নির্বাচন এড়িয়ে হারিয়ে যাওয়ার রাজনীতি

গত ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতে পাঁচ মাসের মাথায় আয়োজন হচ্ছে স্থানীয় সরকার পর্যায়ের বড় এই নির্বাচনের। যদিও জাতীয় নির্বাচনের মতোই উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না দেশের রাজনীতিতে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। ফলে নিরপেক্ষতার পরীক্ষায় বড় কোনো বাধা নেই ক্ষমতাসীনদের। অর্থাৎ উন্মুক্ত পদ্ধতিতে এই নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ স্থানীয় পর্যায়ের যোগ্য নেতৃত্ব খুঁজে নেবে। যা ভবিষ্যতে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনে কাজে দেবে। আওয়ামী লীগ যখন স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে তখন নির্বাচন বর্জনের ধারা অব্যাহত রেখে বিএনপি রাজনীতে পিছিয়ে পড়ছে কি না সেটাই বড় প্রশ্ন।

ঘোষিত তফসিল অনুসারে প্রথম ধাপে ৮ মে ১৫২টি উপজেলায় ভোট হবে। এরপর ২৩ ও ২৯ মে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপ এবং ৫ জুন শেষ ধাপের ভোট হবে। এসব উপজেলায় চেয়ারম্যান, সাধারণ ভাইস চেয়ারম্যান ও সংরক্ষিত ভাইস চেয়ারম্যান পদে হবে সাধারণ নির্বাচন। আইনে দলীয় প্রতীকে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে ভোট করার সুযোগ থাকলেও স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচনে দলীয় প্রতীক বা মনোনয়ন না দেওয়ার কথা আগেই জানিয়ে রেখেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ নেতাদের নির্বাচন করতে হচ্ছে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে নির্বাচন পরিচালনা বিধি ও আচরণবিধি সংশোধন করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার পথ সহজ করেছে। এতদিন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে ২৫০ জন ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষরের যে তালিকা মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দিতে হতো, এবার তা দিতে হবে না। সেই সঙ্গে সাদা-কালোর সঙ্গে রঙিন পোস্টারও ছাপাতে পারবেন প্রার্থীরা। ভোটের প্রচারের সময়ও পাচ্ছেন বেশি। তবে জামানতের পরিমাণ বেড়েছে এবার। চেয়ারম্যান পদে জামানতের পরিমাণ ১০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা করা হয়েছে। ভাইস চেয়ারম্যান পদে জামানত ৫ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৭৫ হাজার টাকা। এ কারণে রাজনীতিতে প্রধান বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে যে কেউ চাইলেই প্রার্থী হতে পারছেন না। প্রতীক না থাকলেও ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে তাদের এবং কোথাও কোথাও একাধিক প্রার্থীকে মোকাবিলা করতে হবে। তাই অনেক সাধারণ জনপ্রিয় ব্যক্তি নির্বাচন থেকে দূরে সরে গেছেন।

দেশে এখন ৪৯৫টি উপজেলা রয়েছে। চার ধাপে নির্বাচন উপযোগী ৪৮৫টির ভোট হবে, পরে মেয়াদোত্তীর্ণ হলে বাকিগুলোয় ভোট হবে। ১৯৮৫ সালে উপজেলা পরিষদ চালু হওয়ার পর ১৯৯০ ও ২০০৯ সালে একদিনেই ভোট হয়েছিল। ২০১৪ সালে চতুর্থ উপজেলা নির্বাচন ছয়টি ধাপে ও ২০১৯ সালে পাঁচ ধাপে পঞ্চম উপজেলা পরিষদের ভোট হয়।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিলেও বিএনপি পরে নির্দলীয় উপজেলা ভোটে অংশ নিয়েছিল। তবে গেল ১০ বছর ধরে উপজেলা ভোটে দলীয় প্রার্থী দেয়নি দলটি। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন বর্জন করার পর এবার স্থানীয় নির্বাচনেও অংশ না নেওয়ার দলীয় সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে তারা। দলের সিদ্ধান্ত না মেনে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন, এমন নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে বিএনপি। এরই মধ্যে প্রথম ধাপের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া ৭৬ জনকে বহিষ্কার করেছে দলটি। পরে অবশ্য এক প্রার্থী ভুল স্বীকার করে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলে তার বহিষ্কার আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। এমন শক্ত পদক্ষেপেও নির্বাচন থেকে সরানো যাচ্ছে না নেতাদের। নিশ্চিত বহিষ্কার হবেন জেনেও পরবর্তী ধাপের নির্বাচনগুলোতেও প্রার্থী হবেন তারা। তবে বহিষ্কৃতরা বলছেন নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত দল দেরিতে দিয়েছে। সিদ্ধান্ত আসার আগে দলটি থেকে অনেকেই প্রার্থী হন। পরে তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিতে কেন্দ্র থেকে নির্দেশ আসে। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞায় সাড়া না দিয়ে প্রার্থিতা বহাল রাখেন অনেকেই। তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে ২৪ এপ্রিল কারণ দর্শানোর চিঠি পাঠানো হয়। দলের এমন সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়েছেন নেতারা। শেষ সময়ে নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তে অনেকটা নিরুপায় হয়ে নির্বাচনে থাকতে বাধ্য হয়েছেন বলেও জানিয়েছেন কেউ কেউ। তাই তারা মনে করেন, দলের নমনীয় হওয়া উচিত ছিল। যদিও উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা না করা নিয়ে বিএনপিতে দ্বৈত মত ছিল। রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে যেমন মত ছিল, তেমনি নির্বাচনে গিয়ে তেমন কোনো অর্জন হবে না এমন কথাও হয়েছে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে। তবে ঘোষণা দিয়ে নির্বাচনে অংশ না নিলেও কেউ প্রার্থী হলে তাকে বারণ করবে না এমন কৌশল নেওয়ার পক্ষেও মত এসেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাউকেই প্রার্থী হতে দিচ্ছে না বিএনপি।

বর্তমান সরকারের অধীনে বিএনপির নির্বাচন বর্জনের কৌশল বিএনপির জন্য অস্তিত্ব সংকটের পরিস্থিতি তৈরি করছে। একটি বড় রাজনৈতিক দল দীর্ঘ সময় নির্বাচনে না থাকায় প্রতিনিধি পর্যায়ে দলের মতের গুরুত্ব পাচ্ছে না। এই অবসরে দলের নেতাকর্মীরা যেমনি ঝিমিয়ে পড়ছে, তেমনি দলের নেতৃত্ব সংকটও বাড়বে। বিএনপি টানা দশ বছর স্থানীয় নির্বাচনের বাইরে থাকার ফলে দলের নেতাকর্মীদের বাঁধ ভাঙছে। এক সময় দলের যেই নেতারা স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও দল নির্বাচনে না যাওয়ায় তারা প্রার্থী হতে পারছেন না। যা দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করছে। পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকার সুযোগে অনেক জনপ্রিয় নেতার স্থানে অন্য দলের নেতারা স্থান করে নিচ্ছেন। যেটা দলের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে। এছাড়া দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে কেউ কেউ বহিষ্কারের মুখে পড়েছেন। অনেকে বহিষ্কার হয়ে অন্য দলের হাল ধরেছেন আর বিএনপি হারিয়েছে দলের একজন নেতাকে। বিগত ৫ম উপজেলা নির্বাচনে দলের বিরুদ্ধে গিয়ে শতাধিক নেতা বহিষ্কারের মুখে পড়েছিলেন। এবারের নির্বাচনে প্রথম ধাপে ৭৫ জন বহিষ্কার হলেন। বাকি ৪ ধাপে আরও অনেক নেতা বহিষ্কার হতে পারেন দলের নির্বাচন বিমুখতার কারণে। স্থানীয় পর্যায়ে নেতারা নিজ এলাকার আধিপত্য ধরে রাখতে চান। জনগণের কাছে তাদের কমিটমেন্ট আছে। জনগণ চায় এই প্রার্থী তাদের প্রতিনিধি হোন। ফলে বিএনপি এভাবে নির্বাচন বর্জন করতে থাকলে নেতারা দলের শৃঙ্খলা ভাঙতে বাধ্য হবেন। এতে বিএনপির বহিষ্কারের তালিকাই দীর্ঘ হবে। বিগত যে-কটি নির্বাচন বিএনপি বর্জন করেছে সেসব নির্বাচনে অংশ নিয়ে এ পর্যন্ত কয়েক হাজার নেতা বিএনপি থেকে বহিষ্কার হয়েছেন।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে শুরু হওয়া সরকার পতনের আন্দোলন এখনো চালিয়ে যাচ্ছে বিএনপি। এখন এই আন্দোলন শুধু নিয়মরক্ষার আন্দোলনই বলা যায়। নির্বাচনের আগে সরকার পতনের আন্দোলনে সফলতা পায়নি দলটি। নির্বাচন বর্জন করে জাতীয় সংসদেও নেই। এখন উপজেলা নির্বাচন বর্জনের মধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনীতি থেকেও এক অর্থে গুটিয়ে যাচ্ছে বিএনপি। কেবল আন্দোলন করে মাঠে থাকতে চান না রাজনীতিকরা, ক্ষমতাও চান। বিএনপি গত প্রায় দেড় যুগ ধরে ক্ষমতার বাইরে। ২০০৬ সালে ক্ষমতা ছাড়ার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার টানা ক্ষমতায় এই দীর্ঘ সময়ে দলের চেয়ারপারসনের অসুস্থতা ও আদালত কর্র্তৃক সাজাপ্রাপ্ত হয়ে রাজনীতির মাঠে না থাকার কারণে দলের নেতৃত্বের সংকট রয়েছে। এ দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সিদ্ধান্ত আসে প্রবাসে থাকা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছ থেকে। তিনিও রাজনীতির মাঠে অনুপস্থিত দীর্ঘদিন। এ কারণে মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের পাল্স তিনি অনুধাবন করতে পারছেন না। অনেক নেতাকর্মীর মধ্যে এ ভাবনাও কাজ করছে দলের অনেক শীর্ষ নেতা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না বলে দলের অন্য নেতাকর্মীদের নির্বাচনে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। যদিও এ ভাবনা অমূলক। তবে মাঠ পর্যায়ের জনপ্রিয় নেতাদের নির্বাচনের বাইরে রেখে বিএনপি অবিচারই করছে। রাজনীতির মাঠে টিকে থাকার জন্য নির্বাচনে অংশ নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। নির্বাচনে পরাজিত হওয়া বা পরাজিত করানোও সবই একটি রাজনৈতিক দলের জন্য প্লাস পয়েন্ট। ২০২২ সালে কুমিল্লার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় মনিরুল হক সাক্কুকে দল থেকে বহিষ্কার করে বিএনপি। এই মনিরুল হক সাক্কু ২০১২ সালে প্রথম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আফজাল খানকে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং পরে ২০১৭ সালে দ্বিতীয়বার মেয়র হন। তিনি যখন ২০২২ সালে নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলেন, দল থেকে না করা হয়। তুমুল জনপ্রিয় এই নেতা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে গিয়ে মাত্র ৩৪৩ ভোটের ব্যবধানে হেরে যান আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কাছে। বিএনপি তার সঙ্গে থাকলে হয়তো সাক্কু নির্বাচিত হতে পারতেন। এটা আসলে প্রমাণ করে জনপ্রিয় নেতাদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখা বা দল থেকে সরিয়ে দেওয়া দলের জন্যই ক্ষতিকর।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও সংবাদ বিশ্লেষক

zakpol74@gmail.com