দুদিনের সরকারি সফর শেষে ঢাকা ছেড়েছেন কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি। এ সফরে বাংলাদেশ ও কাতারের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করতে পাঁচটি চুক্তি ও পাঁচটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। বৈঠকে উভয় নেতাই দুই দেশের সম্পর্ক আরও দীর্ঘস্থায়ী করার উপায় বের করার কথা বলেন।
কাতারের আমিরের সফর সম্পর্কে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো বিবৃতিতে এসব তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশ ও কাতারের মধ্যে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আগামীতে আরও সম্প্রসারিত হবে। দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ-বাণিজ্য বাড়াতে কাতারের আমিরের সফরে বাংলাদেশ-কাতার জয়েন্ট বিজনেস কাউন্সিল গঠন করা হয়। এ সফর বাংলাদেশ ও কাতারের মধ্যে বহুমুখী অংশীদারত্বকে আরও জোরদার করার উপায় নির্ধারণ করবে।
বিবৃতিতে বলা হয়, দ্বিপক্ষীয় আলোচনার সময় উভয় দেশের শীর্ষ নেতা দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার প্রশংসা করেন। বৈঠকে এ সম্পর্ক আরও শক্তিশালীর করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, শেখ হাসিনা ও হামাদ আল থানির বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জ্বালানি ও শক্তি, জনশক্তি, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা সংকটের কথা তুলে ধরা হয়। এ ছাড়া বৈঠকে উভয় নেতা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা ও সহিংসতা বৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ফিলিস্তিন সমস্যায় টেকসই সমাধানের জন্য বিশ্বনেতাদের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান দুই নেতা।
টানা চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় এসে সরকার গঠনের পর কাতারের আমিরের এ সফরটি ছিল মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশ থেকে উচ্চপর্যায়ের সফর। এর মধ্য দিয়ে প্রায় দুই দশক পর দেশটির কোনো আমির বাংলাদেশ সফর করলেন। সব মিলিয়ে কাতারের আমিরের এ সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করেছে বাংলাদেশ সরকার।
গত সোমবার বিকেল ৫টার দিকে একটি বিশেষ ফ্লাইটে তিনি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান। বিমানবন্দরে কাতারের আমিরকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। বিমানবন্দরে আমিরকে স্বাগত জানান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। গতকাল সকালে কাতারের আমির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমিরকে টাইগার গেটে ফুলের তোড়া দিয়ে স্বাগত জানান। তারা সেখানে একান্ত বৈঠকেও মিলিত হন।
৫টি চুক্তি এবং ৫টি সমঝোতা স্মারক সই : প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর বাংলাদেশ ও কাতার দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করতে গতকাল পাঁচটি চুক্তি ও পাঁচটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করেন।
চুক্তিগুলো হচ্ছে : বাংলাদেশ ও কাতারের মধ্যে আয়ের ক্ষেত্রে দ্বৈত কর পরিহার এবং রাজস্ব ফাঁকি প্রতিরোধ, বাংলাদেশ সরকার এবং কাতার রাষ্ট্রের মধ্যে আইনি ক্ষেত্রে সহযোগিতা, কাতার এবং বাংলাদেশের মধ্যে সমুদ্র পরিবহন, বাংলাদেশ ও কাতারের মধ্যে পারস্পরিক বিনিয়োগ উন্নয়ন ও সুরক্ষা এবং বাংলাদেশ-কাতার যৌথ ব্যবসায়িক পরিষদ প্রতিষ্ঠা।
চুক্তি ছাড়াও পাঁচটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জনশক্তি কর্মসংস্থান (শ্রম), বন্দর (এমডব্লিউএএনআই কাতার এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষ), বাংলাদেশ ও কাতারের মধ্যে শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা, যুব ও ক্রীড়া ক্ষেত্রে এবং বাংলাদেশ ও কাতারের মধ্যে কূটনৈতিক প্রশিক্ষণে সহযোগিতার স্মারকও স্বাক্ষরিত হয়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বাংলাদেশের পক্ষে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন এবং কাতারের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন হামাদ আল থানি পারস্পরিক বিনিয়োগ উন্নয়ন ও সুরক্ষা চুক্তিতে সই করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ ও কাতারের মধ্যে আয়ের ক্ষেত্রে দ্বৈত কর পরিহার এবং রাজস্ব ফাঁকি প্রতিরোধ চুক্তিটি স্বাক্ষর করেন কাতারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সুলতান বিন সাদ আল মুরাইখি এবং বাংলাদেশের অর্থ প্রতিমন্ত্রী ওয়াসিকা আয়শা খান।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী আনিসুল হক এবং কাতারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সুলতান বিন সাদ আল মুরাইখি বাংলাদেশ সরকার ও কাতার রাষ্ট্রের মধ্যে আইনি ক্ষেত্রে সহযোগিতা চুক্তিতে সই করেন। কাতার ও বাংলাদেশের মধ্যে সামুদ্রিক পরিবহনসংক্রান্ত চুক্তিতে সই করেন কাতারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সুলতান বিন সাদ আল মুরাইখি এবং নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী।
এ ছাড়া বাংলাদেশ-কাতার জয়েন্ট বিজনেস কাউন্সিল প্রতিষ্ঠাসংক্রান্ত চুক্তিতে সই করেন কাতার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (কিউসিসিআই) চেয়ারম্যান শেখ খলিফা বিন জসিম আল থানি এবং ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) সভাপতি মাহবুবুল আলম।
বাংলাদেশ ও কাতারের মধ্যে কূটনৈতিক প্রশিক্ষণে সহযোগিতাসংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকে সই করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এবং কাতারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সুলতান বিন সাদ আল মুরাইখি। পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এবং কাতারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সুলতান বিন সাদ আল মুরাইখি বাংলাদেশ ও কাতারের মধ্যে শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে সমঝোতা স্মারকেও সই করেন।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী এবং কাতারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সুলতান বিন সাদ আল মুরাইখি জনশক্তি কর্মসংস্থান (শ্রম) ক্ষেত্রে সহযোগিতা-সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকে সই করেন। বন্দরের ক্ষেত্রে সহযোগিতায় (এমডব্লিউএএনআই কাতার এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষ) কাতারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সুলতান বিন সাদ আল মুরাইখি এবং নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী সই করেছেন।
এ ছাড়া বৈঠকে বলা হয়, কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির নামে রাজধানী ঢাকার একটি সড়ক ও একটি পার্কের নামকরণ করা হয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অধীনে মিরপুরের কালশী এলাকার বালুর মাঠে পার্কটি নির্মাণ করা হচ্ছে। মিরপুর ইসিবি চত্বর থেকে কালশী ফ্লাইওভার পর্যন্ত সড়কটির নামকরণ করা হয়েছে কাতারের আমিরের নামে। এখন থেকে সড়ক ও পার্কটি শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি অ্যাভিনিউ এবং শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি পার্ক নামে পরিচিত হবে।
বাংলাদেশ-কাতার জয়েন্ট বিজনেস কাউন্সিল গঠন : দুই দেশের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও মজবুত ও জোরদার করার পাশাপাশি ব্যবসায়িক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জয়েন্ট বিজনেস কাউন্সিল (জেবিসি) প্রতিষ্ঠা করেছে বাংলাদেশ ও কাতার। এ লক্ষ্যে চুক্তি সই করেছে দেশের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই) এবং কাতারের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন কাতার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (কিউসিসিআই)। এফবিসিসিআই সভাপতি মাহবুবুল আলম এবং কিউসিসিআই চেয়ারম্যান শেখ খলিফা বিন জসিম আল থানি নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
কার্যালয় ত্যাগের আগে কাতারের আমির টাইগার গেটে রক্ষিত দর্শনার্থী বইয়েও সই করেন। এরপর তিনি সেখান থেকে বঙ্গভবনে যান।
বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে কাতারের বিনিয়োগ আহ্বান রাষ্ট্রপতির : বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে (এসইজেড) কাতারের ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। রাষ্ট্রপতি বলেন, খাদ্য সরবরাহের চেইনগুলো উৎপাদন থেকে ব্যবহার পর্যন্ত কৃষি উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ, খাদ্য প্যাকেজিং, স্মার্ট এগ্রিকালচার, সার উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতে ও বিনিয়োগকে স্বাগত জানাবে বাংলাদেশ। ঢাকায় সফররত কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির সঙ্গে গতকাল দুপুরে বঙ্গভবনে এক সৌজন্য সাক্ষাতে তিনি এ আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার বিদেশি বিনিয়োগের জন্য ১০০টি অর্থনৈতিক বিশেষ অঞ্চল স্থাপন করেছে। কাতারের বিনিয়োগকারীরা পেট্রো-কেমিক্যাল, জ্বালানি, মেশিনারিজ, তথ্যপ্রযুক্তি, ইলেকট্রনিকস, সিরামিক, কৃষি-ব্যবসা, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের মতো কিছু ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রণোদনা পেতে পারে এবং সহায়তা করতে পারে।’ রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন প্রায় ৩ দশমিক ৭৫ লাখ বাংলাদেশিকে কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়ার জন্য কাতার সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশকে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) দেওয়ার জন্য কাতার সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে রাষ্ট্রপতি কাতারের কাছে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সহায়তা চেয়েছেন।
কাতারের আমির প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের প্রশংসা করেন। তিনি আশ্বাস দেন যে, আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা অব্যাহত থাকবে। কাতারের আমির বলেন, কাতার এবং বাংলাদেশ স্বাক্ষরিত বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকসমূহ দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে আরও কার্যকরী ভূমিকা রাখবে। বঙ্গভবনের ক্রেডেনশিয়াল হলে বৈঠক শেষে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন কাতারের আমির ও তার সফরসঙ্গীরা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, উপদেষ্টা ও কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ভোজে অংশ নেন। কাতারের আমিরের সম্মানে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। দুদিনের সফর শেষে গতকাল তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন।