপরিকল্পনার কাজ এখনো আলোর মুখ দেখেনি। তিস্তার পাড়ে এমন কথা শুনলেই আমার স্কুলজীবনের প্রিয় কবিতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই বিঘা জমি’র উপেনকে মনে পড়ে। উপেনের ছিল দুই বিঘা জমি। সেটুকুও হারিয়ে তার পৃথিবী শূন্য হয়ে গিয়েছিল। ১৮৯৫ সালে লেখা সেই কবিতার উপেন আর আজকের তিস্তাপাড়ের কৃষকের মধ্যে শত বছরের বেশি সময়ের ব্যবধান। কিন্তু মাটি হারানোর বেদনায় তারা যেন একই মানুষ।
স্কুলে পড়ার সময় কবিতাটির গভীরতা বুঝতাম না। সুযোগ পেলেই আবৃত্তি করতাম ‘শুধু বিঘে দুই ছিল মোর ভুঁই, আর সবই গেছে ঋণে।’ উপেনের জন্য মায়া হতো। তখন জানতাম না, জীবনের অনেক পরে এসে সেই উপেনকেই আমি তিস্তার পাড়ে দেখতে পাব। আমার জন্ম কুড়িগ্রামের দালদলিয়ায়, তিস্তার কাছাকাছি। শৈশবের প্রথম পাঠশালা ছিল নদীর পাড়, চর, কাশবন, ধানক্ষেত আর বর্ষার জল। বাবার চাকরির সূত্রে তিস্তা-ব্রহ্মপুত্রের নানা জনপদে থেকেছি। নদী আমার কাছে কোনো দূরের ভূগোল নয়; নদী আমার শৈশবের সঙ্গী। ছোটবেলায় তিস্তাকে দেখেছি কোথাও এক থেকে দেড় কিলোমিটার প্রস্থে। এখন কোথাও কোথাও নদী ও বালুচরের বিস্তার আট-দশ কিলোমিটার। বছরের পর বছর ভাঙনে মানুষ ঘর হারাচ্ছে। আবার কোনো চরে পলি পড়ে জমি জাগলে চোখের পানি মুছে সেই জমিতেই কৃষক চাষ করতে নামছেন। কারণ তার কাছে মাটি মানেই জীবন। উপেনের দুই বিঘা জমি ছিল তার পৃথিবী। তিস্তাপাড়ের কৃষকের এক বিঘা, দুই বিঘা কিংবা পাঁচ বিঘা জমিও তার পৃথিবী। উপেনের জমি কেড়ে নিয়েছিল মানুষের তৈরি ক্ষমতার অন্যায় কাঠামো; তিস্তাপাড়ের কৃষকের জমি কেড়ে নিচ্ছে নদীর ভাঙন। কারণ আলাদা, কিন্তু মাটি হারানোর বেদনা একই। কিন্তু জমি হারানোর পরও কৃষকের লড়াই থামে না। টিকে থাকা জমি কিংবা নতুন জেগে ওঠা চরে আবার কৃষি শুরু করেন তিনি। তারপর লড়াই করতে হয় বীজ, সার, সেচ, কৃষিযন্ত্র, ঋণ, উৎপাদন ব্যয়, সংরক্ষণ ও বাজারের সঙ্গে। কৃষক উৎপাদন করেন, কিন্তু ফসল বিক্রির সময় বাজারের শর্ত অনেক ক্ষেত্রেই তার হাতে থাকে না। অভাবের তাড়নায় কম দামে ফসল বিক্রি করতে হয়। জমির মালিক হয়েও অর্থনৈতিক শক্তির দিক থেকে তিনি দুর্বল থাকেন। এই সংকট সমাধানে তিস্তাপাড়ে কৃষক সমবায়ের প্রয়োজন।
সমবায় মানে কৃষকের জমির মালিকানা কেড়ে নেওয়া নয়। জমি থাকবে কৃষকের নিজের। কিন্তু উৎপাদনের উপকরণ, কৃষিযন্ত্র, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনে কৃষকের সম্মিলিত শক্তি তৈরি হবে। একটি গ্রাম বা কয়েকটি গ্রামের কৃষকেরা মিলে বীজ, সার ও কৃষি উপকরণ কিনতে পারেন। ট্রাক্টর, হারভেস্টারসহ কৃষিযন্ত্র যৌথভাবে ব্যবহার করতে পারেন। গুদাম, ফসল সংগ্রহকেন্দ্র ও প্রয়োজন অনুযায়ী হিমাগারও গড়ে উঠতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাজার। কৃষক যেন মাঠ থেকে ফসল তুলে অভাবের তাড়নায় কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য না হন। সমবায় ফসল সংগ্রহ করবে, সংরক্ষণ করবে, বাজারদর জানবে এবং বড় ক্রেতার সঙ্গে সরাসরি দরকষাকষি করবে। ধান হলে চাল, দুধ হলে দুগ্ধজাত পণ্য, ফল-সবজি হলে প্রক্রিয়াজাত পণ্য সম্ভব ক্ষেত্রে কৃষকেরাই মূল্য সংযোজন করবেন। এতে কৃষক শুধু কাঁচামাল উৎপাদক থাকবেন না; বাড়তি মূল্যেরও অংশীদার হবেন।
তিস্তাপাড়ের চরাঞ্চলে ধান, ভুট্টা, ডাল, তেলবীজ, সবজি, ফল, মাছ, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি ও মৌচাষকে সমবায়ের আওতায় আনা যেতে পারে। বহুমুখী কৃষি গড়ে উঠলে কৃষকের সারা বছরের আয়ও বৈচিত্র্যময় হতে পারে। বন্যা, ভাঙন ও খরার ঝুঁকির সঙ্গে খাপ খাওয়াতেও সমবায়ভিত্তিক পরিকল্পনা করা সম্ভব। রাষ্ট্রের ভূমিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র সমবায়কে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেবে না, আবার একা বাজারের হাতেও ছেড়ে দেবে না। সহজ শর্তে ঋণ, প্রাথমিক মূলধন, কৃষিযন্ত্রে সহায়তা, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, সংরক্ষণাগার, প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, কৃষিবীমা ও বাজারতথ্যের সুযোগ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে সমবায়ের অর্থ ও পরিচালনায় স্বচ্ছতা, সদস্যের ভোটাধিকার, নিয়মিত নিরীক্ষা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এই ভাবনার শিকড় আমাদের নিজেদের মাটিতেই আছে। রবীন্দ্রনাথ শুধু ‘দুই বিঘা জমি’র উপেনকে সৃষ্টি করেননি, কৃষকের বাস্তব জীবন নিয়েও কাজ করেছেন। পতিসরে কৃষি সমবায় ব্যাংকের মাধ্যমে কৃষককে মহাজনী ঋণের ফাঁদ থেকে বের করে আনার চেষ্টা করেছিলেন। তার পল্লী পুনর্গঠনের ভাবনায় কৃষি, শিক্ষা, কারিগরি জ্ঞান, গ্রামীণ শিল্প ও আত্মনির্ভরতার সমন্বিত ধারণা ছিল। তাই তিস্তাপাড়ের কৃষক সমবায়ের স্বপ্ন কোনো বিদেশি ধারণার অন্ধ অনুকরণ নয়। আমাদের ইতিহাসেই তার বীজ আছে। আজ প্রশ্ন হলো ভাঙন, ঋণ, উৎপাদন ব্যয় ও দুর্বল বাজারব্যবস্থার মধ্যে কৃষক কীভাবে নিজের অর্থনৈতিক শক্তি গড়ে তুলবেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনাকেও নতুন করে দেখতে হবে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা শুধু নদী খনন, তীররক্ষা, পানি ব্যবস্থাপনা কিংবা জমি পুনরুদ্ধারের প্রকল্প হলে চলবে না। নদীর সঙ্গে যারা বেঁচে আছেন, সেই কৃষক ও চরবাসীর জীবন-অর্থনীতিকেও এর কেন্দ্রে রাখতে হবে। নদী ও জমি পুনরুদ্ধারের সঙ্গে আধুনিক কৃষি, সেচ, কৃষক সমবায়, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষিবীমা ও বাজারব্যবস্থা যুক্ত হলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা শুধু নদী ব্যবস্থাপনার প্রকল্প থাকবে না; হয়ে উঠতে পারে উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্জাগরণের ভিত্তি। তিস্তাপাড়ে রাষ্ট্রীয় সহায়তায়, কিন্তু কৃষকের নেতৃত্বে কৃষক সমবায় গড়ে উঠতে পারে। সরকার দিতে পারে প্রাথমিক মূলধন ও অবকাঠামো, ব্যাংক দিতে পারে সহজ শর্তে ঋণ, কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান দিতে পারে প্রযুক্তি, স্থানীয় প্রশাসন দিতে পারে বাজার ও যোগাযোগের সহায়তা। আর উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনের বড় অংশের দায়িত্ব নিতে পারে কৃষক সমবায়। রাষ্ট্র কৃষকের জায়গা দখল করবে না; বরং কৃষককে বাজারে নিজের হয়ে দাঁড়ানোর শক্তি দেবে। আমার স্কুলজীবনের সেই আবৃত্তির দিনগুলো আজও মনে পড়ে। তখন উপেনের হয়ে আবৃত্তি করতাম, কিন্তু তার গভীরতা বুঝতাম না। আজ তিস্তার পাড়ে দাঁড়িয়ে যখন কোনো সর্বহারা কৃষককে বলতে শুনি, ‘এই জমিটুকুই তো ছিল’, তখন মনে হয় উপেন তো এখনো বেঁচে আছে। শুধু তার নাম বদলেছে, তার দুর্ভোগের চেহারা বদলেছে।
‘দুই বিঘা জমি’ তাই আমার কাছে এখন আর শুধু একটি কবিতা নয়; এটি তিস্তাপাড়ের সর্বহারা কৃষকেরও কণ্ঠস্বর। উপেনের দুই বিঘা আর তিস্তাপাড়ের কৃষকের এক বিঘা, দুই বিঘা কিংবা পাঁচ বিঘার মধ্যে শত বছরের দূরত্ব থাকলেও মাটি হারানোর বেদনায় তারা যেন একই মানুষ। কিন্তু আজ আমাদের কাজ শুধু সেই কান্না শোনা নয়; কান্নার কারণ বদলানোর পথ খোঁজা।
কৃষককে শুধু ত্রাণ দিয়ে বাঁচানো যাবে না। তাকে দিতে হবে জমির নিরাপত্তা, পুনর্বাসন, উৎপাদনের শক্তি, ন্যায্য বাজার, সঞ্চয়ের ক্ষমতা এবং সম্মিলিত অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান।
তিস্তাপাড়ের কৃষকের হাতে তাই শুধু কোদাল নয়, সমবায়ের শক্তিও তুলে দিতে হবে। তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের ছয় দফা দাবিতেও কৃষকের জীবন-জীবিকার এই বৃহত্তর প্রশ্নটি রয়েছে। তাই তিস্তা মহাপরিকল্পনা আর প্রতিশ্রুতি ও সমীক্ষার চক্রে আটকে থাকার বিষয় হতে পারে না। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতি এবং দফায় দফায় সমীক্ষার চক্কর নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের গভীর হতাশা তৈরি হয়েছে।
তিস্তার অববাহিকায় বসবাসকারী লাখ লাখ মানুষের জীবন, জীবিকা এবং পরিবেশগত নিরাপত্তার সঙ্গে এই মহাপরিকল্পনাটি জড়িত। তাই এটি কেবল কোনো খসড়া প্রকল্প বা রাজনৈতিক আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। নদী, জমি, কৃষি ও মানুষের জীবনকে একসঙ্গে নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ, বৈজ্ঞানিক ও সময়বদ্ধ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। নদীকে ফিরিয়ে দিতে হবে তার প্রাণ, কৃষককে দিতে হবে জমি ও জীবিকার নিরাপত্তা আর কৃষিকে দিতে হবে সমবায়ী শক্তির নতুন ভিত্তি। স্কুলের সেই ছেলেটি যে একদিন উপেনের হয়ে আবৃত্তি করত, আজ তিস্তার পাড়ে দাঁড়িয়ে বলতে চায়, উপেনকে আর একা রেখো না, তিস্তাপাড়ের কৃষককেও নয়। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করো আর সেই মহাপরিকল্পনার হৃদয়ে রাখো নদী, মানুষ, কৃষক ও তাদের সমবায়ী ভবিষ্যৎ।
লেখক : শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক ও সভাপতি তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ