বিশ্ব জুড়ে তীব্র বিরোধিতা উপেক্ষা করেই গাজার রাফা অঞ্চলে হামলার পুরো প্রস্তুতি নিয়েছে ইসরায়েল। ইতিমধ্যে সেখানে হামলা চালিয়ে চার শিশুসহ সাত ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। এ ছাড়া গত বৃহস্পতিবার থেকে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত আর ২৮ জনকে হত্যা করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা বলছে, রাফায় আশ্রয় নেওয়া কয়েক লাখ মানুষের জীবনের বিভীষিকা নেমে আসতে চলেছে ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে।
গত বছর ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েলের লাগাতার হামলায় গাজার অন্তত ৩৪ হাজার ৬২২ জন নিহত হয়েছে বলে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে জানিয়েছে আলজাজিরা। সংবাদমাধ্যমটি বলছে, এই সময় ইসরায়েলি বর্বর আক্রমণে আরও ৭৭ হাজার ৮৬৭ জন আহত হয়েছে। হতাহতদের মধ্যে অর্ধেকের বেশিই নারী ও শিশু।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ২৮ ফিলিস্তিনি নিহত ও আরও ৫১ জন আহত হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অনেক মানুষ এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে এবং রাস্তায় আটকা পড়ে আছে এবং উদ্ধারকারীরা তাদের কাছে পৌঁছাতে পারছে না।
গত বছর ৭ অক্টোবর হামাসের নজিরবিহীন আন্তঃসীমান্ত হামলার পর থেকে ইসরায়েল গাজা উপত্যকায় অবিরাম বিমান ও স্থল হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েলি এ হামলায় হাসপাতাল, স্কুল, শরণার্থীশিবির, মসজিদ, গির্জাসহ হাজার হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে। এ ছাড়া ইসরায়েলি আগ্রাসনের কারণে প্রায় ২০ লাখেরও বেশি বাসিন্দা তাদের বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। জাতিসংঘের মতে, ইসরায়েলের বর্বর আক্রমণের কারণে গাজার প্রায় ৮৫ শতাংশ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। আর খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি এবং ওষুধের তীব্র সংকটের মধ্যে গাজার সবাই এখন খাদ্য নিরাপত্তাহীন অবস্থার মধ্যে রয়েছে। এ ছাড়া অবরুদ্ধ এই ভূখণ্ডের ৬০ শতাংশ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে। হাজার হাজার মানুষ কোনো ধরনের আশ্রয় ছাড়াই বসবাস করছে এবং প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম ত্রাণবাহী ট্রাক এ অঞ্চলে প্রবেশ করছে। ইসরায়েল ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে। চলতি বছর জানুয়ারিতে এক অন্তর্বর্তী রায়ে এ আদালত তেল আবিবকে গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে এবং গাজার বেসামরিক নাগরিকদের মানবিক সহায়তা প্রদানের নিশ্চয়তা দেওয়ার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়।
তবে কোনো কথাই শুনছে না ইসরায়েল। অবশ্য এজন্য দেশটির ওপর চাপ বাড়তে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়া। এবার দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক ছিন্ন করল তুরস্ক। বিবিসি বলছে, গাজায় অব্যাহত হামলায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের কথা জানিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য সম্পর্ক স্থগিত করেছে তুরস্ক। ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে ‘নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত’ ত্রাণ সরবরাহের সুযোগ না দেওয়া পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত বহাল রাখার কথা জানিয়েছে দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
বিবিসি জানিয়েছে, গত বছর দুই দেশের মধ্যে ৭০০ কোটি ডলারের বাণিজ্য হয়েছে। বিপুল এ বাণিজ্য সম্পর্ক ছিন্ন করায় ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েল কার্টজ বলেছেন, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ‘স্বৈরশাসকের’ মতো আচরণ করছেন। এক্সে এক পোস্টে কার্টজ বলেন, এরদোয়ান তুর্কি জনগণ ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থকে অসম্মান করছেন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তিকেও তিনি উপেক্ষা করছেন। তিনি জানান, তুরস্কের সঙ্গে বাণিজ্যের বিকল্প খুঁজতে ইতিমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন। ধাক্কা সামলাতে স্থানীয় উৎপাদন এবং অন্য দেশ থেকে আমদানির জোর দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
তুরস্ক এক বিবৃতিতে বলেছে, বাণিজ্য স্থগিতের ঘোষণার আওতায় সব পণ্যই পড়বে। গাজায় ‘নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত’ ত্রাণ সরবরাহের সুযোগ না দেওয়া পর্যন্ত তুরস্ক কঠোর ও সন্দেহাতীতভাবে নতুন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করবে।
প্রথম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে তুরস্ক ১৯৪৯ সালে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু সাম্প্রতিক দশকগুলোতে দেশটির সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক খারাপ হয়েছে। গত বছর ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধের কারণে ইসরায়েলের সমালোচনায় আরও কঠোর হয়েছেন এরদোয়ান। গত জানুয়ারিতে তিনি বলেন, হামাসের হামলার জবাবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যে সামরিক অভিযান শুরু করেছিলেন, তা ‘হিটলারের চেয়ে কম নয়’।