এপ্রিলের ১৯, সাল ১৯৮৯। স্থান জার্মানির শহর মিউনিখ। উয়েফা কাপের সেমিফাইনালের ফিরতি লেগের অনুশীলন চলছিল অলিম্পিয়া স্টেডিয়ামে। বায়ার্ন মিউনিখের প্রতিপক্ষ ইতালিয়ান ক্লাব নাপোলিতে নজর তখন গোটা বিশ্বের। দলটির হয়ে যে মাঠ মাতাচ্ছেন মহাতারকা ডিয়েগো ম্যারাডোনা। ম্যাচের দিন দলের ওয়ার্ম-আপের সময় দেখা যায় ফুটবল ঈশ্বরকে বলের পাশে দাঁড়িয়ে কোমর দোলিয়ে নাচতে। কিন্তু সেই প্রস্তুতি ম্যাচটা টিভিতে দেখানো হয়নি। তবুও ৩৫ বছর পর যেন অলৌকিকভাবে সেই দৃশ্য প্রকাশ্যে আসে। যার পেছনের কারিগর ছিলেন বেলজিয়ামের সাংবাদিক ফ্রাঙ্ক রেইস।
অলিম্পিক স্টেডিয়াম ছিল বুন্দেসলিগার টানা ১১ শিরোপা জেতা দল বায়ার্ন মিউনিখের পুরনো স্টেডিয়াম। নাপোলির বিপক্ষে এখানেই হয়েছিল উয়েফা কাপের সেমিফাইনালের ফিরতি লেগের ম্যাচটি। আগের ম্যাচটি হয়েছিল ফ্রান্সের মিকেল ভট্রোট স্টেডিয়ামে। যেখানে ২-০ গোলে জিতেছিল ম্যারাডোনার দল। ভরপুর আত্মবিশ্বাস নিয়ে মিউনিখে গিয়েছিলেন আর্জেন্টিনার প্রথম মহাতারকা।
সেমিফাইনাল ম্যাচটি শুরুর আগে ওয়ার্ম-আপ শুরু হয়েছিল। সেটা টেলিভিশনে প্রচারিত হয়নি। তবে ক্যামেরাম্যানরা তাদের কাজ ততক্ষণে শুরু করে দিয়েছিলেন। স্টেডিয়ামে তখন দুটি বড় জায়ান্ট স্ক্রিন ছিল। যা তখনকার বাস্তবতায় ছিল বেশ আধুনিক। ওয়ার্ম-আপে ম্যারাডোনা তার নিজেকে ঝালাই করে নেওয়া শুরু করে দিয়েছিলেন। সেই দৃশ্যটি ধারণ করেছিলেন ফ্র্যাঙ্ক রেইস। তিনি নিজেই এক বছর আগে নাচো জুলিয়ানোর ইউটিউব চ্যানেলে সেটা বলেছিলেন।
বেলজিয়ামে জন্মগ্রহণকারী এই চিত্র সাংবাদিক ম্যারাডোনার সেই মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন। ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘স্টেডিয়ামের ট্র্যাকে একটি কভার ব্যান্ড ছিল। আর তারা ওপাসের গান বাজাচ্ছিল। এটি অস্ট্রিয়ান ব্যান্ড। যা ইউরোপে বেশ নাম-ডাক কুড়িয়ে ছিল। সেই গানের তালে তালে ম্যারাডোনা তাকে গরম করতে শুরু করলেও দৌড়াতে দেখা যায়নি। তিনি যা করতে পছন্দ করতেন তাই করতেন। তিনি সর্বদা গানের তালে নাচতেন, কারণ এটাই ছিল তার খেলার আগে নিজেকে প্রস্তুত করার এক কৌশল। তবে কারেকা, আলেমাওয়ের মতো অন্যসব খেলোয়াড়রা দৌড়াচ্ছিলেন।’
সেই ম্যাচে নাপোলির বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র করেছিল বায়ার্ন মিউনিখ। আগের ম্যাচে ২-০ গোলে এগিয়ে থাকায় ৪-২ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে ফাইনালে উঠে ইতালিয়ান ক্লাবটি। সেই ম্যাচে ম্যারাডোনা গোল করতে না পারলেও তার পারফরম্যান্স সম্পর্কে রেইস বলেন, ‘তিনি একটি দুর্দান্ত ম্যাচ খেলেছিলেন। জার্মান জাতীয় দলের ফুটবলার স্টেফান রয়টার তখন খেলতেন মিউনিখে। তিনি একটিবারও বল স্পর্শ করতে পারেননি।’
এরপর নাপোলি ও স্টুটগার্টের মধ্যকার ফাইনালে আজ্জুরিদের (ইতালি ফুটবল দলের ডাক নাম) উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ওই ম্যাচে সে (ম্যারাডোনা) একই কাজ করেছিল কিন্তু সংগীত ছাড়াই। ম্যারাডোনার ওয়ার্ম-আপের কারণে ওপাসের ক্যারিয়ারের উন্নতি ঘটে। যিনি গানটি লিখেছেন তিনি আমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। এমনকি তারা ওই ভিডিওর জন্য দক্ষিণ আমেরিকাতেও গিয়েছিলেন।’
এদিকে আর্জেন্টাইনের গতিবিধির কথা স্মরণ করে রেইস বলেন, ‘সবাই তার দিকে তাকিয়ে ছিল। এমনকি মাঠের অন্য প্রান্তে বায়ার্ন মিউনিখের খেলোয়াড়রাও। ম্যারাডোনা এটা জানতেন, তিনি নিজেও ছিলেন, তিনি ক্যামেরা পছন্দ করতেন এবং ক্যামেরা ম্যারাডোনাকে পছন্দ করত। তাকে দেখতে পারাটাই দারুণ ছিল।’
ম্যারাডোনার ওয়ার্ম-আপের গোপন কৌশলের দৃশ্যটি কীভাবে রেইসের হাতে এসেছিল? তা জানতে চাইলে বেলজিয়ান এই সাংবাদিক বলেন, ‘যেহেতু এটি সরাসরি সম্প্রচারিত হয়নি, রইস পরের দিন ব্রাসেলসে গিয়ে জার্মান টিভিতে যোগাযোগ করে জানাই যে আমি এটি রেকর্ড করেছি। স্টেশন এটি কিনেছিল এবং মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে এডিট করেছিল। ওপাস ব্যান্ডটি একটি স্টেডিয়ামে লাইভ রেকর্ড করা গানটি অন্তর্ভুক্ত করেছিল। যখনই আমি কোথাও পোস্ট করা ভিডিওটি দেখি এটি আমার সম্পাদনার মতোই ২ মিনিট ২১ সেকেন্ড স্থায়ী হয়। ইউটিউবে, এটি লক্ষ লক্ষ ভিউ এবং ভিজিট রয়েছে, তবে এটি আমার সংস্করণ। আমি কয়েক দিন পরে স্পোর্টস উইকেন্ড প্রোগ্রামের জন্য এটি নিজেই করেছি।’
বেলজিয়ামের সাংবাদিক আরও জানান, ‘যদি আমার প্রতি ভিউতে ইউরো শতাংশ থাকত তবে আমি মিলিয়নেয়ার হতাম। কিন্তু কিছুই হয়নি। কারণ এসব আমি টাকার জন্য করিনি। আসল ভিডিওটি সম্ভবত কারও হাতে নেই এবং হারিয়ে গেছে। আমি সবসময় মনে করি ম্যারাডোনা সর্বকালের সেরা। মেসি, পেলে, ক্রুইফ আছে, কিন্তু ম্যারাডোনা স্পেশাল।’
সেবছর উয়েফা কাপের ফাইনালে নাপোলির প্রতিপক্ষ ছিল আরেক জার্মান ক্লাব স্টাটগার্ট। তাদেরকে দুই লেগে ৫-৪ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ইতালিয়ান ক্লাবটি।