৪৪তম বিসিএস ভাইভার শেষ সময়ের প্রস্তুতি

বিসিএস পরীক্ষায় প্রিলিমিনারি, লিখিত এবং ভাইভা এই তিনটি ধাপ করার পর আপনি আপনার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছে যাবেন। বিসিএস পরীক্ষায় তিনটি ধাপই গুরুত্বপূর্ণ, তবে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর স্বপ্নপূরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ভাইভা। আর এই ভাইভা বোর্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে আপনাদের প্রস্তুতির সুবিধার্থে আজ থাকছে আসন্ন ৪৪তম বিসিএস ভাইভা প্রস্তুতির পরামর্শ। গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন মো. মাসুম কামাল, বিসিএস শিক্ষা (৪১তম বিসিএস)

বিসিএস ভাইভাতে যেসব বিষয় দেখা হয়

প্রথমত, আপনি কতটুকু জানেন কিংবা আপনার জ্ঞানের গভীরতা কতটুকু এসবের ওপর ভিত্তি করে নম্বর দেওয়া হয় না। নম্বর দেওয়া হয় আপনার কথা বলার ধরন, ব্যক্তিত্ব, আপনার আত্মবিশ্বাস এবং বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে আপনি কতটুকু দক্ষ, আপনার বিবেক-বুদ্ধি এবং আপনি কতটুকু বিনয়ী তার ওপর।

দ্বিতীয়ত, প্রথম শ্রেণির একজন কর্মকর্তা হিসেবে আপনাকে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে কাজ করতে হবে। এ বিষয়ে আপনি যোগ্য কিনা সেটাই যাচাই করা হয় বিভিন্ন প্রশ্ন-উত্তরের মাধ্যমে।

তৃতীয়ত, আপনার পোশাক, রুচিবোধ, সৌজন্যবোধ,  মুদ্রাদোষ, আঞ্চলিকতা বিশেষভাবে লক্ষ্য করা হয়।

চতুর্থত, দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু, অর্থনীতি-বাণিজ্য, কূটনীতি, ভূরাজনৈতিক বিষয় সম্পর্কে আপনার ধারণা এবং দেশের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে আপনি উপযুক্ত কিনা সেটাও যাচাই করা হয়।

করণীয় ও বর্জনীয়

প্রথমত, পাবলিক স্পিকিংয়ের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। আপনার কথাবার্তা, আচার-আচরণে অফিসার ভাব নিয়ে আসুন। কথা বলার সময় হাসিমুখে কথা বলা, ধীরে ও স্পষ্টভাবে কথা বলার অভ্যাস করুন। বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষাতে কথা বলার অভ্যাস করুন। ভুলত্রুটিগুলো খেয়াল করুন এবং সংশোধন করুন। এটা ভাইভার সময় বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর স্বতঃস্ফূর্তভাবে দিতে সাহায্য করবে।

দ্বিতীয়ত, ভাইভায় উপস্থিত হওয়ার পোশাক নির্বাচনে সতর্ক হতে হবে। ভাইভা প্রস্তুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ফরমাল ড্রেস। সম্ভব হলে ২ সেট। সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট এ রকমই হতে হবে এর কোনো মানে নেই। যে কোনো মার্জিত রঙের হলেই হবে। তবে তা যেন ম্যাচিং হয় সেটা খেয়াল রাখবেন। তাই ম্যাচিং করে শার্ট, প্যান্ট, জুতা, টাই, স্যুট রেডি রাখুন। গরমের দিনে স্যুট পরতেই হবে এর কোনো মানে নেই। যেহেতু পিএসসিতে এসি থাকে তাই পরলে ভালো, না পরলে কোনো সমস্যা নেই। মেয়েরা শাড়ি পরতে পারেন, অভ্যাস না থাকলে সালোয়ার-কামিজ বা মার্জিত যে কোনো পোশাকই চলবে।

ভাইভা বোর্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে পিএসসির ভাইভার নির্দেশিকা ভালো করে পড়ে নেওয়া জরুরি। প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র ৩/৪ সেট সত্যায়িত করে রাখুন। আগে থেকেই কাগজপত্র হাতের কাছে তৈরি অবস্থায় রাখলে মানসিকভাবে নিশ্চিন্তে থাকবেন।

ভাইভা প্রস্তুতিকে শানিত করতে ভাইভার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়ক ২/১টা গাইড কিনতে পারেন। সে ক্ষেত্রে ফার্স্ট চয়েস, সেকেন্ড চয়েসের জন্য আলাদা করে কিনতে পারেন।

ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে শেয়ার করা ভাইভা অভিজ্ঞতাগুলো দেখবেন। প্রয়োজনে এ সম্পর্কিত প্রশ্ন, পরামর্শগুলো নোট নিতে পারেন। দুটো নোট খাতা করবেন। একটাতে সম্পর্কিত প্রশ্ন, পরামর্শগুলো লিখবেন। আর একটাতে বিষয় ধরে ধরে আলাদা করে উত্তরগুলো সাজিয়ে লিখবেন যাতে  দ্রুত চোখ বুলাতে পারেন।

এ ছাড়া গ্রুপ ডিসকাশন করুন টপিক ধরে ধরে। রুমমেট বন্ধু, ছোট ভাইদের সাহায্য নিন। কাউকে না পেলে একা একা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন-উত্তর করুন। ভুলগুলো নোট করে সেগুলো সংশোধন করুন। ভাইভা পরীক্ষায় ভালো করতে নিয়মিত পত্রিকা পড়ার বিকল্প নেই। পত্রিকার প্রয়োজনীয় ইস্যুগুলো নোট করুন। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ইস্যু, দেশের অর্থনীতি-বাণিজ্য, সরকারের বিভিন্ন অর্জন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখা জরুরি। ভাইভার আগের দিন ও ভাইভার দিনের পত্রিকা অবশ্যই খুব ভালো করে পড়ে যাবেন।

ভাইভা বোর্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে যে বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি

নিজের সম্পর্কে, সাবজেক্ট, বিশ্ববিদ্যালয়, নিজ এলাকা, প্রথম তিনটি চয়েস (জেনারেল যারা দেবেন অল্প করে হলেও তারা সব ক্যাডার) সম্পর্কে ধারণা রাখুন। আপনি সেসব ক্যাডারে কেন যোগ্য তার উত্তর প্রস্তুত রাখুন। এর পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, সরকারের অর্জন, আন্তর্জাতিক ইস্যু সম্পর্কে ভালো করে পড়ুন। ২-১টি গান, কবিতা, বক্তৃতা, ক্যাডার রিলেটেড সিচুয়েশন কন্ট্রোল সম্পর্কে প্রস্তুতি রাখুন।

যে কোনো প্রশ্নের উত্তর বাংলা ও ইংরেজিতে প্রস্তুত রাখুন। উত্তর যেন ধীরস্থির ও সাবলীল হয় তার জন্য প্রয়োজনীয় অনুশীলন করুন। আঞ্চলিকতা, মুদ্রা দোষ যথাসম্ভব পরিহার করুন।

বঙ্গবন্ধুর লেখা, প্রধানমন্ত্রীর লেখা, ক্যাডার রিলেটেড ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কিছু বই পড়ুন। সময় না পেলে বুক রিভিউ দেখুন এবং সারমর্ম নোট করে রাখুন।

পড়া শুরু করুন, পড়াই আপনাকে বলে দেবে কী কী পড়তে হবে, কীভাবে পড়তে হবে। প্রয়োজনে অগ্রজদের পরামর্শ নিন।

মোটামুটি প্রস্তুতি হলে কোনো কোচিং গিয়ে ২-১টি মক ভাইভা দিতে পারেন। কোচিংয়ে দিতে পারলে ভালো, না পারলে বাসায় বন্ধু, রুমমেটদের সামনে মক ভাইভা দিন।

ভাইভা বোর্ডে কী প্রশ্ন করা হবে তা বোর্ডের স্যাররাও জানেন না। তাই মানসিক চাপমুক্ত থাকুন। চাপ নিলেই ভাইভা খারাপ হবে। তাই চাপ নেবেন না। আপনার ভাইভা হবে ইউনিক, কারোর সঙ্গেই মিলবে না। তাই আপনি আপনার মতো করে প্রস্তুতি নিতে থাকুন।

সর্বশেষ যে বিষয়টি খেয়াল রাখবেন, ভাইভা বোর্ডে ঢোকার সময় দরজা ধীরস্থিরভাবে খুলে সালাম দিয়ে অনুমতি নিয়ে স্বাভাবিকভাবে বসবেন। উত্তর দেওয়ার সময় যিনি প্রশ্ন করেছেন তার দিকে তাকিয়ে বিনীতভাবে উত্তর দেবেন। স্পষ্ট ও স্বাভাবিকভাবে উত্তর দেবেন। না পারলে দুঃখিত বলবেন, আন্দাজে উত্তর দেবেন না। ভাইভার সময় স্বাভাবিক ও শান্ত থাকবেন। বের হওয়ার সময় ধন্যবাদ ও সালাম দিয়ে কাগজপত্র নিয়ে ধীরস্থিরভাবে বের হয়ে আসবেন। সবার জন্য শুভ কামনা।

অনুলিখন : জেলি খাতুন