সাবেক বর্তমান দুই মন্ত্রীর অনুসারীরা মুখোমুখি

দশম জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে টানা তিনটি সংসদে সংরক্ষিত আসনের এমপি ও অর্থ প্রতিমন্ত্রী ওয়াসিকা আয়েশা খান। দলের প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় নেতা বাবা আতাউর রহমান খান কায়সারের সুযোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে নিজের আলাদা অবস্থানও করে নিয়েছে আওয়ামী লীগে। কিন্তু সাবেক মন্ত্রী সাইফুজ্জামান জাবেদের অনুসারীদের দাপটে নিজ এলাকা আনোয়ারার রাজনীতিতে ছিলেন অনেকটা কোণঠাসা অবস্থায়। স্বচ্ছন্দে কোথাও একটা জনসভাও করতে পারেননি। তবে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের পর জাবেদের মন্ত্রিত্বের অবসান আর ওয়াসিকার মন্ত্রিত্ব লাভে সেই চিত্র পাল্টে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। গত শনিবার বঙ্গবন্ধু টানেলসংলগ্ন গোলচত্বরে ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের নামে বড় ধরনের সমাবেশের মাধ্যমে শোডাউন দেয় অর্থ প্রতিমন্ত্রী ওয়াসিকা আয়েশা খানের অনুসারীরা। যাকে অনেকে বলছেন আনোয়ারা ও কর্ণফুলীর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নতুন দিন। কেউ কেউ বলছেন, দক্ষিণ চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেই নতুন মেরূকরণ হতে যাচ্ছে এর মধ্যে দিয়ে।

কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর উত্তরসূরি হিসেবে বাবার মৃত্যুর পর চট্টগ্রাম-১৩ আসনের উপনির্বাচনে নবম জাতীয় সংসদে প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হন উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত ব্যবসায়ী নেতা সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। এর ধারাবাহিকতায় দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদেও এমপি নির্বাচিত হন তিনি। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তাকে ভূমি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। আর পরবর্তী সরকারে করা হয় ভূমিমন্ত্রী। একজন সফল মন্ত্রী হিসেবে সুনামও কুড়ান তিনি। আগে দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকলেও এমপি হওয়ার পর থেকে আনোয়ারা ও কর্ণফুলীর আওয়ামী লীগের রাজনীতির ওপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন জাবেদ। তবে তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ কিছু লোকের কারণে দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ একসময় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। তাদের মতে, হাইব্রিডরাই এ সময় মন্ত্রীর চারপাশ ঘিরে বসেন। থানা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে দলীয় কমিটিগুলোতে স্থান পায় এদের অনুসারীরাই।

দলীয় নেতাকর্মীরা জানান, আগের সরকারের প্রভাবশালী এই মন্ত্রী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। অন্যদিকে ওয়াসিকা আয়েশা খানকে সংসদে প্রথমে সংরক্ষিত আসন থেকে এমপি করা হয় এবং এরপর সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপরই নতুন মেরূকরণ ঘটতে থাকে আনোয়ারা-কর্ণফুলীর রাজনীতিতে। দীর্ঘদিন ধরে দলের ভেতর কোণঠাসা ও নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকা দলের নেতাকর্মীদের ভিড় জমাতে থাকে ওয়াসিকার পেছনে। এর আগে কয়েক দফা ওয়াসিকা এলাকায় গেলে ক্রমেই ভারী হতে থাকে অনুসারীদের সারি। আনোয়ারা ও কর্ণফুলীতে ওয়াসিকাকে দেওয়া দুটি সংবর্ধনায় জাবেদ অনুসারী আওয়ামী লীগ নেতারা না গেলেও যোগ দেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা। এতে অনেকটা ক্ষিপ্ত জাবেদ ও তার অনুসারীরা।

জাবেদের এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে মার্চের শেষ সপ্তাহে আনোয়ারা উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে। সেখানে জাবেদ বলেন, ‘আমি এই এলাকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্য। এখানে কোনো দ্বৈত শাসন চলবে না। সব আমার নির্দেশে চলবে। কে কোন বড় পদ পেয়েছে, তা দেখার বিষয় নয়।’ তিনি বলেন, ‘আমার এলাকায় কেউ রাজনৈতিক অনুষ্ঠান করতে চাইলে এক সপ্তাহ আগে প্রশাসন থেকে অনুমতি নিতে হবে।’

জাবেদের ওই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ প্রতিমন্ত্রী ওয়াসিকা আয়েশা খান গত শনিবারের অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমাকে অনেক ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। কাজ করতে দেওয়া হয়নি। কাজ করতে গেলে রাস্তা কেটে দেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ভদ্রতা মানে দুর্বলতা নয়। আমি পালানোর মানুষ নই। শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত জনগণের সেবা করে যাব।’

এদিকে জাবেদের ওই বক্তব্য সাধারণ জনগণ ও দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক সমালোচিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ বক্তব্যেও কঠোর সমালোচনা করেন অনেকেই। এরপর ওয়াসিকাকে সামনে রেখে আরও জোরালোভাবে মাঠে নামেন আনোয়ারা আওয়ামী লীগের চার সাবেক নেতা। তারা হলেন থানা আওয়ামী লীগের দুই সাবেক সভাপতি আবুল কালাম চৌধুরী ও কাজী মোজাম্মেল হক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল মনসুর চৌধুরী ও দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ নেতা ডা. নাসির উদ্দিন মাহমুদ। তারা প্রতিটি এলাকায় নিষ্ক্রিয় নেতাকর্মীদের সক্রিয় করে মাঠে নামানোর চেষ্টা করছেন।

দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে আনোয়ারা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি কাজী মোজাম্মেল হক বলেন, ‘কিছু ব্যক্তির কারণে আনোয়ারা-কর্ণফুলীর ত্যাগী নেতাকর্মীরা দীর্ঘদিন রাজনীতির মাঠের বাইরে ছিলেন। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে আমরা হাইব্রিডদের নেতৃত্বে অবসান ঘটিয়ে সুস্থধারার রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে চাই। যেখানে সত্যিকারের আওয়ামী লীগপ্রেমী নেতাকর্মীরা সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করতে পারবেন।’

এদিকে, সামনের উপজেলা নির্বাচন সামনে রেখে জাবেদ ও ওয়াসিকা গ্রুপের মধ্যে দলীয় অন্তর্কোন্দল আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা গেছে। জাবেদ গ্রুপ থেকে বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান তৌহিদুল আলম ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অধ্যাপক আবদুল মান্নান চৌধুরী দুজনই সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে জনসংযোগ করে যাচ্ছেন। অন্যদিকে, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ডা. নাসির উদ্দিন মাহমুদকে সামনে নিয়ে এগোচ্ছে ওয়াসিকা আয়েশা গ্রুপ।