সব উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পর শেয়ার দরহ্রাসের সর্বোচ্চ সীমা কমানো হলেও পুঁজিবাজারের দরপতন ঠেকানো যাচ্ছে না। বরং দরপতনের সীমা ৩ শতাংশে নামিয়ে আনার ফলে অধিকাংশ শেয়ারে ক্রেতাসংকট তৈরি হয়েছে। ফ্লোর প্রাইস বহাল থাকাকালে বিনিয়োগ যাতে আটকে না যায়, এজন্য অনেক বিনিয়োগকারী লেনদেনের শুরুতেই শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। এতে গতকাল লেনদেনের শুরুতেই প্রবল বিক্রি চাপে মূল্যসূচকের বড় পতন দেখা যায়। দিন শেষে হারানো সূচক কিছুটা পুনরুদ্ধার সম্ভব হলেও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভীতি তৈরি রয়ে গেছে।
গতকাল লেনদেনের প্রথম ঘণ্টায় ৩৮২টি শেয়ারের লেনদেন হয়, যার মধ্যে প্রায় দেড়শ শেয়ারের কোনো ক্রেতা পাওয়া যায়নি। এসব শেয়ারে দরপতনের নির্ধারিত সীমা ৩ শতাংশ পর্যন্ত পতন হলে বাজারে ক্রেতার অভাব দেখা দেয়। এ সময় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ৯৮ পয়েন্ট কমে যায়। অবশ্য পরবর্তীকালে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসির দৌড়ঝাঁপে হারানো মূল্যসূচকের কিছুটা পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়। তারপরও প্রায় ৭৬ শতাংশ শেয়ারের দরপতনে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচকটি ৬০ পয়েন্ট হারিয়ে দিনের লেনদেন শেষ করে। এরপরও লেনদেনের শেষ সময়ে শতাধিক শেয়ার ক্রেতাশূন্য অবস্থায় ছিল।
ব্রোকারেজ হাউজের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত জানুয়ারিতে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পর গত বুধবার পর্যন্ত টানা দরপতন হলেও কোনো শেয়ারে ক্রেতাশূন্য পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। দরপতনের সর্বোচ্চ সীমা ৩ শতাংশে নামিয়ে আনার পর এখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ভীত হয়ে শেয়ার বিক্রি বাড়িয়ে দিয়েছেন। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, এভাবে পতন অব্যাহত থাকলে ফের ফ্লোর প্রাইস আরোপ হতে পারে। ফলে আগের মতো বিনিয়োগ দীর্ঘ সময়ের জন্য আটকে যেতে পারে। তাই বড় ধরনের লোকসান মেনে নিয়েই অনেকে শেয়ার বিক্রি করে দিতে চাইছেন।
বাজার পরিস্থিতি বিষয়ে এসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, অস্বাভাবিক লেনদেন ধরা পড়ায় এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় দরপতনের সীমা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে প্রথম দিন হয়তো নেগেটিভ প্রচারণার কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়েছে, যাতে বিক্রি চাপ বেড়েছে। আমরা আশা করছি দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে বাজার পরিস্থিতির উন্নতি হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজের একাধিক শীর্ষ নির্বাহী জানিয়েছেন, বাংলাদেশের মতো ইমার্জিং মার্কেট বিশে^ আরও রয়েছে। আমাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের উচিত সেসব বাজার কীভাবে চলে সেগুলো অনুসরণ করা। তাদের পুঁজিবাজারের প্রধান বৈশিষ্ট্য ফ্রি-ফ্লো বজায় রাখতে হবে। এর আগে ফ্লোর প্রাইসের কারণে দেশের পুঁজিবাজারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। বিদেশিরা এটিকে নেতিবাচক হিসেবে দেখেছে এবং পরবর্তীকালে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পর বিদেশিরা শেয়ার বিক্রি বাড়িয়ে দিয়েছে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভাবে শেয়ারের দাম কমার ক্ষেত্রে সার্কিট ব্রেকারের সীমা কমিয়ে দেওয়ায় বাজারে আরও বেশি দরপতন হয়েছে। কারণ, এ সীমা কমিয়ে দেওয়ার ফলে বেশিরভাগ বিনিয়োগকারী শেয়ার বিক্রি করতে পারছেন না। আবার শেয়ার বিক্রি না হওয়ায় নতুন শেয়ার কিনতেও পারছেন না। ফলে সীমা আরোপের সিদ্ধান্ত বাজারে আরও বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। পতন হলে বাজার তার নিজের শক্তিতেই ঘুরে দাঁড়ায়। তাই দৈনিক লেনদেনে নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপ কাম্য নয় বলে মনে করছেন তারা।
প্রায় দেড় বছর ফ্লোর প্রাইস থাকার পর গত ১৮ জানুয়ারি থেকে ধাপে ধাপে তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এরপর থেকে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ৮১৮ পয়েন্ট বা প্রায় ১৩ শতাংশ হারিয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের অর্থনীতিতে অস্থিতিশীলতা, ডলারের বিপরীতে টাকার ব্যাপক অবমূল্যায়ন ও সুদহার বৃদ্ধি বাজার পতনের অন্যতম কারণ। টাকার অবমূল্যায়নের কারণে পুঁজিবাজার থেকে বিদেশিরা ধারাবাহিকভাবে তাদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন। একই কারণে কোম্পানির উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মুনাফা কমে গেছে। দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে সুদের হার বাড়িয়ে চলেছে। আর সুদহার বৃদ্ধির কারণে বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারের ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের পরিবর্তে ব্যাংকে আমানত রাখছেন। এসব কারণেই পুঁজিবাজারে বিক্রিচাপ বেড়েছে।
বিপরীতে বিক্রিচাপ সামাল দিতে কমিশন থেকে বারবার প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর চাপ দিচ্ছে, যে বিনিয়োগকারীদের অধিকাংশই গত পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে লোকসানে রয়েছে। এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ তহবিল থেকে যেসব ব্যাংক পুঁজিবাজারে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিল, সেসব বিনিয়োগও এখন লোকসানে। দেশের অধিকাংশ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর সক্ষমতা নেই নতুন করে বিনিয়োগের। আর সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ২০১০ সালের পর থেকেই টানা লোকসান করে যাচ্ছেন। এতে অনেক বিনিয়োগকারী পুঁজি হারিয়ে বাজার ছেড়েছেন। গত ১৩ বছরে বারবার লোকসানের কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীর নতুন বিনিয়োগের সক্ষমতাও নেই।
গতকালের লেনদেন পর্যালোচনায় দেখা যায়, দরপতনের সীমা কমিয়ে আনায় গতকাল ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও কমে গেছে। গতকাল স্টক এক্সচেঞ্জটিতে কেনাবেচা হয়েছে ৫১১ কোটি টাকার শেয়ার, যা আগের দিনের চেয়ে ১৫ শতাংশ কম। গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হওয়া ৩৯৬টি সিকিউরিটিজের মধ্যে দাম বেড়েছে ৬৯টির, বিপরীতে কমেছে ৩০০টির। অপরিবর্তিত ছিল ২৭টি সিকিউরিটিজের দর।