বাইরে বিক্ষোভ তিনি দিচ্ছিলেন নিয়োগ

তিন বছর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করে বিদায় নেন অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ। এ সময়ে দুই হাজারের বেশি লোককে নিয়োগ দিয়েছেন তিনি।

শুধু তাই নয়, নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ডা. দীন মো. নূরুল হকের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার তিন দিন পর তড়িঘড়ি করে এক দিনে ১ হাজার ১ জন কর্মচারীর চাকরি স্থায়ী করেন শারফুদ্দিন আহমেদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন রেজিস্ট্রার অধ্যাপক হাফিজুর রহমান গত ২০ মার্চ এ প্রজ্ঞাপন জারি করেন। ওই প্রজ্ঞাপনের কপি এ প্রতিবেদকের কাছে আছে।

সাবেক উপাচার্য ১ হাজার ১ জনের চাকরি এমন এক সময়ে স্থায়ী করেন যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সব ধরনের নিয়োগ, পদোন্নতি ও চাকরি স্থায়ীকরণ বন্ধ রাখার জন্য আন্দোলন করছিলেন।

এ নিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সাবেক উপাচার্যপন্থিদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আন্দোলনকারীরা সাবেক উপাচার্য শারফুদ্দিনকে ঘেরাও করেন এবং নতুন উপাচার্য নিযুক্ত হওয়ায় তাকে নিয়ম অনুযায়ী শুধু রুটিন দায়িত্ব পালন করার কথা বলেন।

তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিএসএমএমইউতে প্রচুর পুলিশ মোতায়েন করা ছিল। বিদায়ের আগের শেষ দুই সপ্তাহ উপাচার্য ডা. শারফুদ্দিন পুলিশ পাহারায় অফিস করেছেন। তখন বিরোধী শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বাধার কারণে অনেক চেষ্টা করেও সিন্ডিকেট সভা করতে পারেননি তিনি। তবে সিন্ডিকেট সভা করতে ব্যর্থ হলেও এবং বাইরে আন্দোলন চললেও উপাচার্য ও তার অনুগতরা পুলিশ পাহারায় এক দিনে ৪৭টি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ১ হাজার ১ জনের চাকরি স্থায়ী করেন।

অভিযোগ রয়েছে, চাকরি স্থায়ী হওয়া এ কর্মচারীরা অধ্যাপক শারফুদ্দিনের আমলে বিভিন্ন সময়ে নিয়োগ পান। নিয়োগের সময় তাদের কাছ থেকে জনপ্রতি ১০-১৮ লাখ টাকা নেওয়া হয়। আবার তাদের চাকরি স্থায়ী করতেও জনপ্রতি ১-২ লাখ টাকা নেয় উপাচার্য শারফুদ্দিনের ঘনিষ্ঠ লোকেরা। চাকরি স্থায়ীকরণে ১০-১৫ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। ঘুষ নিয়ে কর্মচারীদের চাকরি দেওয়া ও চাকরি স্থায়ীকরণে অধ্যাপক শারফুদ্দিন বেশ চাপে ছিলেন। তিনি ভেবে রেখেছিলেন আবার উপাচার্যের দায়িত্ব পেলে ধাপে ধাপে চাকরি স্থায়ী করবেন।

উপাচার্য হিসেবে আবার নিয়োগ পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা যখন দেখলেন না তখন তিনি চাকরি স্থায়ীকরণে মরিয়া হয়ে ওঠেন। দেশের ইতিহাসে এক দিনে হাজারের বেশি চাকরি স্থায়ী করার ঘটনা নজিরবিহীন।

বিএসএমএমইউর উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক ডা. দীন মো. নূরুল হকের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হয় গত ১১ মার্চ। এরপরই বিদায়ী উপাচার্য তড়িঘড়ি করে ১ হাজার ১ জনের চাকরি স্থায়ী করার প্রজ্ঞাপন জারি করান।

তৎকালীন রেজিস্ট্রার অধ্যাপক হাফিজুর রহমান এ প্রজ্ঞাপন জারি করেন। উপাচার্য হিসেবে তিন বছর দায়িত্ব পালনের সময় অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন দুই হাজারের বেশি জনবল নিয়োগ করেছেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ঘুষগ্রহণসহ অনেক অভিযোগে অধ্যাপক শারফুদ্দিনের নাম পত্রিকায় এসেছে অনেকবার। এমনকি জাতীয় সংসদেও একাধিক সদস্য তার অনিয়মের সমালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। অভিযোগের ঝুলি মাথায় নিয়েই তিনি গত ২৮ মার্চ উপাচার্য হিসেবে বিদায় নেন।

জানা গেছে, তার সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ ফেব্রুয়ারি ২০২২ তারিখের (স্মারক নং-বিএসএমএমইউ/২০২২/১০৩৮) নিয়োগপত্রের আলোকে এমএলএসএস পদের ৩৫৯ জন কর্মচারী গত ১৪ মার্চ নিয়োগ ও পদোন্নয়ন বোর্ডের সুপারিশ ও কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে স্থায়ী হয়।

অভিযোগের বিষয়ে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ কর্মচারীরা শুধু আমার আমলে নয়, আগের উপাচার্যদের আমলেও নিয়োগ পেয়েছিল। তাদের চাকরি স্থায়ীকরণে বিন্দুমাত্র অনিয়ম হয়নি। তাদের চাকরি স্থায়ী হওয়ার সময়সীমা পূর্ণ হয়েছিল। সব নিয়ম মেনেই হয়েছে। নতুন আরেকজন উপাচার্যের প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ায় আমি চিন্তা করলাম, নতুন প্রশাসনে এ কর্মচারীরা বঞ্চিত হতে পারে তাই আমি বোর্ডের সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের চাকরি স্থায়ী করি। আমার এ কাজে তাদের ও তাদের পরিবারের দোয়া ছাড়া আর কোনো সুবিধা নিইনি।’

বিএসএমএমইউর ভিসি হিসেবে অধ্যাপক ডা. দীন মো. নূরুল হকের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হয় গত ১১ মার্চ। ওইদিন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিদায়ী ভিসির সব ধরনের নিয়োগ, পদোন্নতি, চাকরি স্থায়ীকরণ বন্ধের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল, সভা-সমাবেশ করতে থাকেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপাচার্য অধ্যাপক শারফুদ্দিনের পিএস-১ ডা. মোহাম্মদ রাসেলসহ বেশ কয়েকজনকে মারধর করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ায় পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা করে পুলিশ প্রশাসন। এ সুযোগে কর্মচারীদের নিয়োগ স্থায়ীকরণের প্রজ্ঞাপন তৈরি করেন উপাচার্য ও তার ঘনিষ্ঠজনরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, কারও চাকরি স্থায়ী করতে হলে প্রার্থীকে ভাইভা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়। এরপর স্থায়ীকরণ কমিটির মতামতের ভিত্তিতে প্রার্থীর চাকরি স্থায়ী হয়। কিন্তু উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন এসব নিয়মের তোয়াক্কা করেননি। প্রজ্ঞাপনে নিয়োগ ও পদোন্নয়ন বোর্ড সংক্রান্ত যে কমিটির সুপাারিশের কথা বলে ১ হাজার ১ জন কর্মচারীর চাকরি স্থায়ী করা হয়েছে, বাস্তবে ওইদিন এ ধরনের কোনো সভাই হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সূত্র দেশ রূপান্তরকে এটা নিশ্চিত করেছে। শুধু আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে উপাচার্য ও তার ঘনিষ্ঠজনরা চাকরি স্থায়ীকরণের এ কাজ করেছেন।

এ বিষয়ে তৎকালীন রেজিস্ট্রার অধ্যাপক হাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাবেক উপাচার্যের শেষ সময় ছিল, তাই একসঙ্গে তাদের সবার ভাইভা পরীক্ষা নেওয়ার সুযোগ ছিল না। যেহেতু তারা দীর্ঘদিন ধরে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করছিলেন, তাই নিয়োগ বোর্ডের সুপারিশে পরীক্ষা না নিয়েই তাদের চাকরি স্থায়ী করা হয়। এখানে কোনো অনিয়ম হয়নি কারণ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি স্থায়ীকরণে ভাইভা পরীক্ষা নেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। স্থায়ীকরণ যাতে না হয় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় স্বাভাবিকভাবে চলতে না পারে, সেজন্য একাধিক গোষ্ঠী সক্রিয় ছিল, তারাই অপপ্রচার চালাচ্ছে।’

ধাপে ধাপে চাকরি স্থায়ী না করে এক দিনে কেন তাদের চাকরি স্থায়ী করতে হলো এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এ কর্মচারীরা একেবারেই গরিব ও অসহায় ছিল, পরে তাদের চাকরি স্থায়ী হতে যাতে কোনো সমস্যা না হয়, সেজন্যই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একজন উপাচার্য দায়িত্ব পালন করার সময় আরেকজন উপাচার্যের প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ায় এ সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।’

যে ১ হাজার ১ জনের চাকরি স্থায়ী হয়েছে তাদের মধ্যে অফিস সহায়ক পদে (এমএলএসএস) ৩৫৯, ক্লিনার ২৪, ওয়ার্ড বয় ১২৭, অফিস সহকারী ৪৩, ওটি বয় ২৫, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ২৭, আয়া ৩৫, লিফটম্যান ৪৪, ল্যাব অ্যাটেনডেন্ট ২৩, কম্পিউটার অপারেটর ৬, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর ১২ ও সহকারী কম্পিউটার অপারেটর ১৩ জন। এ ছাড়া আরও ১১০ জনের চাকরি স্থায়ী হয়।

একইভাবে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে রেসপিরেটরি থেরাপিস্ট ৫, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ৫, কম্পিউটার অপারেটর ৯, হিসাবরক্ষক ৬, সহকারী কম্পিউটার অপারেটর ৯, টেকনিশিয়ান ৩, ফ্লোর সুপারভাইজার ৭, পেশেন্ট সার্ভিস ম্যানেজার ৫, রিসিপশনিস্ট ৭, ওটি টেকনেশিয়ান ১০, গ্রাউন্ড ফ্লোর ম্যানেজার ৩, লিফট সুপারভাইজার ৪, লিফটম্যান ৯, ওটি বয় ১৩, ওটি ক্লিনার ৪, আইসিইউ বয় ২১ ও ক্লিনার ৩ জন। সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে ৩০ জন কর্মকর্তারও চাকরি স্থায়ী করা হয়।