বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় দেশের ট্যানারি বা চামড়াশিল্প খাতের শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি ২২ হাজার ৭৭৬ টাকা করার প্রস্তাব করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, বর্তমানে এ খাতের শ্রমিকদের খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত খরচ অনেক বেড়েছে। একই সঙ্গে মজুরি দেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রেডিং সিস্টেম যথাযথ করার প্রস্তাব দিয়েছে তারা।
গতকাল শনিবার রাজধানীর ধানম-িতে সিপিডি কার্যালয়ে ‘ট্যানারি শিল্পে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ’ বিষয়ে আয়োজিত মিডিয়া ব্রিফিং ও আলোচনা অনুষ্ঠানে ট্যানারি শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম এ মজুরি প্রস্তাব করে প্রতিষ্ঠানটি। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী মোল্লা।
প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি শাহীন আহমেদ, ভাইস চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান, ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ ও সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুল মালেক। সূচনা বক্তব্য দেন অশি ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান এস এম মোরশেদ।
২০১৮ সালে রপ্তানিমুখী ট্যানারি শিল্পের শ্রমিকদের জন্য ১৫ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু ট্যানারি মালিকরা তা বাস্তবায়ন করেনি বলে জানান সিপিডির সিনিয়র গবেষক তামিম আহমেদ।
সিপিডি জানায়, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে ট্যানারি বা চামড়াশিল্প খাতের একটি শ্রমিক পরিবারের প্রয়োজনীয় খাবারের খরচ মাসে ২০ হাজার ৫৬৪ টাকা। আর খাদ্যবহির্ভূত খরচ ১২ হাজার ৯১৪ টাকা। সব মিলিয়ে একজন শ্রমিক পরিবারের মাসে ৩৩ হাজার ৪৪৫ টাকা প্রয়োজন। একটি শ্রমিক পরিবারের গড় সদস্যসংখ্যা ৪ দশমিক ৬ জন। এর মধ্যে উপার্জনক্ষম সদস্য ১ দশমিক ৫ জন। সেই হিসাবে একজন শ্রমিকের মাসিক ন্যূনতম মজুরি হওয়া দরকার ২২ হাজার ৭৭৬ টাকা। একই সঙ্গে আমাদের প্রস্তাব থাকবে গ্রেডিং সিস্টেম ঠিক করে একটি গ্রেডে আনা। এই খাতে গ্রেড উন্নয়নের সুযোগ কম, কারণ একেকটি গ্রেডের কাজ একেক রকম। যেহেতু পদোন্নতির সুযোগ নেই, তাই গ্রেডের মধ্যে কয়েকটি ভাগ করে (যেমন : গ্রেড-৫-এর এবিওসি) সাবগ্রেড করার প্রস্তাব রয়েছে। ফলে পদোন্নতির সুযোগ থাকবে ও শ্রমিকদের কাজে উৎসাহ বাড়বে।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, চামড়া খাতের পরিবেশ নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও এ খাতের মজুরি নিয়ে আলোচনা কম হয়। সুতরাং মজুরি বৃদ্ধি পেলে এ শিল্প খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
সিপিডির প্রস্তাবের বিষয়ে ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুল মালেক জানান, সিপিডির প্রস্তাবটি তাদের আকাক্সক্ষার সঙ্গে মেলেনি, তবে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদনে এ খাতের সার্বিক অবস্থা উঠে এসেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ২৫ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি বিষয়ে একটি প্রস্তাবনা তৈরি করেছি। প্রস্তাবটি ইতিমধ্যে মালিকপক্ষ ও মজুরি বোর্ডের কাছে দেওয়া হয়েছে।’
তবে মালিকপক্ষ সিপিডির ন্যূনতম মজুরি প্রস্তাবে দ্বিমত জানিয়েছে। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, ‘বর্তমান বাস্তবতায় সিপিডির এমন প্রস্তাবনা কোনোভাবেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এর কারণ, আগের তুলনায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে এবং রপ্তানিতে চামড়ার ইউনিট মূল্য কমেছে।’ সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তারা গ্রহণযোগ্য একটি মজুরি কাঠামো নির্ধারণের চেষ্টা করবেন বলে জানান তিনি।
ট্যানারি শিল্পের মজুরির বিষয়ে ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী মোল্লা বলেন, ‘মালিকপক্ষ বলেছে এত পরিমাণে (সিপিডির প্রস্তাব অনুযায়ী) মজুরি দেওয়া সম্ভব নয়। তবে মজুরি বোর্ডে আলোচনা করে দেখা হবে মজুরি কতটা বাড়ানো সম্ভব, যাতে শিল্প টিকে এবং শ্রমিকরাও বেঁচে থাকে, সেটি বিবেচনায় রেখে বাস্তবায়নযোগ্য একটি বেতনকাঠামো দেওয়ার চেষ্টা করব আমরা।’
সিডিপির গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০১১ সালে সর্বপ্রথম ট্যানারি শিল্পের জন্য ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা হয়েছিল, যার পরিমাণ ৮ হাজার ৭৫০ টাকা। ২০১৮ সালে সেটা বাড়িয়ে শহর অঞ্চলের জন্য ১৩ হাজার ৫০০ টাকা ও গ্রাম অঞ্চলের জন্য ১২ হাজার ৮৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ২০১৮ সালে যে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেটা কতগুলো প্রতিষ্ঠানে বাস্তবায়ন করা হয়েছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ।
সিপিডির গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালে এসেও দেখা গেছে, ৬০ শতাংশ কারখানা ওই বেতন দিচ্ছে না। প্রতিবছর ৫ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি পাওয়ার কথা থাকলেও সেটা বিবেচনায় বাস্তবায়ন হার অনেক কম পাওয়া গেছে।
সিপিডি অ্যাংকর মেথডে ৩৫টি ট্যানারির ওপর গবেষণা পরিচালনা করা হয়েছে। সংস্থাটির গবেষক তামিম আহমেদ বলছেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ট্যানারি শিল্পের জন্য আলাদা ন্যূনতম মজুরি নেই। ওইসব দেশে সব শিল্পের একই হারে ন্যূনতম মজুরি রয়েছে। তবে ভারতে রাজ্য ভিত্তিতে ন্যূনতম মজুরি রয়েছে। ভারতের কেরালায় ১৪৬, তামিলনাড়ুতে ১৩৮, উত্তর প্রদেশে ১২৩ ও পশ্চিমবঙ্গে ১১৭ মার্কিন ডলার ন্যূনতম মজুরি রয়েছে। অন্যদিকে ভিয়েতনামে ১৭১, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডে ১৮৬ ও ২৫৫ মার্কিন ডলার। সেখানে বাংলাদেশে ট্যানারি শিল্পে ন্যূনতম মজুরি ১২৩ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশের খাদ্যপণ্যের মূল্য হিসেবে অনেক বলে মনে করছি।