পুঁজিবাজারে দরপতন থামেনি

দরপতন ঠেকাতে করণীয় নির্ধারণে অংশীজনদের সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসির নিষ্ফল বৈঠকের পরদিন ফের পতন হয়েছে পুঁজিবাজারে। গতকাল ডিএসইর বেশিরভাগ শেয়ারের দরপতনে প্রধান মূল্যসূচকটি কমেছে ৪১ পয়েন্ট। পুঁজিবাজারের মন্দা দূর করতে কমিশনের ব্যর্থতাকে দায়ী করে বিনিয়োগকারীরা গতকাল রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পুরাতন ভবনের সামনে বিক্ষোভ করেছেন। বাজারের বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ী করেছেন কমিশনকে।

২০১০ সালের পর নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসি দরপতন রোধে বারবার বৈঠক করলেও দীর্ঘমেয়াদে বাজার পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। তারপরও গত সোমবারের বৈঠককে কেন্দ্র করে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। ফলে বাজারের টানা পতন রোধ করে সেদিন সূচকে বাড়তি কিছু পয়েন্ট যোগ হয়েছিল। কিন্তু আগের বৈঠকের মতো সোমবারের বৈঠকটি থেকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ আহ্বান জানানো ছাড়া অন্য কোনো সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ আসেনি। এতে বিনিয়োগকারীরা হতাশ হয়েছেন। যার প্রভাব গতকালের বাজারে দেখা গেছে।

বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজের কর্মকর্তারা জানান, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মনোভাব হলো নিয়ন্ত্রক সংস্থা চাইলে দরপতন রুখতে পারে এবং দরপতন হলে তা রুখে দেওয়া এ সংস্থারই দায়িত্ব। আদতে শেয়ারদর বাড়ল বা কমল, তা পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার দেখার বিষয় নয়। অস্বাভাবিক কারণে বা কারসাজি করে পুঁজিবাজারে দরপতন উসকে দিলে বা দর বাড়ালে সে বিষয়টিই এ সংস্থার দেখার বিষয়। বিশ্বের সব দেশের পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এভাবেই কাজ করে। তবে বাংলাদেশের বাজারে এর উল্টোটা ঘটে। দরপতন হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাই বেশি উদ্বিগ্ন হন। তারাই আগ বাড়িয়ে পুঁজিবাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ তৈরি করেন। তারাই ‘মিটিং-সিটিং’ করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অযৌক্তিক ধারণা ও আশাবাদ তৈরি করেন।

সোমবার এসইসির বৈঠকে উপস্থিত অংশীজনদের একজন বলেন, ২০১০ সালের ধসের পর দরপতন ঠেকাতে এসইসি গত এক যুগেরও বেশি সময়ে বহু বৈঠক করেছে। সব বৈঠকের ফল ছিল শূন্য। সোমবারের বৈঠকেও যে কিছু হবে না, তাও সবাই জানত। যে কারণে দরপতন হয়েছে বা হচ্ছে, রাতারাতি এর সমাধানও নেই। এ কথা এসইসির শীর্ষ কর্মকর্তারা জানেন, বোঝেন। তারপরও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মিথ্যা আশাবাদ সৃষ্টির চেষ্টা করেন।

সোমবারে এসইসির বৈঠকে অংশ নেওয়া শীর্ষ এক ব্রোকারেজ হাউজের কর্মকর্তা বলেন, দরপতন হলেই এসইসির পক্ষ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের, বিশেষত ব্রোকার ডিলার, মার্চেন্ট ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, বীমা কোম্পানিকে বিনিয়োগ বাড়াতে বলে। কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ফোন করে চাপও দেন। চাপে পড়ে আগে প্রতিষ্ঠানগুলো কিছু বিনিয়োগও করেছে। তবে প্রতিবারই বিনিয়োগ করে লোকসান করেছে। এখন এসইসির পক্ষ থেকে যখন বিনিয়োগ করতে বলে, তখন তারা বিনিয়োগ করার আশ্বাস দেয়, কিন্তু করে না।

এ বিষয়ে বাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আল-আমীন বলেন, পুঁজিবাজার এমন এক জায়গা, যেখানে কাউকে বিনিয়োগের জন্য ডেকে আনার প্রয়োজন হয় না। মানুষ যখন দেখে এখানে বিনিয়োগ করে লাভবান হওয়া যাবে, তখন নিজেরাই বিনিয়োগে আসে। আর যদি মনে করে, এ মুহূর্তে বিনিয়োগ করে লোকসান হবে, তবে টেনেও আনা যায় না।

বর্তমান পরিস্থিতি বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ড. আল-আমীন বলেন, এটা ঠিক গত আড়াই মাসে মাত্রাতিরিক্ত দরপতন হয়েছে। অনেক শেয়ার তার যৌক্তিক দরের তুলনায় অনেক নিচে নেমে গেছে। অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে কিছুটা মন্দাবস্থা থাকলেও পরিস্থিতি এতটা খারাপ নয় যে, এমন দরপতন হবে, এর কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যাও দাঁড় করানো যায় না। তারপরও দরপতনের জন্য ব্যাংকঋণের সুদহার মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সার্বিক সুশাসনের অভাবকে দায়ী করেন এই বিশ্লেষক।