বাংলাদেশের অর্থনীতি ইয়োলো জোনে আছে এটাকে রেড জোন বলা ঠিক হবে না। এ অবস্থায় আরও দুই থেকে তিন বছর থাকতে পারে বাংলাদেশ। গত তিন বছরে সামষ্টিক অর্থনীতির অবস্থা ভালো না, মূল্যস্ফীতি এখন ডাবল ডিজিটে। এ বাজেটও উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে সামনে রেখেই করা হচ্ছে। তা ছাড়া এ দেশে এত মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজন নেই। এগুলোকে একীভূতকরণের সময় এসেছে।
গতকাল রবিবার দ্য ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) আয়োজিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় বক্তারা এ কথা বলেন। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর। সভাপতিত্ব করেন আইসিএবির প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ ফোরকান উদ্দিন। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘এবারের বাজেটের প্রথম লক্ষ্য থাকতে হবে দেশে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিয়ে আসা। এমনিতেই আমাদের অনেক দেরি হয়ে গেছে, এর খেসারতও দিতে হচ্ছে। খেসারত দিতে হচ্ছে মূল্যস্ফীতিতে, এটি কমছে না; বরং সামনের দিনগুলোতে আরও বাড়বে।’
আহসান এইচ মনসুর বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সরকারের হাতে পর্যাপ্ত টাকা নেই। কিন্তু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ডলারের দাম সমন্বয় ও রিজার্ভ বাড়ানোর চাপ আছে। তা ছাড়া বিদেশি ঋণ শোধেরও একটা বড় চাপ আছে। আগামী অর্থবছরে কয়েক বিলিয়ন ঋণ শোধের চাপ আছে।
এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, ‘আমাদের দেশের আধুনিক ট্যাক্স সিস্টেমের সঙ্গে সমন্বয় নেই। গত ১০ বছরে ভারতের সবচেয়ে বেশি কর আদায় হয়েছে প্রত্যক্ষ করের মাধ্যমে। অথচ আমাদের ফোকাস পরোক্ষ করের ওপর।’
পতিত জমির ওপর করারোপের প্রস্তাবের প্রসঙ্গ তুলে আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘আমাদের দেশের আয়করব্যবস্থা এত খারাপ হওয়ার মূল কারণ আমরা সম্পদের সঠিক মূল্যায়ন করতে জানি না। পূর্বাচলে একটি বিল্ডিংও ওঠেনি, অথচ একেকটি জমি তিন থেকে চারবার বিক্রি হয়েছে। পতিত জমির ওপর করারোপ করা হলে জমির দাম এত বাড়ত না। সৌদিতে দেখেছি, তাদের জমি খালি থাকলেই কর দিতে হয়।’
ভ্যাটের পুরনো আইনে ফেরত যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘ভ্যাটের ক্ষেত্রে ২০১২ সালের যে আইন, সেই আইনই নিয়ে আসা হোক। তখন অনেক সমাধান চলে আসবে। ট্যাক্স রেট বাড়ানোর কোনো দরকার নেই। আমাদের কর প্রশাসন দক্ষ হলে কর আদায় তিন গুণ বাড়বে।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. শামসুল আলম বলেন, ‘সরকার বেশি ঋণ নেয় ব্যাংক খাত থেকে, বেসরকারি খাত পায় না। এমনিতেই কর-জিডিপি অনুপাতে আমাদের দেশ সবচেয়ে নিচের দিকে। নেপালের মতো ৪০ বিলিয়ন ডলারের জিডিপির দেশে কর আদায় ১৭ দশমিক ৬ শতাংশের বেশি। এখানে আমাদের সংস্কারের প্রয়োজন আছে।’
ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত হয়রানির অভিযোগের ভিত্তিতে সাবেক প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘হয়রানি কিছু সত্য হলেও তা দুঃখজনক। সব মিলিয়ে এনবিআর সংস্কারবিমুখতার পরিচয় দিয়েছে। আইআরডিতে দায়িত্ব পালন করা একই ব্যক্তি এনবিআরে দায়িত্ব নিচ্ছেন।’
ড. শামসুল আলম বলেন, ‘এত কর অবকাশ সুবিধা থাকা উচিত নয়। গত কয়েক বছর কর অবকাশ সুবিধা দিয়ে কতটা সুফল এসেছে, সেটি দেখার বিষয়। তবে আশার কথা, এত কম কর-জিডিপি অনুপাত নিয়েও আমাদের প্রবৃদ্ধি থেমে থাকেনি। করোনা আর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ না হলে আমাদের প্রবৃদ্ধি এখন ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যেত। আমাদের প্রবৃদ্ধি খাটো হয়ে আছে। কারণ এফডিআই সেভাবে আসছে না। যেসব দেশে কর আদায় ভালো, সেই সব দেশে এফডিআই আসে বেশি।’
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বাংলাদেশের করপদ্ধতি বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিপন্থী। এখন করপদ্ধতি সহজ না হলে তারা যোগসাজশের মাধ্যমে কর ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করবে।
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘এতগুলো মন্ত্রণালয়ের দরকার আছে বলে মনে করি না। পাটের রপ্তানি ১ বিলিয়ন ডলার, তাদের মন্ত্রণালয় আছে, কিন্তু আমাদের জন্য বস্ত্র অধিদপ্তরে শুধু একটা উইং আছে। তা ছাড়া ইদানীং ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা হচ্ছে বেশি। তিনটি স্পটে ধাপে ধাপে অত্যাচার করছেন কর্মকর্তারা। অত্যাচারে ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ। এ বছর অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। বেশিরভাগ কারখানা আগামী মাসের মধ্যে ব্যাংকে খেলাপি হয়ে পড়বে।’
এমসিসিআইর সাবেক সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, যেসব প্রকল্প একদমই প্রয়োজন নেই, দুঃসময়ে এগুলো বাদ দিয়ে দেন। ট্যাক্স রিফান্ডের জন্য বরাদ্দ থাকা উচিত।
তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়গুলোর মার্জ (একীভূতকরণ) দরকার আছে। সরকারের লোক নিয়োগ কয়েক বছরের জন্য স্থগিত রাখা প্রয়োজন আছে। পরে অর্থনীতি ভালো হলে আবার নিয়োগ চালু করা যেতে পারে।
পিআরইর অর্থনীতিবিদ আশিক রহমান বলেন, ‘গত তিন বছর আমাদের দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বেহাল অবস্থা। মূল্যস্ফীতি দুই ডিজিটে চলে গেছে। এবারের বাজেটও করতে হবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সঙ্গে নিয়েই। আমাদের রিজার্ভ কমছে তো কমছেই।’
তিনি বলেন, ‘অর্থনীতির এ সময়ে এতগুলো মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রয়োজন আছে কি না, ভেবে দেখা দরকার। বাংলাদেশের বাজেট ও অর্থনীতি এখন ইয়েলো জোনে আছে। ১০টি ব্যাংকের যে একীভূতকরণের কথাবার্তা আসছে, সেই ১০টা ব্যাংকেই খেলাপি ঋণ ৮৪ হাজার কোটি টাকা।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক অপ্রয়োজনীয় মন্ত্রণালয় আছে, যেগুলোর কোনো প্রয়োজন নেই। পাট মন্ত্রণালয়ের কী প্রয়োজন এখন? তা ছাড়া পানিসম্পদ ও নৌ-পরিবহনকে একীভূতকরণ প্রয়োজন। আগামী কয়েক বছর সরকারি খাতে নিয়োগ বন্ধ রাখুন।’
আইসিএবির সভাপতি ফোরকান উদ্দিন বলেন, ‘ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির চাপ, জ্বালানি ঘাটতি, ভারসাম্যের ঘাটতি এবং রাজস্ব ঘাটতি বাংলাদেশের অগ্রগতিকে ব্যাহত করছে। প্রয়োজনে কৌশলের স্বার্থে বৃদ্ধির হার পরিবর্তন করা যেতে পারে। কিন্তু আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত দৃষ্টিতে, ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সেক্টরাল রিফর্ম, ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, ট্যাক্সের সরলীকরণ, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংহতকরণ, এফডিআই আকর্ষণে প্রতিযোগিতামূলকতাকে এবারের বাজেটে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।’
আইসিএবির সিইও শুভাশীষ বোস বলেন, চলতি অর্থবছর ২০২৩-২৪ শেষ হতে চলেছে। এ বছরের বাজেটের বরাদ্দ হলো ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা, যা সামাজিক অবকাঠামো, ভৌত অবকাঠামো, সামাজিক পরিষেবা, ঋণ পুনঃপ্রদান, পিপিপি ভর্তুকি এবং দায় এবং অন্যান্য অনেক খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এই বাজেট ২০২২-২৩ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ১২ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। তাই বাজেট সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি ক্রমবর্ধমান বরাদ্দ দরকার। এই বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৬ শতাংশ। এনবিআরের রাজস্ব আদায় ও অন্যান্য সম্পদ থেকে দেশের ক্রমবর্ধমান বাজেট মেটানো হবে।
শুভাশীষ মনে করেন, বাংলাদেশে কর-টু-জিডিপি অনুপাত তুলনামূলকভাবে কম। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (ওগঋ) দ্বারা নির্ধারিত শর্তাবলির সঙ্গে সামঞ্জস্য করার জন্য, ঘইজ-কে ঋণ ২০২৩-২৪ এবং ঋণ ২০২৪-২৫-এর মধ্যে কর-থেকে-জিডিপি অনুপাত শূন্য দশমিক ৫ এবং ঋণ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শূন্য দশমিক ৭ বৃদ্ধি করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নেপালে কর-জিডিপি অনুপাত ১৪ শতাংশ যেখানে ভারতে ১৫-১৬ শতাংশ। সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড এবং আইসল্যান্ডের মতো নর্ডিক দেশগুলোতে অনুপাত ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ।