তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা। গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির ফলে ঢাকা এবং শহরাঞ্চলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আগের চেয়ে উন্নতি হলেও গ্রামে লোডশেডিং পিছু ছাড়ছে না। তীব্র গরমে বিদ্যুতের অভাবে জনজীবন হয়ে উঠেছে বিপর্যস্ত। আমদানিকৃত এলএনজির (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) পাশাপাশি তরল জ্বালানির (তেল) ওপর ভর করে লোডশেডিং সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রমতে, গরম বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট বেড়ে বর্তমানে গড়ে প্রায় ১৫ হাজার থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াট দাঁড়িয়েছে। চাহিদার তুলনায় প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদন হচ্ছে। তবে প্রকৃতপক্ষে এ ঘাটতির পরিমাণ এক থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
গত বছর বিদ্যুতের চাহিদা ধরা হয়েছিল ১৬ হাজার মেগাওয়াট। এ বছর চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট হতে পারে বলে পিডিবি প্রক্ষেপণ করেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে দিনে গ্যাসের চাহিদা ২৩২ কোটি ঘনফুট। কিন্তু সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ করা যায় না কখনই। এবার গ্রীষ্মে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ধরা হয়েছে ১৮ হাজার মেগাওয়াট। এজন্য কয়লা ও অন্যান্য জ্বালানির পাশাপাশি অন্তত ১৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের দাবি জানিয়েছে পিডিবি।
এ মাসের শুরুর দিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ১০০ কোটি ঘনফুটেরও কম গ্যাস সরবরাহ করা হলেও তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩৫ কোটি ঘনফুট। মূলত আমদানিকৃত এলএনজি পরিমাণ বৃদ্ধির কারণেই গ্যাসের সরবরাহ বেড়েছে। আগে যেখানে গড়ে প্রতিদিন ৬০ কোটি ঘনফুট এলএনজি আমদানি করা হতো, সেটি এখন ১০০ কোটিতে উন্নীত হয়েছে।
পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মূলত গ্যাসের সরবরাহ বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি আগের চেয়ে সহনীয় হয়েছে। গত বছর গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেলেও এবার তা ৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। এটা বিশাল সাপোর্ট। এরপরও কিছু লোডশেডিং হচ্ছে মূলত গ্রামে। শহরে কিন্তু তেমন অভিযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, লোডশেডিং করতে হলে সব জায়গায় করতে হবে। সবাই যেন সমান বিদ্যুৎ সুবিধা পান সেজন্য আমরা বলেছি, এটাকে সমতার ভিত্তিতে বিতরণ করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বিদ্যুতের চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। আমরা আজকেও লোড ম্যানেজমেন্ট কমিটির মিটিং করেছি। সেখানে বিদ্যুতের উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রয়োজনে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়িয়ে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণের জন্য পিডিবিকে বলা হয়েছে। ডিমান্ড সাইট ম্যানেজমেন্টের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। যেমন এলাকাভিত্তিক মার্কেটগুলো বন্ধ ভিন্ন ভিন্ন দিনে হওয়া, রাত ৮টার পর দোকানপাট বন্ধ এ বিষয়গুলো যথাযথভাবে মনিটরিংয়ের বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী হওয়ার জন্য সচেতন হওয়ার বিষয়গুলোও কার্যকর করার জন্য বলা হয়েছে। সাধারণ মানুষকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে সরকার।’
ঢাকার পাশের জেলা গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার ফুলবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা আসাদুল্লাহ লায়ন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সারা দিনে ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাওয়া-আসা করছে। সব মিলে দিনে গড়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। এই গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় খুব কষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারছি না।’
বেশিরভাগ সময় রাত ১০টা থেকে ভোররাত ৪টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না বলে অভিযোগ করেছেন কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার বরুহা গ্রামের বাসিন্দা ও সমাজকর্মী আশীষ তালুকদার। তিনি জানান, এ গরমে বিদ্যুতের যন্ত্রণায় সবাই অতিষ্ঠ। দিনে অন্তত ১২ থেকে ১৫ বার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করে। খুবই কঠিন সময় পার করছে গ্রামের মানুষ। প্রায় একই অবস্থা উপজেলা শহরেও।
রমজান মাস ও গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ সেবায় কোনো ভোগান্তি পোহাতে হবে না বলে বিদ্যুৎ বিভাগ দেশবাসীকে আশ্বস্ত করলেও গেল রমজানে ভয়াবহ লোডশেডিং ছিল। তবে তাপমাত্রা যে হারে বেড়েছে সেই তুলনায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। গত বছর লোডশেডিং ছিল দুই থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট। এ বছর তা কমে এখন পর্যন্ত এক থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াটের মতো। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এলাকাভেদে গড়ে ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী মাস পর্যন্ত এ অবস্থা থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
খুলনা ও বরিশাল এবং ঢাকা বিভাগের বৃহত্তর ফরিদপুরের শহরাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এএইচএম মহিউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, চাহিদা অনুযায়ী ৭৪৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার ফলে তার বিতরণ এলাকায় কোনো লোডশেডিং নেই।
ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাদের বিতরণ এলাকাতেও বর্তমানে লোডশেডিং নেই।
উত্তরাঞ্চলে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বাইরের এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন) মো. আবদুর রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগের চেয়ে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির বেশ উন্নতি হয়েছে। রবিবার ৭৬৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ১৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম সরবরাহ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ নিয়ে আপাতত কোনো সমস্যা নেই। ব্যালান্সিং অবস্থায় রয়েছে।
পাবনার ঈশ্বরদীর বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম জানান, ঈদের পর রবিবার পর্যন্ত লোডশেডিং ছিল না। তবে গতকাল দুপুরের দিকে দুই ঘণ্টা লোডশেডিং হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৬ হাজার মেগাওয়াট। সক্ষমতা থাকলেও চাহিদা অনুসারে বিদ্যুৎ উৎপাদিত না হওয়ার জন্য জ্বালানি সংকট এবং কেন্দ্র মেরামত ও সংরক্ষণের জন্য বন্ধ থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন কর্মকর্তারা। এ ছাড়া বিতরণ ও সঞ্চালন লাইনের ত্রুটির কারণে প্রায় বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, চাহিদা অনুসারে বিদ্যুতের সরবরাহ ঠিক রাখতে মূলত বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া বিল পরিশোধ ও জ্বালানি কিনতে ডলার ও টাকার ঘাটতিতে রয়েছে সেটা কতটা পূরণ হবে তার ওপর নির্ভর করছে। জরুরি ভিত্তিতে ডলার ও ভর্তুকির টাকা ছাড় করতে অর্থ বিভাগকে অনুরোধ করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, গরমের কারণে অনেকে নতুন করে এসি বসাচ্ছেন। এতে অনুমোদনের চেয়ে বেশি লোড ব্যবহার করছেন বিদ্যুৎ গ্রাহকরা। ফলে গ্রাহকের লাইন চাপ নিতে না পারায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও তাই ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ না পেয়ে লোডশেডিংয়ের অভিযোগ করছেন গ্রাহকরা।