কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে তাপবিদ্যুতের দ্বিতীয় প্রকল্পের নির্মাণকাজ অর্থের অভাবে আটকে আছে। পরিবেশের ক্ষতি বিবেচনায় দ্বিতীয় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে জাপান অর্থায়ন থেকে সরে আসায় এই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। নতুন করে অর্থ সংস্থানের চেষ্টা করছে সরকার। প্রয়োজনে নিজস্ব অর্থে কেন্দ্রটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মাতারবাড়ীতে ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার চার ইউনিটের দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই বিবেচনায় জমি অধিগ্রহণের পাশাপাশি সীমানাপ্রাচীর, ভবন ও কয়লা আমদানির জেটি নির্মাণসহ শেষ হয়েছে আনুষঙ্গিক কাজ। প্রথম প্রকল্পের দুই ইউনিটের (১২০০ মেগাওয়াট) বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবকাঠামো ব্যবহার করেই যাতে দ্বিতীয় প্রকল্পের বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন করা যায়, সেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
তারা জানান, ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ১ হাজার ৬০৮ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয় প্রায় এক দশক আগে। জাপানের অর্থায়নে নির্মিত প্রথম বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর পর দ্বিতীয় ইউনিটও পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করেছে। আর দ্বিতীয় প্রকল্পে এখন শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি বসানো হলেই আরও ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। ফলে এক জায়গাতেই ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এতে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয়ও তুলনামূলক কমে আসবে। কিন্তু জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) অর্থায়ন থেকে সরে দাঁড়ানোয় দ্বিতীয় প্রকল্প নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিপিজিসিবিএল)। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দ্বিতীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য শুধু মেশিন বা ইউনিট স্থাপন ছাড়া অন্যান্য কাজ শেষ। এই মেশিন স্থাপন করতে ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার মতো ব্যয় হবে।’
তিনি বলেন, ‘জাইকা ছাড়া অন্য কোনো উৎস থেকে অর্থায়ন পেতে চেষ্টা করছে সরকারের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। পাশাপাশি আমাদের মৌখিকভাবে কোনো দেশ, কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করতে বলা হয়েছে। আমরা সেটা করছি। এককথায় দুদিক থেকেই অর্থের জন্য চেষ্টা চলছে। অর্থের সংস্থান পেলে দ্বিতীয় প্রকল্পের কাজ শুরু করা যাবে।’
দ্বিতীয় প্রকল্পের জন্য এখন পর্যন্ত কত টাকা ব্যয় হয়েছে জানতে চাইলে আবুল কালাম আজাদ বলেন, সেটা জানা যাবে পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ হলে। পরিবেশের ঝুঁকি বিবেচনা করে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ বা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নতুন করে অর্থায়ন করতে চাইছে না। বিকল্প পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সে ক্ষেত্রে প্রথম বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে যে আয় হবে, সেই অর্থ দিয়েই দ্বিতীয়টি করার একটা প্রাথমিক পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য হয়তো আরও চার-পাঁচ বছর সময় লাগবে।
সিপিজিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, দ্বিতীয় কেন্দ্রের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজও করা হয়েছে। জাপানের অর্থায়ন নিশ্চিত হলেই ঠিকাদার নিয়োগে দরপত্র আহ্বানের কথা ছিল। এ কেন্দ্রটি ২০৩০ সালের জুন মাসে উৎপাদনে আসার কথা ছিল।
২০৫০ সালের মধ্যে ধীরে ধীরে ‘কার্বন নিরপেক্ষতা’ (কার্বন নিঃসরণ এবং কার্বন শোষণ যেখানে সমান থাকবে) অর্জনের লক্ষ্য ঠিক করেছে জাপানের বিনিয়োগ ও প্রকৌশল খাতের কোম্পানি সুমিতোমো। এ প্রতিষ্ঠানটিই মাতারবাড়ী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছে। ২০২১ সালের মে মাসে তারা ঘোষণা দিয়েছিল, মাতারবাড়ীর সম্ভাব্য দ্বিতীয় প্রকল্পটি ছাড়া নতুন করে কোনো কয়লাভিত্তিক প্রকল্পে তারা বিনিয়োগ করবে না। পরে তারা তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ওই প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ায়।
ইনস্টিটিউট অব এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ) জানিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে সুমিতোমো তাদের কয়লাখনির ব্যবসাগুলো বন্ধ করে দেবে এবং চলমান সব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ২০৪০ সালের মধ্যে সরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে।
পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে ২০২১ সালের জুনে ৭ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১০টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের ঘোষণা দেয় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। সেই তালিকায় ছিল না মাতারবাড়ী দ্বিতীয় পর্যায়ের ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি।
মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে বিশাল কর্মযজ্ঞ : কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী ও ধলঘাটা ইউনিয়নে সাগরের কোল ঘেঁষে একসময়ের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে লবণ চাষ হতো। এখন সেই জমিতে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণকাজ প্রায় শেষের দিকে। প্রকল্পের উত্তর পাশে কুতুবদিয়া চ্যানেল, পশ্চিম ও দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, আর পূর্ব পাশে কুহেলিয়া নদী। মধ্যভাগের জমিতে দেশি-বিদেশি জনবল নিয়ে কেন্দ্রটি নির্মাণ করছে জাপানের সুমিতোমো করপোরেশন, তোশিবা করপোরেশন ও আইএইচআই করপোরেশনের কনসোর্টিয়াম।
২০১৪ সালের ১৬ জুন বাংলাদেশ সরকার ও জাইকার মধ্যে একটি ঋণচুক্তি হয়। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে মাতারবাড়ী প্রকল্পের বাস্তবায়নের শুরুতে এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৫ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা। পরে তা বেড়ে ৫১ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা হয়। এর মধ্যে ৪৩ হাজার ৯২১ কোটি টাকা জাইকার ঋণ এবং বাকি অর্থের জোগান দেওয়া হচ্ছে সিপিজিসিবিএলের নিজস্ব তহবিল থেকে।
অবশ্য ৫১ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকার মধ্যে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণকাজের আওতায় ১৪ দশমিক ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ, ৩৫০ মিটার প্রস্থ ও ১৮ দশমিক ৫ মিটার গভীর চ্যানেল, সি-ওয়ালসহ আনুষঙ্গিক ফ্যাসিলিটিস নির্মাণকাজ করা হয়েছে।
সম্প্রতি প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দক্ষিণ-পশ্চিমে চার কিলোমিটারের একটি সড়কপথ। পশ্চিমে সড়কের শেষ প্রান্তে ১৪ কিলোমিটারের মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর চ্যানেল। বঙ্গোপসাগর থেকে এই চ্যানেলে ঢুকে বিদেশি জাহাজগুলো পণ্য খালাস করে। চ্যানেলের সঙ্গে তৈরি হয়েছে পণ্য খালাসের একটি জেটি। জেটিতে ভেড়ানো ছিল ইন্দোনেশিয়া থেকে আসা কয়লাবাহী একটি জাহাজ। জাহাজ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কয়লা খালাস করা হচ্ছিল।
চ্যানেলের উত্তর-পশ্চিমে লম্বা পাথরের বাঁধ। দুই হাজার মিটারের বেশি দীর্ঘ এই বাঁধ দেওয়ার কারণ, সমুদ্রের বালুতে যেন চ্যানেলটি ভরাট না হয়।
প্রথম প্রকল্পের কেন্দ্রটিতে ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট রয়েছে। গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রথম ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়েছে। তার দুই দিন আগে একই ক্ষমতার দ্বিতীয় ইউনিটের পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরুর পর এখন এর টেস্টিং ও কমিশনিংয়ের কাজ চলছে।
সিপিজিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত পিডিবির কাছে প্রথম ইউনিট থেকে উৎপাদিত প্রায় ৭০০ কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিক্রি করা হয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটে উৎপাদিত বিদ্যুৎ মে মাসের শেষ দিকে অথবা জুনের শুরুতে বাণিজ্যিকভাবে জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে বলে আশা করছি। প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় পড়ছে ৮ টাকার মতো; যা অন্যান্য তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তুলনায় কম।’
তিনি বলেন, বিদেশ থেকে আমদানি করা কয়লা বড় জাহাজে করে সরাসরি বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকায় পৌঁছানোর ফলে কয়লা নামানোর খরচ নেই বললেই চলে। এখন পর্যন্ত যে কয়লা মজুদ আছে তা দিয়ে আগামী জুন পর্যন্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো যাবে। আরও কয়লা আমদানির জন্য ইতিমধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
আবুল কালাম আজাদ দাবি করেন, দেশের অন্যান্য তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তুলনায় এই কেন্দ্রের যন্ত্রপাতির দক্ষতা বেশি। পরিবেশের সুরক্ষার জন্য কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর সেই ধোঁয়া চারস্তরে পরিশোধনের পর ২৭৫ মিটার উঁচু চিমনির সাহায্যে বাতাসে ছাড়া হয়। এতে ৯৮ শতাংশ কার্বন পরিশোধন হওয়ায় এই কেন্দ্রে পরিবেশের ক্ষতি নেই বললেই চলে। অনলাইনের মাধ্যমে যে কেউ চাইলে এটা দেখতে পারবেন।