রাজস্ব ঘাটতি সাড়ে ২১ হাজার কোটি টাকা

কর-জিডিপিতে বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে তলানিতে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শ অনুযায়ী কর আদায় বাড়ানোর চেষ্টাও করছে সরকার। কিন্তু আগের বছরের তুলনায় কর আদায় বাড়লেও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি কমছে না। চলতি অর্থবছরের (২০২৩-২৪) প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির মুখোমুখি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এই ৯ মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এনবিআর আদায়ে পিছিয়ে রয়েছে ২১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা।

এনবিআর বলছে, আলোচ্য সময়ে ২ লাখ ৫৯ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করছে এনবিআর। এ সময়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৫ দশমিক ২৩ শতাংশ। গতকাল সোমবার এনবিআরের পরিসংখ্যান বিভাগ থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, চলতি অর্থবছরের বাকি যে সময় রয়েছে, এতে নতুন করে রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনা কম।

চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৮১ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা। সেখানে আদায় হয়েছে ২ লাখ ৫৯ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। সেই হিসাবে বাকি তিন মাসে এনবিআরকে রাজস্ব ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে।

এনবিআর সূত্রে জানা যায়, গত ৯ মাসে শুল্ক আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৩ হাজার ৩৪২ কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৭৪ হাজার ২৬২ কোটি টাকা। মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৫ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৭০২ কোটি টাকা।

এ ছাড়া আয়কর আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯৩ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৮৪ হাজার ৯০১ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী শুল্কে ৯ হাজার ৭৯ কোটি, মূসকে ৪ হাজার ৩৫০ কোটি ও আয়করে ৮ হাজার ৪৪৮ কোটি টাকা আদায় করতে পারেনি রাজস্ব বোর্ড। যদিও আলোচ্য সময়ে শুল্কে ১০ দশমিক ২১ শতাংশ, মূসকে ১৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ ও আয়করে ১৯ দশমিক ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। রাজস্ব বোর্ড বলছে, গত অর্থবছরে একই সময়ে প্রবৃদ্ধি হার ছিল ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ। যার মধ্যে কাস্টমসে ৩.৬৩, মূসকে ১৫.৪১ ও আয়করে ৪.৮৭ শতাংশ।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) সিনিয়র গবেষক ড. মাহফুজ কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিদায়ী অর্থবছরের পর দেশের অর্থনীতিতে নানা উত্থান-পতন হয়েছে। বিশেষ করে দেশের ব্যাংকগুলো যখন তারল্য সংকটে পড়ে, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর নীতি অবলম্বন করে সুদ হার বাড়িয়েছে। এতে লোন সুদ বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন। পাশাপাশি পুঁজি বাজারেও ততটা উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে আমদানি ও রপ্তানি সমানুপাত হওয়ায় সব সেক্টরে শুল্ককর কমে আসায় জাতীয় রাজস্ব আহরণে ভাটা পড়েছে। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের বাকি যে সময় রয়েছে, এতে করে নতুন করে রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনা কম।

চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৪০ শতাংশ অতিক্রম করতে যাচ্ছে। কারণ রাজস্ব আদায় কমে যাওয়ায় সরকার তহবিল সংগ্রহে ঋণ নেওয়া অব্যাহত রেখেছে। গত সপ্তাহে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি আর্থিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ঋণ-জিডিপি অনুপাত ছিল ৩৯ দশমিক ৮ শতাংশ। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে তা ৪১ দশমিক ৪১ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

গত এক দশকে ঋণ-জিডিপি অনুপাত ১৩ পার্সেন্টেজ পয়েন্ট বেড়েছে। আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২৯ অর্থবছর শেষে এই অনুপাত ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাবে। সংস্থাটির মতে, এই অনুপাত ৫৫ শতাংশের নিচে রাখা কম ঝুঁকিপূর্ণ।

তবে স্থানীয় অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাজস্ব প্রবৃদ্ধি না বাড়লে ও চলমান মার্কিন ডলার সংকট বজায় থাকলে এটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

গত এক দশকে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ৮ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছে, চলতি অর্থবছরে এটি ৮ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ২০২৯ অর্থবছরে ১০ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হবে। বাংলাদেশের তুলনায় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ঋণ-জিডিপির অনুপাত বেশি হলেও তাদের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বেশি।

ভারতে ঋণ-জিডিপি অনুপাত ২০২৪ অর্থবছরে দাঁড়াবে ৮২ দশমিক ৫ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৮২ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৩ অর্থবছরে দেশটির রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ছিল ২০ দশমিক ২ শতাংশ।

উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা রয়েছে দীর্ঘদিন ধরেই। দিন দিন বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে। এমনকি ঋণ পরিশোধেও ফের ঋণ করতে বাধ্য হচ্ছে সরকার।

অর্থনীতির বিশ্লেষকরা মনে করেন, উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হওয়ার এ পর্যায়ে বাংলাদেশের যে উন্নয়ন ব্যয় তা খুব আহামরি নয়। মূলত অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ পর্যাপ্ত না হওয়ায় কারণেই এ টানাপড়েন। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণ সামর্থ্যরে অর্ধেকেরও কম। রাজস্ব আহরণ কাক্সিক্ষত মাত্রায় না এগোনোর ফলে অবকাঠামো উন্নয়ন, মানবপুঁজি গঠন, সামাজিক নিরাপত্তা ব্যয় কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় উন্নয়নে পর্যাপ্ত অর্থের জোগান অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হচ্ছে না।