পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে উপার্জিত টাকা দিয়ে গোপালগঞ্জ সদরে ১ হাজার ৪০০ বিঘা জমির ওপর একটি রিসোর্ট নির্মাণের অভিযোগ জমা হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। এ ছাড়া বেনজীর ও তার স্ত্রী-সন্তানের নামে ঢাকা, গাজীপুর, সেন্টমার্টিনসহ আরও কয়েকটি স্থানে প্লট-ফ্ল্যাটসহ বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে রিসোর্টের তথ্য-উপাত্ত চেয়ে গোপালগঞ্জের ভূমি ও রেজিস্ট্রি অফিসে চিঠি পাঠিয়েছে দুদক। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে এ চিঠি পাঠানো হয়।
আর এর আগের দিন বুধবার দুপুরে দেশের ৬২টি তফসিলি ব্যাংকে বেনজীর আহমেদ ও তার স্ত্রী-সন্তানের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব, লেনদেন, এফডিআরসহ যাবতীয় তথ্য চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্ট ইউনিটে (বিএফআইইউ) চিঠি পাঠানো হয়। দুদকের একজন শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তা এসব তথ্য জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ও তার স্ত্রী-সন্তানের বিরুদ্ধে গোপালগঞ্জে ইকো পার্ক ও কয়েকটি কোম্পানি চালুর অভিযোগ করা হয়েছে। এর বাইরে তার বিরুদ্ধে আরও বিভিন্ন স্থানে জমি কেনার অভিযোগ আছে। এসব অভিযোগ অনুসন্ধানের স্বার্থে অনুসন্ধান টিম গত বুধবার দুপুরে ব্যাংকিং-সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে বিএফআইইউতে চিঠি দিয়েছে। পরদিন বৃহস্পতিবার গোপালগঞ্জের ভূমি অফিস ও রেজিস্ট্রি অফিসে চিঠি দিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে কোথায় কোথায় জমি, প্লট, ফ্ল্যাট রয়েছে তার তথ্য চেয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ (রাজউক), গাজীপুর উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ, রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব), সিটি করপোরেশন, ভূমি অফিস, রেজিস্ট্রি অফিস, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে দ্রুত এসব তথ্য দুদকে পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।’
এর আগে গত ২২ এপ্রিল দুদক সচিব খোরশেদা ইয়াসমিন প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, গত ৩১ মার্চ বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। পরবর্তীকালে আরও কয়েকটি গণমাধ্যমে একই ধরনের সংবাদ প্রকাশিত হয়। দুদক এসব অভিযোগ আমলে নেয়। গত ১৮ এপ্রিল কমিশন সভায় বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপরই বেনজীর আহমেদের অবৈধ সম্পদের অভিযোগ অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্যরা হলেন দুদকের উপপরিচালক মো. হাফিজুল ইসলাম, সহকারী পরিচালক নিয়ামুল হাসান গাজী এবং জয়নাল আবেদীন।
গত ৩১ মার্চ একটি জাতীয় দৈনিকে বেনজীরের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। যাতে বলা হয়, পুলিশের এই সাবেক মহাপরিদর্শক তার স্ত্রী জিশান মির্জা এবং দুই মেয়ে ফারহিন রিশতা বিনতে বেনজীর ও তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীরের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন করেছেন। তাদের ঢাকার অভিজাত এলাকাগুলোতে দামি ফ্ল্যাট, বাড়ি আর ঢাকার পাশে বিঘার পর বিঘা জমি রয়েছে। দুই মেয়ের নামে বেস্ট হোল্ডিংস ও পাঁচতারা হোটেল লা মেরিডিয়ানের রয়েছে দুই লাখ শেয়ার। পূর্বাচলে রয়েছে ৪০ কাঠার সুবিশাল জায়গা জুড়ে ডুপ্লেক্স বাড়ি, যার আনুমানিক মূল্য কমপক্ষে ৪৫ কোটি টাকা। একই এলাকায় আছে ২২ কোটি টাকা মূল্যের আরও ১০ বিঘা জমি। বেনজীর আহমেদের ৩৪ বছর ৭ মাসের দীর্ঘ চাকরিজীবনে বেতন-ভাতা বাবদ আয় ১ কোটি ৮৪ লাখ ৮৯ হাজার ২০০ টাকা হওয়ার কথা। অথচ তিনি শত শত কোটি টাকার মালিক।
ভাওয়াল রিসোর্টের জমি উদ্ধারের দাবিতে মানববন্ধন : গাজীপুর সদর উপজেলার ভাওয়ালগড় ইউনিয়নের নলজানী এলাকায় ভাওয়াল রিসোর্টের দখল করা জমি উদ্ধারের দাবিতে মানববন্ধন করেছে ভুক্তভোগী কয়েকটি পরিবার। গতকাল শনিবার সকালে সদর উপজেলার নলজানি এলাকার ভাওয়াল রিসোর্ট ও স্পার সামনে ওই মানববন্ধন হয়। এতে ভুক্তভোগীদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন মো. শফিউল্লাহ। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ভাওয়াল রিসোর্টের ভেতরে ২ একর এবং তার নানা মুক্তিযোদ্ধা ডা. সিরাজুল ইসলাম ও ভাই-বোনদের ১ একর জমি ছিল। জমিতে ধান চাষ হতো। ২০১৩ সালে রাতে কাঁচা ধান কেটে সকালে বালু ফেলে সব জমি ভরাট করে ফেলে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের লোকজন। অসংখ্য পুলিশ দাঁড়িয়ে থেকে বালু ফেলার কাজ তদারকি করে। জমির শোকে মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল হকের ভাই মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল হক মারা যান। এ ছাড়া নলজানি গ্রামের আমির উদ্দিনের ১৬ বিঘা এবং আবদুল মজিদ ও তার ভাইদের ৬ বিঘা জমিও একই কায়দায় দখল করে বেনজীর আহমেদের লোকজন। প্রতিবাদ করায় আমির উদ্দিন ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক চাঁদাবাজি ও অস্ত্র মামলা দিয়ে জেলে পাঠায়। পরে জমির শোকে আমির উদ্দিন, তার স্ত্রী ও এক ছেলে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। আবদুল মজিদের ছেলে রুহুল আমিন অভিযোগ করে বলেন, জোর করে জমি দখলে নিয়ে থেমে থাকেনি বেনজীর আহমেদের লোকজন। তার বাবা-চাচাদের নামে চাঁদাবাজি ও নারী নির্যাতন মামলা দিয়ে জেল খাটায়। বাধ্য হয়ে ছয় বিঘা জমি মাত্র তিন লাখ টাকায় বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন তারা।
প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়েছেন গাজীপুর প্রতিনিধি