মৃতপ্রায় ঢাকায় ডায়াস্টোপিক জীবন 

“দিনে মশা, রাতে মাছি 
এই নিয়ে ঢাকায় আছি” 

নব্বই দশকের একদম গোড়ার দিকের এক জনপ্রিয় নাটকের সংলাপ। টিভিতে নাটকটার কথা মনে না থাকলেও বাবার মুখে এই সংলাপটা বারবারই শুনতাম। মধ্যবিত্তের জন্য ঢাকা তখনো এক স্বপ্নের শহর। গ্রাম থেকে এই শহরে এসে নিজের ভাগ্য পরিবর্তন হবে। সামাজিক ও আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে। 

কিন্তু, দেশের রাজধানী শহর সেই অর্থে নাগরিক সুবিধার শহরে পরিণত হয়নি। যদিও, এখনকার তুলনায় তখনকার স্মৃতি মনে পড়লে কেউ কেউ নস্টালজিয়ায় ভুগবেন। শহরে অন্তত নিশ্বাস নেবার জায়গা ছিল, সকল শ্রেণীর মানুষের বেড়াতে যাবার, অক্লান্ত পরিশ্রমের পর একটু শ্রান্তির সুযোগ ছিল। স্বপ্ন ছিল, সামনে এই শহর সত্যিকারের এক নাগরিক বান্ধব নগর হয়ে উঠবে। 

হায়! মুরুব্বীরা বলে, যায় দিন ভালো আসে দিন খারাপ। ঢাকার বেলায় তা নির্মম সত্যে পরিণত হলো। যেই শহরের একেকটা জায়গার নাম রাখা হয়েছিলো গুল-ই-স্তান, বনানী, গ্র্যান্ড এরিয়া (গেন্ডারিয়া) কিংবা আরামবাগ, সেই শহর পচা দুর্গন্ধময়, কংক্রিটের জংগল, তীব্র উত্তাপ আর অসুখবিসুখের নরকে পরিণত হলো। প্রায়দিনেই সংবাদমাধ্যমে দেখা যায়, বায়ু দূষণের দিক দিয়ে বিশ্বের সমস্ত শহরের শীর্ষে অবস্থান করছে বিপুল জনসংখ্যা আর কাঠামোর চাপে হাঁসফাঁস করা শহরটা।
 
ঢাকা কি আর কোনভাবেই বসবাসের যোগ্য? গতকাল রাতে এক পশলা বৃষ্টির পর আবার প্রশ্নটা মাথায় এলো। গত কিছুদিন ঢাকা শহরের তাপমাত্রা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছিলো। শহরে যেহেতু জলাশয় নেই বললেই চলে, গাছের অবস্থাও বিলুপ্তপ্রায়, ফলে প্রবল তাপকে অপসারণের উপায়গুলো সংকুচিত হয়ে গেছে। উলটো পুরো শহরের কনক্রিটের দালানগুলো তাপ ধরে রেখে, একে ছেড়ে দিয়ে অবস্থা আরও অসহনীয় করে তোলে। 

তাপপ্রবাহে নাগরিক জীবন হয়ে পড়েছিলো ওষ্ঠাগত। এর চাপে বিভিন্ন পেশার মানুষের মৃত্যুর সংবাদ আসে সংবাদ মাধ্যমগুলোতে। কায়িক শ্রমের মানুষেরা পড়েন জীবনের ঝুঁকিতে। বিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দিতে হয়। এমতাবস্তায় কয়েক ফোটা বৃষ্টি এই নগরের মানুষের কাছে চাতকের চেয়েও বেশী আকাঙ্ক্ষিত করে তোলে। 
কিন্তু, দিনে মশা রাতে মাছির এই শহরে বৃষ্টি নিয়ে আসে নতুন শঙ্কা। মশাবাহিত রোগ। ডেঙ্গুর প্রবল আক্রমণে গত কয়েক বছরে নাগরিক জীবন হুমকির মুখে। করোনা অতিমারির পর মশাবাহিত এই রোগ হাজির হয়েছে নতুন ঘাতক হিসেবে। ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিও আছে। সবচেয়ে বেশী বিপদে সম্ভবত শিশুরা। 
যদি বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পায়, তবে নানা জায়গায় জলাবদ্ধতা দেখা দেবে। এর ফলে বাড়বে মশা। টেলিভিশনে কয়েকজন ওয়ার্ড কমিশনার অভিযোগ করলেন, দুই বাড়ির মাঝখানে যে অংশ সেসব জায়গা উনাদের এখতিয়ারে না থাকাতে নাকি উনারা পরিষ্কার করতে পারেন না। অথচ, মশা মারতে কামান দাগা বাগধারাটি সত্য প্রমাণ করে গত কয়েক বছরে মশা মারার জন্য যে প্রচণ্ড শব্দ ও ধোয়া উৎপাদন করা মেশিন ব্যাবহার হয়, বছর বছর সিটি কর্পোরেশনের বাজেটে এই খাতে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হয় তাঁতেও তো কাজের কাজ হচ্ছে না। কেউ কেউ বলেন দুর্নীতির কাড়নে এইসব বরাদ্দের সদ্ব্যবহার হয় না। আবার কারো কারো মতে পরিকল্পনাতেই সমস্যা। হরেদরে দুইটা আলাপই সত্য। 
দুর্নীতি এদেশে ওপেন সিক্রেট আর পরিকল্পনার ব্যাপারে একটা ছোট উদাহরণ দেয়া যাক। গত সপ্তাহে গরম কমানোর জন্য ঘটা করে জলকামান (আবারো কামান!) দিয়ে রাস্তায় পানি ছিটানো হলো। অথচ বিশেষজ্ঞরা বললেন, অল্প এলাকা জুড়ে এই পানি ছিটানো ভালোর চেয়ে মন্দই বেশি করলো। আর্দ্রতা বাড়িয়ে দিয়ে গরম আরও অসহনীয় করে তুলল। ঠিক যেমনটা হয়েছে বৃক্ষশূন্য ঢাকার বেলায়। একসময় সাত মসজিদ রোড দিয়ে গেলে একটা প্রশান্তি আসতো,কতো কতো রকমের গাছ। এয়ারপোর্ট রোডও তাই ছিলো। অথচ এসব গাছ কেটে নাই করে ফেলা হলো, কিছু জায়গায় তো যুক্তি হিসাবে বলা হলো ‘সৌন্দর্যবর্ধন।“ কি আশ্চর্য ব্যাপার! যেইসব বৃক্ষ আমাদের জীবনের জন্য অপরিহার্য ছিলো তাঁদের কেটেকুটে বনসাইমার্কা গাছ দিয়ে সৌন্দর্য! বলাই বাহুল্য, এই অবিশ্বাস্য কাজগুলোর পেছনে আছে দুর্নীতি আর অদ্ভুত সব পরিকল্পনা। 

গাছ কাটার পাশাপাশি চললো জলাশয়গুলো ভর্তি করা। যেনতেন ভাবে ক্ষমতা দেখিয়ে দখল তো আছেই, এমনকি সরকারী পরিকল্পনার ফলে মরে গেলো কতো খাল। দানবীয় উন্নয়নে সোনার ডিম পাড়া হাঁসের মতো শহরটার জীবনই নিয়ে নিলো অতি লোভে। যেই খাল আর জলাশয়গুলো জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য, তাপমাত্রা সহনীয় অবস্থায় রাখার জন্য অপরিহার্য ছিলো সেগুলো হত্যা করা হলো। 
হত্যা শব্দটা হয়তো মানুষের বেলাতেই খাটে। জলাশয় বা পরিবেশের মতো বিষয়ে ধ্বংস বলাই সমীচীন। কিন্তু, এইসব কি আমাদের জীবনের বাইরের কিছু? প্রাণপ্রকৃতিকে ‘অপর’ ভাবার চিন্তা থেকেই কি সব ধ্বংসের  শুরু না? 

আমরা ভাবি, আমরাই সেরা। আমাদের জন্য উঁচু দালান, আরামদায়ক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র এগুলোর ব্যবস্থা করলেই হবে। মরুভূমির বুকে ঝড় আসলে পরে বালিতে মুখ গুজে উট যেভাবে রক্ষা পেতে চায় সেইরকম একটা ভাবনা। অথচ ক্রমশ বোঝা যাচ্ছে, পরিবেশকে হত্যা করে টিকে থাকার উপায় নেই। 

জার্মানিতে কিছু বিজ্ঞানী বেশ কয়েকবছর সে দেশে পোকামাকড়ের শুমারি করে আসছেন। উনারা আশংকাজনকভাবে দেখেছেন, সে দেশে পোকামাকড় অনেক কমে গেছে। পরিবেশ দূষণ আর নানারকম কেমিক্যাল আর জলবায়ুর পরিবর্তনে। এর ফলাফল মারাত্মক, এতে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হবে কারণ উপকারী পোকামাকড় কমে যাওয়ায় পরাগায়নে যেমন সমস্যা হবে তেমনি নানারকম ক্ষতিকর পতঙ্গের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাবে। বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য বিনষ্ট হওয়ায় গোটা প্রকৃতি ভেঙ্গে পড়বে। 

ফলে, কেবল প্রচুর গরম লাগলেই গাছ লাগানোর কথা মনে পড়লে সমাধান হবে না। পরিবেশকে অপর না ভাবার চর্চা করতে হবে। গাছ লাগানোর চেয়ে বেশী জরুরী পুরনো গাছের সংরক্ষণ, উল্টোপাল্টা ধরনের গাছ যেগুলো স্থানীয় পরিবেশের সংগে সংগতিপূর্ণ না সেগুলো না লাগানো। সর্বোপরি পরিবেশকে মূল বিবেচনায় রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা করা। 

কোন এক পরিবেশ বিজ্ঞানী বলেছিলেন, পৃথিবী হইলো অনেকটা জাহাজের মতো। কেবলমাত্র বোকারাই এর ডুবে যাওয়ার ভয় না পেয়ে জাহাজে বসে কতো বাণিজ্য করা যায় সেই স্বপ্ন দেখতে পারে। 

মৃতপ্রায় ঢাকার কথা ভাবলে সেই আশংকাই হয়। বৃক্ষ বিহীন, জলাশয় বিহীন, দূষণে ময়লার স্তূপ হয়ে যাওয়া বুড়িগঙ্গা। আমরা ছোটকালে এই শহরে বানর দেখতাম, শকুন দেখতাম, এমনকি মাঝে মাঝে অদ্ভুত সুন্দর টিয়াপাখি আর রংবেরঙ্গের প্রজাপতি। এরা পরিবেশের ভারসাম্য রাখতো, নান্দনিকও রাখতো। কিন্তু, এই মৃতপ্রায় ডায়াস্টোপিয়ায় এখন কেবল উত্তাপে গলে যাওয়ার আশংকায় থাকা মানুষ, রোগজীবানুবাহী মশা আর দানবীয় উন্নয়ন ছাড়া আর কোন কিছু নেই।