খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার ৪ নম্বর খর্ণিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ দিদারুল হোসেন দিদার। একসময় থাকতেন ঢাকায়। সে সময় চলচ্চিত্র অঙ্গনে নিয়মিত যাতায়াত ছিল তার। বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় সিনেমার প্রযোজকও তিনি। কিন্তু পরে এলাকায় গিয়ে হয়েছেন জনপ্রতিনিধি। পরপর তিনবার খর্ণিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। তবে টানা ক্ষমতায় থাকার কারণেই হয়তো নিজের ইউনিয়নে অলিখিত কিছু ‘আইন’ তৈরি করেছেন তিনি। একাধিক ইউপি সদস্যের ভাষ্য, ইউনিয়নে আসা মোট প্রকল্পের ৪০ ভাগ বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাখেন নিজের হাতেই। অথচ সেগুলোর বাস্তবায়ন দেখান খাতা-কলমে। বাকি ৬০ ভাগ প্রকল্প ১২ জন ইউপি সদস্যের মধ্যে বিতরণ করেন। সে ক্ষেত্রেও বিশ্বস্ত ইউপি সদস্যকে বেশি প্রকল্প দিয়ে বাগিয়ে নেন অর্থ। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে বরাদ্দ হওয়া টিউবওয়েল বণ্টনের ক্ষেত্রেও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। পরিষদের রাজস্ব আয়ের টাকাও নয়ছয় করার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। অবশ্য শেখ দিদারের দাবি, সব প্রকল্পই তিনি নিয়ম মেনে বণ্টন করেন। স্থানীয় রাজনৈতিক বিভাজনের জন্যই তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করা হয়েছে।
ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জানা গেছে, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইউনিয়ন পরিষদে লোকাল গভর্ন্যান্স সাপোর্ট প্রজেক্ট-৩-এ (এলজিএসপি প্রকল্প) ৪৯ লাখ ৩ হাজার ৭১৭, ১ শতাংশ প্রকল্পে ৪৫ লাখ ৯৮ হাজার ৯০০, উন্নয়ন সহায়তা প্রকল্পে ২১ লাখ ৫৯ হাজার ২০০, টিআর-কাবিখা প্রকল্পে ৭৬ লাখ ১৫ হাজার ৫৪০, ৫ শতাংশ বা হাটবাজারে ৮ লাখ, এডিপি থেকে ৫ লাখ টাকা ও উপজেলা উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ পায়। এ ছাড়া জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে দুই অর্থবছরে ২৬টি ডিপ টিউবওয়েল বরাদ্দ দেওয়া হয়।
ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শেখ লুৎফর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খর্ণিয়া ইউনিয়ন পরিষদের অনিয়ম ও দুর্নীতির হিড়িক পড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বরাদ্দ আসা ১৩টি ডিপ টিউবওয়েল চেয়ারম্যান শেখ দিদারুল হোসেন দিদার একাই ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা করে বিক্রি করেছেন। কোনো ইউপি সদস্যকেই দেওয়া হয়নি। তিনি জানান, ইউনিয়নের যত প্রকল্প আসে তার ৪০ ভাগই নেন চেয়ারম্যান। কিন্তু তার প্রকল্প বাস্তবায়নে ১ লাখ টাকায় মাত্র ১০ হাজার টাকার মতো কাজ হয়। বাকি টাকা খাতা-কলমে বাস্তবায়ন দেখিয়ে চেয়ারম্যান মেরে খান।’
লুৎফর রহমান আরও জানান, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ইউনিয়নের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেঞ্চ বিতরণে ২ লাখ ৯৭ হাজার ৯০০ টাকা বরাদ্দ আসে। বেঞ্চ তৈরিতে মেহগনি কাঠ ব্যবহারের কথা উল্লেখ রয়েছে। অথচ তিনি কম মূল্যের শিরীষ কাঠ দিয়ে বেঞ্চ তৈরি করেন। প্রতিটি বেঞ্চে ৬ হাজার ৬২০ টাকা বরাদ্দ ছিল। কিন্তু তৈরিকৃত বেঞ্চপ্রতি ব্যয় হয়েছে মাত্র ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা।
ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য সঞ্জয় মল্লিক, রাশিদা, আলেয়া ও শিউলী জেলা প্রশাসকের দপ্তরে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করেছেন। অভিযোগে তারা উল্লেখ করেন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ইউনিয়ন পরিষদ উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের বিবিজি দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ বরাদ্দ খরচে কোনো সভা করা হয়নি। নিয়মবহির্ভূতভাবে গোপনে নিজে প্রকল্প গ্রহণ করেছেন চেয়ারম্যান। সেই প্রকল্প বাস্তবায়নে সীমাহীন দুর্নীতি করা হয়েছে। অভিযোগে তারা বলেন, হতদরিদ্র পরিবারের মাঝে রিংসø্যাব বিতরণে ২ লাখ টাকার এস্টিমেট করা হয়। প্রকল্পে প্রতি সেটের জন্য বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার ৩০ টাকা। কিন্তু ব্যয় করা হয়েছে মাত্র ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা। নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে বানানোর কারণে উপকারভোগীদের মাঝে বিতরণকালে কিছু স্ল্যাব ভেঙে গেছে।
ইউপি সদস্য মহসিন শেখ দেশ রূপান্তরকে জানান, ওয়ার্ড সভা থেকে প্রস্তাব আসবে কোথায় প্রকল্প নেওয়া প্রয়োজন। নিয়ম অনুযায়ী চেয়ারম্যান কোনো প্রকল্পই পাবেন না। ইউপি সদস্যরা প্রকল্প পাবেন এবং ওয়ার্ডে বাস্তবায়ন করবেন। চেয়ারম্যান শুধুই মনিটরিং করবেন। কিন্তু চেয়ারম্যান মোট প্রকল্পের ৪০ ভাগ একাই নিচ্ছেন। সেগুলো নামমাত্র কাজ করে টাকা তুলে নেন। এতে কাজের মান খুব খারাপ হচ্ছে।
তিনি জানান, চেয়ারম্যান ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা করে ডিপ টিউবওয়েল বিক্রি করেন। এ ছাড়া প্রতি ডিপ টিউবওয়েল বরাদ্দ হয় ৭৫ হাজার টাকা। সেই বরাদ্দ থেকেও টাকা নেন তিনি। ফলে ডিপ টিউবওয়েল সঠিকভাবে স্থাপন হয় না। এরপর নলকূপের গোড়াও পাকা করে দেননি। উপকারভোগী নিজেরা নিজস্ব অর্থ খরচ করে নলকূপের গোড়া পাকা করেছেন।
এসব ব্যাপারে খর্ণিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ দিদারুল হোসেন দিদার জানান, চেয়ারম্যান হিসেবে বিভিন্ন ওয়ার্ডে দেওয়ার জন্যই প্রকল্প নেন তিনি। তবে কাজ ভালোভাবে করেই বিল ওঠানো হয়। এসব অভিযোগ উদ্দেশ্যমূলক করা হচ্ছে।
ডিপ টিউবওয়েল সম্পর্কে বলেন, ‘কোনো টাকা নেওয়া হয়নি। যদি উপকারভোগীর কাছ থেকে অন্য কেউ টাকা বা ঘুষ নেয়, সে ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান দায়ী নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘যেকোনো প্রকল্পের কাজ ঠিকাদারের মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করা হয়। বেঞ্চ দুই দফায় সরবরাহ করা হয়। প্রথম দফায় বেঞ্চের কিছুটা সমস্য ছিল। পরের দফায় ভালো বেঞ্চ সরবরাহে তদারকি বাড়ানো হয়। জনগণকে বিভ্রান্ত করতেই আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার হচ্ছে।’