চট্টগ্রাম বন্দরে পরিত্যক্ত রাসায়নিকে অগ্নিঝুঁকি

পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা রাসায়নিক পণ্যের কারণে অগ্নিঝুঁকি বাড়ছে চট্টগ্রাম বন্দরে। বন্দরের ১২টি শেডে ১৫৬৬ চালানের ঝুঁকিপূর্ণ এসব পদার্থ রয়েছে। এর মধ্যে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক পণ্য রয়েছে ৭২ চালানের রাসায়নিক। তরল ও পাউডার জাতীয় এসব পরিত্যক্ত রাসায়নিকের পরিমাণ জানা যায়নি।

বন্দর কর্তৃপক্ষ এসব পণ্য নিলাম হোক বা ধ্বংস করার জন্য অন্যত্র সরিয়ে নিতে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে। কাস্টমস বলছে, এগুলো নিলামের অযোগ্য। ফলে ধ্বংস করতে হবে। কিন্তু কীভাবে ধ্বংস করবে তা নিয়ে বিপাকে পড়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস।

বিধি অনুযায়ী, কোনো পণ্য খালাসের পর ৩০ দিনের মধ্যে আমদানিকারক সরবরাহ না নিলে তা নিলাম যোগ্য হয়ে যায়। পরবর্তীকালে এগুলো নিলাম বা ধ্বংস করার এখতিয়ার রয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমসের।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দরের পি শেডে গিয়ে দেখা যায়, শেডের ভেতরে ২০২১ সালে আমদানি করা অনেক রাসায়নিক পদার্থভর্তি প্লাস্টিকের ড্রাম রয়েছে। প্রতিটি ড্রামের লোগোতে কোন দেশ থেকে এসেছে, ওজন কত এসব লেখা রয়েছে। মেসার্স লিনি ফ্যাশন লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য এসব রাসায়নিক পদার্থ ওই বছর জুলাই মাসে ভারত থেকে আনা হয়েছিল।

শেডে কাজ করা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এগুলো গার্মেন্টসের কাঁচামাল। এদিকে শুধু এগুলোই ঝুঁকিপূর্ণ নয়, এমন আরও ৭২টি লট অত্যধিক ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক পদার্থ শেডে রয়েছে।

গত ১৫ এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে চট্টগ্রাম কাস্টমসের ডেপুটি কমিশনার (নিলাম) বরাবর একটি চিঠি দেওয়া হয়। সেই চিঠিতে কোন শেডে কত লট ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য রয়েছে উল্লেখ করা হয়। এসব পণ্যের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে অগ্নিঝুঁকি বাড়ছে এবং যেকোনো দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে বলে এগুলো নিলামে বিক্রি বা ধ্বংস করার জন্য কাস্টমসকে বলা হয়।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম সোহায়েল বন্দর দিবস উপলক্ষে আয়োজিত মতবিনিময় সভায়ও এ চিঠির কথা উল্লেখ করেন। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন শেডে ঝুঁকিপূর্ণ অনেক রাসায়নিক পণ্য রয়েছে।

এগুলো নিলাম বা ধ্বংস করার জন্য কাস্টমসকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করে চট্টগ্রাম কাস্টমসের উপকমিশনার (নিলাম) সেলিম রেজা গতকাল বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক উপাদানও রয়েছে। এসব উপাদান নিলামযোগ্য নয়, ধ্বংস করতে হবে। কিন্তু এগুলো ধ্বংস করার কোনো ইনসিনিটর (ভস্মীকরণ চুল্লি) আমাদের নেই। বিভিন্ন রড কারখানায় হয়তো থাকতে পারে। তারপরও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেসের (এমইএস) সাহায্য চেয়ে চিঠি লিখেছি গত সপ্তাহে।’

কাস্টমসের উপকমিশনারের বক্তব্যের বিষয়ে কথা হয় দেশের অন্যতম রড নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএমের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেন গুপ্তের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কাস্টমস কর্তৃপক্ষ যদি আমাদের সহযোগিতা চায় তাহলে আমরা শক্ত পদার্থগুলো আমাদের প্ল্যান্টে ধ্বংস করতে পারব। কিন্তু তরল রাসায়নিক উপাদানগুলো ধ্বংস করা সম্ভব হবে না। কারণ এগুলো থেকে আমাদের শ্রমিকরা আক্রান্ত হতে পারে। ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান ধ্বংসের জন্য পৃথক প্ল্যান্ট থাকতে পারে।’

তবে বন্দরের বিভিন্ন শেডে কোন ধরনের রাসায়নিক উপাদান কী পরিমাণ রয়েছে তা ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষের জানা থাকা প্রয়োজন বলে জানান ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপপরিচালক দিনমনি শর্মা। তিনি বলেন, ‘এর আগে ২০২০ সালের ১৫ জুলাই  চট্টগ্রাম বন্দরের ২ নম্বর জেটির কাছে ৩ নম্বর শেডে অগ্নিকান্ড ঘটেছিল। ২০২২ সালের ১২ মে ৪ নম্বর গেটের কাছে একটি কনটেইনারে আগুন লেগেছিল। বন্দর সবসময়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এসব ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য কোথায় কী অবস্থায় রয়েছে, তা আমাদের জানা থাকলে আগুন লাগার আগে যেমন আমরা প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে পারি, তেমনিভাবে আগুন লাগার সময় অগ্নিনির্বাপণে কোন ধরনের পদ্ধতি প্রয়োগ করব, সেই ব্যবস্থা নিতে সহায়ক হবে।’

তিনি আরও বলেন, বন্দরে যেহেতু অনেক বছরের পুরনো পণ্য থাকে অবশ্যই এখানকার শেডগুলো অগ্নিঝুঁকিতে থাকে। ২০২০ সালে লেবাননের বৈরুত বন্দরে ভয়াবহ বিস্ফোরণ হয়েছিল।

২০২০ সালের অগ্নিকা-ের পর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। সেই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন তখনকার বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলম। বর্তমানে অবসরে থাকা এ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। তিনি বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক উপাদানগুলো এখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য তখনই কাস্টমসকে বলা হয়েছিল। কিন্তু এগুলো ধ্বংস করতে হলে সিলেটের ছাতকে লাফার্জ সিমেন্টের কারখানার ইনসিনিটর প্ল্যান্টে নিয়ে যেতে হবে। দূরত্ব বেশি হওয়ায় পরিবহন খরচ বেশি হয় বলে কাস্টমস এগুলো বছরের পর বছর বন্দরের শেডে ফেলে রেখেছে।’

উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের আমদানি-রপ্তানির ৯২ শতাংশ পণ্য পরিবাহিত হয়ে থাকে। এ বন্দর দিয়ে আমদানি এবং রপ্তানি পণ্য থেকে বছরে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ। আর শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে আমদানি হচ্ছে এসব রাসায়নিক পণ্য।