থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী স্রেথা তাভিসিনের আমন্ত্রণে আগামীকাল বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যাংকক যাচ্ছেন। সোমবার পর্যন্ত তিনি সেখানে থাকবেন। এ সময়ে ব্যাংককে সরকারি সফর এবং ইউনাইটেড নেশনস ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিকের (ইউএনএসক্যাপ) ৮০তম অধিবেশনে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এ সফরে দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি, তিনটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও একটি লেটার অব ইনটেন্ট সইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
গতকাল সোমবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর এ সফর নিয়ে বিস্তারিত জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ।
মন্ত্রী বলেন, ২৬ এপ্রিল থাইল্যান্ডের গভর্নমেন্ট হাউজে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। একই দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সৌজন্যে থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আয়োজিত রাষ্ট্রীয় মধ্যাহ্নভোজে যোগ দেবেন। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে অফিশিয়াল পাসপোর্টধারীদের জন্য ভিসা অব্যাহতি-সংক্রান্ত চুক্তির পাশাপাশি জ্বালানি, পর্যটন ও শুল্কসংক্রান্ত পারস্পরিক সহযোগিতাবিষয়ক তিনটি সমঝোতা স্মারক এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা শুরুর জন্য একটি লেটার অব ইনটেন্ট স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে।
হাছান মাহমদু বলেন, এই সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থাইল্যান্ডের রাজপ্রাসাদে রাজা মহা ভাজিরালংকর্ন ফ্রা ভাজিরা-ক্লাচাও-উহুয়া এবং রানী সুধিদা বজ্রসুধা-বিমলা-লক্ষ্মণের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করবেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ সফরের মাধ্যমে উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য ‘মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির’ পর্যালোচনার পাশাপাশি অন্যান্য অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়, বিশেষ করে বিনিয়োগ, পর্যটন, জ¦ালানি, স্থল এবং সমুদ্র সংযোগ, উন্নয়ন প্রভৃতি খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ড পর্যটন খাতের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে মানবসম্পদ উন্নয়ন, বৌদ্ধ সার্কিট পর্যটন প্রচারণা, পর্যটন অঞ্চলগুলোয় বিনিয়োগ প্রভৃতি ক্ষেত্রে যৌথ কার্যক্রম ও দক্ষতা বিনিময়ের মাধ্যমে পারস্পরিক সুবিধা অর্জন করতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেন ড. হাছান মাহমুদ। তিনি বলেন, পর্যটনশিল্পে এই সহযোগিতার ফলে উভয় দেশে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের অফিশিয়াল পাসপোর্টধারীদের জন্য ভিসা অব্যাহতি দেওয়া হলে উভয় দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে যোগাযোগ সহজতর হবে এবং বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও প্রশিক্ষণে কর্মকর্তারা সময়মতো যোগ দিতে পারবেন।
প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে আসিয়ানের ‘সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার’ মর্যাদা লাভে বাংলাদেশের আবেদনের বিষয়ে আরও জোরালোভাবে অনুরোধ করা এবং রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন ও মিয়ানমারে চলমান সংঘাত নিরসনে থাইল্যান্ডসহ আসিয়ান সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে অধিকতর সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হবে বলেও উল্লেখ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
ড. হাছান আরও জানান, ব্যাংককে জাতিসংঘ সম্মেলন কেন্দ্রে ২৫ এপ্রিল এশীয়-প্রশান্ত অঞ্চলের জন্য ইউএনএসক্যাপে ৮০তম অধিবেশনে জাতিসংঘের এজেন্ডা ২০৩০ ও টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বিশেষ বক্তব্য দেবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। একই দিন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ইউএনএসক্যাপের নির্বাহী সচিব আরমিডা সালসিয়াহ আলিশাবানার সৌজন্য সাক্ষাতের কথা রয়েছে।
স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালে বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানকারী থাইল্যান্ডে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি সফরটি সফল এবং ফলপ্রসূ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন মন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলামের থাইল্যান্ড যাওয়ার কথা রয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কিরগিজস্তানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাৎ : তিন দিনের বাংলাদেশ সফরে আসা কিরগিজ প্রজাতন্ত্রের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপমন্ত্রী আভাজবেক আতাখানভ গতকাল দুপুরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ সাক্ষাতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দুই দেশের মধ্যে প্রথম ফরেন অফিস কনসালটেশন (এফওসি) সফলভাবে সমাপ্তিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন। এ ছাড়া তিনি ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে পুনরায় নির্বাচিত হওয়ায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন বার্তার জন্য কিরগিজ প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্টের প্রতি ধন্যবাদ জানান।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাবেক ইউএসএসআরের অংশ হিসেবে কিরগিজ জনগণের মূল্যবান সমর্থনের কথা স্মরণ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধির অনেক সুযোগ রয়েছে। কিরগিজস্তানকে পোশাক, ওষুধ, পাটজাতপণ্য, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফল, সিরামিক, আইটি পণ্য ও সেবা আমদানির অনুরোধ জানান তিনি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ অবিলম্বে রোহিঙ্গাদের স্বদেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে ও ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধ বন্ধে কিরগিজস্তানের সহায়তা কামনা করেন। একই সঙ্গে ইউরেশিয়ান ইকোনমিক কমিশনের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরে বাংলাদেশকে সমর্থন দান এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে দেশের প্রার্থীদের সমর্থনের জন্যও কিরগিজস্তানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ জানান।
বৈঠকে কিরগিজ উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী আতাখানভ কৃষি খাতসহ বিভিন্ন অঙ্গনে বাংলাদেশের সাফল্যের প্রশংসা করেন। তিনি জানান, তার দেশে প্রায় এক হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। কিরগিজস্তান বিপুল বিদ্যুৎ শক্তি ও বছরে প্রায় ২২ থেকে ২৪ টন স্বর্ণ উৎপাদন করছে, যেখানে ব্যাপক জনশক্তি নিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
কিরগিজস্তান ইউরেশিয়ান ইকোনমিক কমিশনের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরে বাংলাদেশকে সমর্থন দেবে এবং জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে বাংলাদেশের সমর্থন প্রত্যাশা করেন।