ত্রিশ বছরের যুবক ফাহিম মোহাম্মদ। থাকেন পরিবারের সাথে ঢাকার দিলকুশা এলাকায়। ২০১৯ সালে সড়ক পার হতে গিয়ে বেপরোয়া বাসের ধাক্কায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে অবশ হয়ে যায় কোমরের থেকে নিচের অংশে। সড়কে পরে থাকলেও কেউ এগিয়ে আসেনি তাকে উদ্ধারে। পরবর্তীতে একজন রিকশা চালকের সহায়তায় হাসপাতালে নেয়া হলে জানা যায় ভেঙে গেছে দুই পা। দীর্ঘদিন চিকিৎসা নেয়া শেষে উঠে দাঁড়াতে পারলেও সময়ের সাথে সাথে হারাতে থাকেন শ্রবণ ও দৃষ্টি শক্তি। পরিবারের সবার পরামর্শে স্নায়ু রোগ বিশেষজ্ঞ দেখালে জানা যায়, বাসের ধাকায় মস্তিষ্কে আঘাত পেয়ে সময়ের সাথে সাথে দূর্বল হতে থাকে স্নায়ু। মুহূর্তে মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরে ফাহিমের। এনজিওতে চাকরি করা ফাহিম শ্রবণ ও দৃষ্টি শক্তি কমতে থাকায় হারান চাকরি। এরপর নানাভাবে চাকরির চেষ্টা করেও পাননি চাকরি। পারিবারিক ও সামাজিক ভাবে হয়েছে লাঞ্ছনার শিকার।
অবশেষে ফাহিমসহ কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা শিহাব, মেহেদি হাসান, রাকিবুজ্জামান, সোহেল রানার মতো শারীরিক অক্ষম বা প্রতিবন্ধী পাঁচ তরুণকে বিনাশর্তে ভালো বেতনে চাকরি দিয়েছে চট্টগ্রাম ভিত্তিক মোবাইল বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ডেজেল।
শুক্রবার (৩ মে) বিকেলে দুই নম্বর গেট এলাকার ফিনলে স্কয়ারের ডেজেলে গিয়ে কথা হয় জন্ম থেকে দৃষ্টিহীন রাসেল হাওলাদারের সাথে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করা রাসেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিন থেকে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে চাকরির খোঁজ করছিলাম। বিভিন্ন জায়গায় চাকরির জন্য সিভি দিলেও অন্ধত্বের জন্য ডাক আসেনি কোন প্রতিষ্ঠান থেকে। এরই মধ্যে এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে জানতে পারি ডেজেলে ভালো বেতনে প্রতিবন্ধীদের চাকরি দিচ্ছে। তখন আবেদন করলে কর্তৃপক্ষ সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকে। এখানে এসে সাক্ষাৎকার দেয়ার পর তারা আমার থেকে জানতে চায় আমি কি ধরনের কাজ করতে পারবো। আমি জানাই তাদের কল সেন্টার থাকলে সেখানে আমি কাজ করতে পারব। এরপর গত বৃহস্পতিবার তারা আমাকে চাকরি নিশ্চিত করে।
ডেজেলের প্রতিষ্ঠাতা দিদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, মেরিন ইঞ্জিনিয়ার স্বপ্ন নিয়ে পড়াশোনা করছিলাম কিন্তু এর মধ্যে আমার শরীরে ধরা পড়ে হেপাটাইটিস রোগ। এরপর স্বপ্নকে বাদ দিয়ে নিজেকে সুস্থ করতে প্রাণপণ চেষ্টা চালাই। সুস্থ হতে শুরু করলেও কোথাও চাকরি হচ্ছিলো না তখন নিজ তাগিদে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করি। সেখান থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে শুরু করি এই মোবাইল বিক্রির প্রতিষ্ঠান। এখন আমার এই প্রতিষ্ঠানের ঢাকা ও চট্টগ্রাম শাখায় মোট ৬৩ জন কর্মী কাজ করেন। কিছুদিন এগ বাহার নামের এক শারীরিক অক্ষম শিক্ষার্থীর চাকরি নেই শুনতে পেরে আমার মধ্যে খারাপ লাগা কাজ করে। তখন সিদ্ধান্ত নিই আমি আমার প্রতিষ্ঠানের পরবর্তী সব নিয়োগ দিব শারীরিক প্রতিবন্ধীদের। এই সিদ্ধান্ত নেয়ার পর গতকাল প্রাথমিকভাবে ৫ জন শারীরিক প্রতিবন্ধীকে আমার প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ে বিনা শর্তে কাজের সুযোগ দিলাম।
তিনি আরও বলেন, তাদের নিয়োগের মাধ্যমে আমার ক্ষতি না হলেও তাদের পরিবারের উন্নতি হবে আশা করি। আগামীতে আরো দশজনকে ডেজেলের বিভিন্ন শাখায় কাজের সুযোগ দিতে চাই যোগ করেন দিদার।
প্রতিষ্ঠানের পরিচালক সানজিদুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রাথমিকভাবে এই পাঁচ জনের নিয়োগে বেসিক ধরা হয়েছে বারো হাজার টাকা এবং বোনাস সহ অন্যান্য ভাতা মিলিয়ে অন্তত পঁচিশ হাজার টাকা মাসপ্রতি পাবেন তারা। এছাড়া থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থাও আমরাই করে দিবো আমাদের পক্ষ থেকে।
এই পাঁচ জন কি ধরনের কাজ করবেন জানতে চাইলে সানজিদুল বলেন, তাদের সকলকে আমরা আমাদের কাস্টোমার কেয়ার, প্যাকেজিং, অর্ডার নেয়ার মতো কাজ গুলোতে নিয়োগ করবো। তাদের মধ্যে কেউ চাইলে শো রুমের সেলসে কাজ করতে পারবেন।
বেকারত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করা শিহাব বিশ্বাস। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ থেকে পড়াশোনা শেষ করেও চাকরি হচ্ছিলো না। বেকার থেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছিলাম। সে সময় আমাদের পাশে এসে দাঁড়ান আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই (শারীরিক অক্ষম) বাহার উদ্দিন রায়হান। উনি আমাকে ডেজেলের কাছে নিয়ে চাকরির ব্যবস্থা করে দেন। এখন থেকে আমি আমার পরিবার ও সমাজে আর্থিক ভাবে ভূমিকা রাখতে পারবো।
এই পাঁচ তরুণের সাথে ডেজেলের সম্বনয়কারী বাহার উদ্দিন রায়হান বলেন, দীর্ঘদিন থেকে আমি প্রতিবন্ধীদের চাকরির বিষয়ে কাজ করছিলাম। সরকারি প্রতিষ্ঠানে কিছু কোটা থাকলেও বেসরকারিতে আমাদের জন্য কোনো স্থান নেই। কিছু প্রতিষ্ঠান লোক দেখানো নিয়োগ দিলেও কিছুদিন পর সেখান থেকে ছাঁটাই করে। তাই আমি এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করি এবং প্রতিবন্ধী মেধাবি তরুণদের চাকরি নিশ্চিতে কাজ করতে থাকি। এরই ফল হিসেবে আমার ডাকে সাড়া দেয় ডেজেল নামের এই মোবাইল বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান।