সব কর্তাই মন্ত্রী সচিবের আত্মীয়

খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, প্রায় প্রতিটি পরিবারেই মুষ্টি তোলার রেওয়াজ ছিল। প্রতি বেলার রান্নার জন্য কৌটা মেপে যখন চাল নেওয়া হতো, তখন তা থেকে এক মুঠো চাল সরিয়ে রাখা হতো। এতে কারও ভাতে কম পড়ত না। কিন্তু একটু একটু করে জমে উঠত আরেকটি বিকল্প চালের ভান্ডার। চাল ফুরিয়ে গেলে অথবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাজারে যাওয়া না হলে পরিস্থিতি সামাল দিত এই মুষ্টিচাল।

একইভাবে রপ্তানি করে যখন আয় হয়, তখন তা থেকে একটা সামান্য অংশ অর্থাৎ কার্যাদেশের মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ জমিয়ে তহবিল করা হয়, যা কেন্দ্রীয় তহবিল নামে পরিচিত।

ব্যবসায়ীদের শ্রমে ঘামে গড়া প্রতিষ্ঠানের মুনাফার টাকায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এ তহবিলের গঠন প্রক্রিয়া ত্রুটিপূর্ণ। অপ্রয়োজনীয় খরচে কাঁচি চালিয়ে ব্যবসায়ীরা তিল তিল করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। অথচ তাদের দেওয়া টাকায় গড়া তহবিল ব্যবহার হচ্ছে ক্ষমতাশালীদের আত্মীয়স্বজনদের চাকরি দেওয়ার কাজে। যখন যে মন্ত্রী এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে এসেছেন, তারা তাদের আত্মীয়স্বজনকে এ তহবিলে চাকরি দিয়েছেন। এমনকি শ্রম মন্ত্রণালয়ের দাপুটে কর্মকর্তারা তাদের অবসর-পরবর্তী চাকরির ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছেন। পাশাপাশি স্বজনদেরও এখানে চাকরি দিয়েছেন। নিজেরা চাকরির বিধি তৈরি করেছেন। সেই নামমাত্র বিধি তৈরির আগেই তারা চাকরিতে ঢুকে গেছেন। তহবিলের ১০ কর্মকর্তার সবাই মন্ত্রী-সচিবদের কোনো না কোনোভাবে আত্মীয়।

এসব চাকরি দিতে নিয়মকানুন মানা হয়নি। চাকরি দেওয়ার আগে বিজ্ঞাপন প্রকাশের ন্যূনতম যে বাধ্যবাধকতা তা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সচিবালয়ের ভেতরে কেন্দ্রীয় তহবিল কার্যালয়ের দেয়ালে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ঝুলিয়ে দায় সারা হয়েছিল। নিয়ম মেনে একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়নি। একটু একটু করে জমা হয়ে বড় একটি তহবিল হলেও তা ভালো জায়গায় লগ্নি করা হয়নি। এমনকি খুব কম সুদে এ টাকা বিভিন্ন ব্যাংকে জমা রাখা হয়েছে। যে যৎসামান্য শ্রমিকদের আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে, তা নিয়েও বিস্তর প্রশ্ন উঠেছে।

মানা হয়নি দপ্তর গঠনের প্রক্রিয়া : আইন অনুযায়ী একটা দপ্তর করা কঠিন কাজ। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ফাইল চালাচালি হয়। এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে, এক মন্ত্রণালয় থেকে আরেক মন্ত্রণালয়ে ফাইল ঘোরাঘুরি করে। তারপর সরকারপ্রধানের অনুমোদনে একটা দপ্তর খোলা যায়। দপ্তর খোলার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় একটি মডেল বিধিমালা করে দিয়েছে। সেই মডেল বিধিমালার একটি বর্ণের ব্যত্যয় ঘটানো যায় না। অথচ শ্রম মন্ত্রণালয় কেন্দ্রীয় তহবিল দপ্তর খুলতে এসবের ধার ধারেনি। একটা দপ্তর খুলবে অথচ অর্থ মন্ত্রণালয় দেখবে না, তার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ কীভাবে হবে? জনপ্রশাসন দেখবে না, তার সাংগঠনিক কাঠামো কী? অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সীমা পাড়ি দিয়ে যেতে হয় প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায়। ১৫ থেকে ২০ জন সচিবের সমন্বয়ে গড়া এ সচিব কমিটি পাড়ি দেওয়া আরেক কঠিন কাজ। কেন্দ্রীয় তহবিলকে এসব পথ মাড়াতে হয়নি। শ্রম আইনের দোহাই দিয়ে বোর্ড যা ইচ্ছা তাই করেছে।

শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীনে শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন নামে ভিন্ন একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যার জন্য সংসদে আলাদা আইনও প্রণয়ন করা হয়েছে। ফাউন্ডেশনে নিয়মতান্ত্রিকভাবে পদ সৃজন হয়েছে। তবে সেই সংস্থায়ও জনবল নিয়োগ নিয়ে বিস্তর অনিয়ম রয়েছে। ফাউন্ডেশনে নিয়ম মেনে পদ সৃজন হলেও কেন্দ্রীয় তহবিলের বেলায় নিয়মকানুন মানা হয়নি। এর জন্য আলাদা আইন নেই। শ্রম আইনে প্রত্যেকটি রপ্তানিমুখী খাতের জন্য আলাদা আলাদা হিসাবসংক্রান্ত তহবিল গঠন করার কথা বলা হয়। কিন্তু কর্মকর্তারা সেই তহবিল পরিচালনার জন্য অধিদপ্তরের মতো বিশাল আকারের দপ্তর খুলে বসেছেন। নিজেদের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগের পথ সৃষ্টি করেছেন। তাদের বেতনভাতা সুযোগ-সুবিধাও অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের মতো নির্ধারণ করেছেন।

মহাপরিচালকের একতরফা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ : কেন্দ্রীয় তহবিলের বর্তমান মহাপরিচালক মোল্লা জালাল উদ্দিন। তিনি অবসর নেওয়ার আগে ছিলেন শ্রম মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব। অবসর নিয়েই বসে যান কেন্দ্রীয় তহবিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মহাপরিচালক পদে। এ পদে তিনি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন। কিন্তু চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার এখতিয়ার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের। মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে অনুমোদন দেন প্রধানমন্ত্রী। এখানে তাকে নিয়োগ দিয়েছে সংশ্লিষ্ট বোর্ড। মহাপরিচালকের মূল বেতন ৭১ হাজার ৫০ টাকা। বাড়িভাড়া ৩৫ হাজার ৫২৫, গাড়ির জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ ৫০ হাজার, চিকিৎসা ১ হাজার ৫০০, মোবাইল ফোন বিল ১ হাজার ৫০০ এবং আপ্যায়ন বিল ৯০০ টাকা। সব মিলিয়ে এ কর্মকর্তা পান ১ লাখ ৬০ হাজার ৪৭৫ টাকা। জানা গেছে, মোল্লা জালাল উদ্দিনের নিয়োগ একতরফা। নিয়োগপত্রে তার নিয়োগের কোনো মেয়াদ উল্লেখ নেই।

মোল্লা জালাল উদ্দিন শ্রম মন্ত্রণালয়ের আরও একটি বিশেষায়িত সংস্থা বাংলাদেশ শ্রমিককল্যাণ ফাউন্ডেশনেরও মহাপরিচালক। সেই সংস্থার জনবল নিয়োগ নিয়েও তেলেসমাতি ঘটনা ঘটেছে।

২০১৮ সালে এ তহবিলের যাত্রা শুরু হয়। ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত মহাপরিচালক ছিলেন আনিসুল আউয়াল। শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে অবসর নিয়ে তিনি এ দপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) হয়েছিলেন। মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি এমনভাবে বিধিমালা তৈরি করেছিলেন, যেন তার ডিজি হতে কোনো সমস্যা না হয়। আনিসুল আউয়ালকে অব্যাহতি দিয়ে নতুন মহাপরিচালক করা হয় শ্রম মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব আমির হোসেনকে। এরপর সেলিনা আক্তার হয়ে মোল্লা জালাল উদ্দিন দায়িত্ব নেন ২০২২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি।

কাদের হাতে ৪৭৬ কোটির তহবিল : কেন্দ্রীয় তহবিলে মোট ১০ জন কর্মকর্তা। যাদের সবাই শ্রম মন্ত্রণালয়ের উঁচু পদে দায়িত্ব পালন করে গেছেন এমন কারও না কারও আত্মীয়। আনিসুল আউয়াল চাকরিতে নিয়ে আসেন নিজের মেয়ে আনিকা তাশফিয়াকে। তিনি এখন তহবিলের সহকারী পরিচালক (কল্যাণ)। একসময় চাকরি দেন ভাতিজা মাগফুরুল আউয়াল মেরাজকে। তিনিও এখন সহকারী পরিচালক (আইটি)।

এ অধিদপ্তর হয়েছে মুজিবুল হক চুন্নুর শেষ সময়ে। মন্নুজান সুফিয়ান দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসে নিজের ভাইয়ের মেয়ে শামীমা সুলতানা হৃদয়কে তহবিলের সহকারী পরিচালক করেছেন। বর্তমানে তিনি চলতি দায়িত্বে তহবিলের উপপরিচালক। মন্নুজান সুফিয়ান চাকরি দিয়েছেন বোনের ছেলে এএম ইয়াছিন পৃথিবীকে। তিনি এখন সহকারী পরিচালক। হৃদয়ের স্বামী মুহাম্মদ মেহরাব পাটোয়ারীও আছেন কেন্দ্রীয় তহবিলের সহকারী পরিচালক পদে। মন্নুজান সুফিয়ানের অন্যতম ঘনিষ্ঠ শ্রম অধিদপ্তরের পরিচালক মিজানুর রহমানের শ্যালক কেএম আবদুল্লাহ হাবীবও আছেন তহবিলে। তিনি দায়িত্ব পালন করছেন উপসহকারী পরিচালক পদে। এ সাতজনের বাইরে আছেন সহকারী পরিচালক (অর্থ) মারুফা পারভীন, সহকারী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব, কল্যাণ-২) জুবায়ের আল মামুন ও উপসহকারী পরিচালক (অর্থ) শেখ সজিদুল ইসলাম। তাদের মধ্যে মারুফা পারভীন একজন সাবেক মন্ত্রীর ও অবসরপ্রাপ্ত সচিবের আত্মীয়। জুবায়ের আল মামুন ও শেখ সাজিদুল ইসলামের চাকরি হয় সাবেক প্রতিমন্ত্রী মন্নুজানের প্রভাবে। তাদের মধ্যে জুবায়ের আল মামুন সাবেক প্রতিমন্ত্রীর নিকটাত্মীয়।

লাখ লাখ শিক্ষিত বেকারের এই দেশে প্রতিযোগিতা করেও চাকরি পাওয়া যায় না। একটা পদের জন্য কয়েকশ প্রতিযোগীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে চাকরি পেতে হয়। সেই জায়গায় হৃদয়-পৃথিবীরা লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় বাছাই ছাড়াই চাকরি পেয়ে গেছেন। অতিরিক্ত সচিবকন্যা ও ভাতিজাকেও এসবের ধার ধারতে হয়নি। দক্ষিণাঞ্চলে বাড়ি হওয়ায় বড় পদ পেয়ে গেছেন দুজন। এসব চাকরি দিতে বা সাংগঠনিক কাঠামো চালাতে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং বা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মতামতও নেওয়া হয়নি।

কেন্দ্রীয় তহবিলে মোট ৪৭৮ কোটি টাকা জমা হয়েছে। এর মধ্যে বিলি হয়েছে ২০২ কোটি টাকা। এর বাইরেও রয়ে গেছে ২৭৬ কোটি টাকা। কাদের হাতে ব্যবসায়ীদের এ টাকা গচ্ছিত রাখা হয়েছে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

হৃদয়-পৃথিবীরা কেন্দ্রীয় তহবিলের টাকায় বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। যে টাকা শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যয় হওয়ার কথা, তা তারা ব্যয় করেছেন নিজেদের ভ্রমণ খরচ হিসেবে।

কী করতে পারে কেন্দ্রীয় তহবিল : শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্প খাতের জন্য শ্রম আইনের বিধান অনুযায়ী ‘কেন্দ্রীয় তহবিল’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তহবিল পরিচালনার জন্য পরিচালনা বোর্ড রয়েছে। বোর্ডে শ্রম প্রতিমন্ত্রী চেয়ারম্যান, সচিব ভাইস চেয়ারম্যান, সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী সংশ্লিষ্ট রপ্তানিমুখী শিল্প খাতের মালিকদের অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতিও ভাইস চেয়ারম্যান। আট সদস্যের বোর্ড একজন শ্রমিককে এককালীন ২ লাখ টাকা পর্যন্ত অনুদান দিতে পারে।

টাকা আছে তবুও শ্রমিক বঞ্চিত : যাদের শ্রমে তৈরি হচ্ছে রপ্তানিযোগ্য পণ্য, বড় বড় আবাসন, ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে, টানেল সেই নির্মাণশ্রমিকরা কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় জখম হওয়ার, এমনকি মৃত্যুর খবরও পাওয়া যায়। তাদের পরিবার অসহায় হয়ে পড়ে। অথচ তাদের জন্য যে টাকা বরাদ্দ আছে, এমনকি জমা আছে, তাও খরচ হয় না। অথচ কত শ্রমিক মানবেতর জীবনযাপন করছেন, তাদের সন্তানরা লেখাপড়া করতে পারছে না। কেন্দ্রীয় তহবিল সংশ্লিষ্টদের অবহেলা এতটাই চরম। শ্রমিকদের দেওয়ার নামে যেসব টাকা বিলি হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

কেন্দ্রীয় তহবিলের বিষয়ে জানতে গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে গেলে কথা হয় প্রতিমন্ত্রী নজরুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় তহবিল রপ্তানিমুখী শিল্পমালিকদের টাকায় গড়া। কাজেই স্বচ্ছতা থাকতে হবে শতভাগ। যেকোনো কাজে স্বচ্ছতা থাকলেও এ বিষয়ে আরও বেশি স্বচ্ছতা থাকবে। আমি মন্ত্রণালয়ের সব কাজ গভীরভাবে বুঝতে চেয়েছিলাম। কিছুটা সময় লেগেছে। সময় লাগলেও আমি অনিয়মকে প্রশ্রয় দেব না। আর্থিক অনিয়ম থেকে শুরু করে যেকোনো তুচ্ছ অনিয়মও এ খাতে হবে না। আগে কোনো অনিয়ম হলে সেটা কীভাবে দূর করা যায় সেই চেষ্টা করব।’

প্রতিমন্ত্রী শ্রম খাতের যেকোনো অনিয়ম নিরপেক্ষ ও নির্মোহ জায়গা থেকে তুলে ধরার আহ্বান জানান।