অ্যাস্ট্রাজেনেকার ক্ষতি খতিয়ে দেখবে সরকার

বাংলাদেশে করোনার অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকা গ্রহীতাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার খবর পাওয়া যায়নি। তবে বিশ্বব্যাপী এই টিকার বিরুদ্ধে রক্ত জমাট বাঁধা ও প্লাটিলেট কমে যাওয়ার অভিযোগ ওঠায় দেশে এই টিকা গ্রহীতাদের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার তথ্য জানতে জরিপ করবে সরকার। পাশাপাশি দেশে আর অ্যাস্ট্রোজেনেকার টিকা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী এখন থেকে সব ধরনের মানুষকে করোনা টিকার অতিরিক্ত ডোজ দেওয়ার ব্যাপারেও বিশেষ সতর্কতা মানা হবে। অর্থাৎ সুস্থ-সবল ও পূর্ণবয়স্ক মানুষকে আর টিকা দেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহ দেখাবে না সরকার।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং জাতীয় টিকা সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির (নাইট্যাগ) বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। এর আগে গতকাল বুধবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া জানতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেন। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে যারা এই টিকা নিয়েছেন, তারা কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ভুগছেন কি না তা খোঁজ নিতে বলেছি। আমাদের দেশে এ রকম কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার রিপোর্ট আমরা এখন পর্যন্ত পাইনি।

বিশ্বে অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকায় শরীরে রক্ত জমাট বাঁধা এবং রক্তে প্লাটিলেটের মাত্রা কমে যাওয়ার মতো বেশ কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার অভিযোগ উঠেছে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মৃত্যু ও শারীরিক জটিলতার অভিযোগে যুক্তরাজ্যে ১০০ মিলিয়ন পাউন্ড ক্ষতিপূরণের দাবিতে অ্যাস্ট্রাজেনেকার বিরুদ্ধে মামলা চলছে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকার বিষয়টি স্বীকারও করে কর্র্তৃপক্ষ। এমন প্রেক্ষাপটে গত মঙ্গলবার বিশ্ববাজার থেকে সব করোনার টিকা সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ব্রিটিশ-সুইডিশ কোম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনেকা। কারণ হিসেবে কোম্পানিটি বলছে, যেহেতু বিভিন্ন ধরনের কভিড-১৯ ভ্যাকসিন তৈরি হয়েছে, হালনাগাদ ভ্যাকসিনগুলো বাজারে উদ্বৃত্তও আছে। ফলে এগুলো আর তৈরি কিংবা সরবরাহও করা হচ্ছে না।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া জরিপ করবে অধিদপ্তর : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, অ্যাস্ট্রোজেনেকা আমাদের দেশে প্রথম টিকা। তাই তখন খুবই নিবিড়ভাবে টিকাগ্রহীতাদের পর্যবেক্ষণ করেছি। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কি না, সেটা দেখেছি। সেই সময় কোনো অভিযোগ আসেনি। এখন যেহেতু কথা উঠেছে, তাই আমরা আবার সার্ভে করছি। অ্যাস্ট্রাজেনেকা যারা নিয়েছিলেন, তারা কে কেমন আছেন, যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো কারও মধ্যে আছে কি না, সেটার সার্ভে আমরা শুরু করছি। সার্ভে শুরু হতে কয়েকদিন সময় লাগবে। তবে সার্ভের কাজটা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই করব। করার পর বলা যাবে এখন কোনো সমস্যা কারও মধ্যে হয়েছে কি না।

অ্যাস্ট্রাজেনেকা আর না : জাতীয় টিকা সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির (নাইট্যাগ) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. খান মো. আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা ফাইজার টিকার ব্যাপারে কো-ভ্যাক্সকে বলেছি। এখন থেকে এই টিকাই দেওয়া হবে। আমরা যেহেতু অ্যাস্ট্রাজেনেকা সম্পর্কে জেনেছি, তাই নতুন করে আর এই টিকা বাংলাদেশে ঢুকতে দেব না।

এ ব্যাপারে অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, আমরা এখন অ্যাস্ট্রাজেনেকা এমনিতেই দিচ্ছি না। আমাদের কাছে সরবরাহ নেই। এখন আমরা কো-ভ্যাক্সের মাধ্যমে পাওয়া ফাইজার টিকা দিচ্ছি। যেহেতু আমরা অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা দিচ্ছি না, তাই এটা নিয়ে নতুন করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ারও কিছু নেই। তবে ফাইজার নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো ঝুঁকি বা অসুবিধার কথা আমরা পাইনি।

সবাইকে করোনা টিকার অতিরিক্ত ডোজ দেওয়ার ব্যাপারেও বিশেষ সতর্কতা মানা হচ্ছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের পর্যবেক্ষণে বলেছে, যারা স্বাস্থ্যবান ও পূর্ণবয়স্ক তাদের ক্ষেত্রে আর অতিরিক্ত ডোজ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। কভিড হলে যাদের মৃত্যুঝুঁকি বা অসুস্থতার মাত্রা বেশি থাকবে, তাদের একমাত্র অতিরিক্ত ডোজ নিতে বলা হয়েছে। আমরা এ ধরনের মানুষকে এখন ফাইজার টিকা দিচ্ছি। সুতরাং অ্যাস্ট্রাজেনেকা নিয়ে আমাদের খুব বেশি উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।

আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই : অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকার বিরুদ্ধে যে সব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার অভিযোগ উঠেছে, তা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই বলে মনে করেন জাতীয় টিকা সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির (নাইট্যাগ) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. খান মো. আবুল কালাম আজাদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা নজর রাখছি। তবে রোগতাত্ত্বিক বিচারে এই টিকার কারণে রক্তনালিতে রক্ত জমাট বাঁধার কথা বলা হচ্ছে, সেটা খুবই বিরল ঘটনা। এই টিকা আমাদের মানুষকে এত বেশি উপকার করেছে যে, সে হিসেবে এর অপকারী দিক অত্যন্ত নিম্ন। তা ছাড়া যে জরুরি মুহূর্তে এই টিকা দেওয়া হয়েছে, সেখানে অ্যাস্ট্রাজেনেকার কোনো অপরাধ নেই। এটুকু শুধু খেয়াল রাখতে হবে খুব স্বল্পমাত্রায় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে ও আমাদের চিকিৎসকদেরও একটু সতর্ক থাকতে হবে।

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, আমরা যখনই এটা সম্পর্কে জানতে পেরেছি, ইতিমধ্যেই  এটা নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয়েছে ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা বলে দিয়েছি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, এটা খুব বিরল ঘটনা। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। অ্যাস্ট্রাজেনেকা রোগপ্রতিরোধে সাহায্য করেছে, সিরিয়াস রোগ হতে দেয়নি।

অনুরূপভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব বিভাগের সাবেক পরিচালক ও নাইট্যাগের তৎকালীন সদস্য অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন থেকে রক্ত জমাট বাঁধার কারণে যাদের ব্রেইন স্ট্রোক হয়, এই রকম রোগী শনাক্ত হলে তাদের করোনার টিকার ইতিহাস ও প্লাটিলেট কমেছে কি না, সেটা জানতে হবে। তাহলে আমরা অ্যাস্ট্রাজেনেকার ব্যাপারে রক্ত জমাট বাঁধা ও প্লাটিলেট কমে যাওয়ার অভিযোগের তথ্য জানতে পারব।

এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, রক্ত জমাট বাঁধা ও প্লাটিলেট কমে যাওয়ার ঘটনা খুবই বিরল, বিশ্বব্যাপী হয়তো ৫০ হাজারে একজনের ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু তাই বলে হবে না, তা নয়। তবে অনেক বেশি হবে না। তারপরও দেখা উচিত। সুতরাং যারা অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা নিয়েছেন, তারা কেমন আছেন, তাদের কারও কোনো সমস্যা আছে কি না, সেটা দেখা ভালো। এ ছাড়া করোনার পর অনেকের মানসিক ও ভুলে যাওয়ার সমস্যার কথা দেখছি। সেটা করোনা বা টিকার কারণেও হতে পারে। সুতরাং এসব কারণের সঙ্গে টিকার কোনো সংযোগ আছে কি না, সেটা দেখা।

মোট টিকার ১৫% অ্যাস্ট্রাজেনেকা : দেশে গতকাল বুধবার পর্যন্ত মোট সাত ধরনের ৩৬ কোটি ৩৮ লাখ ৭৮ হাজার ৭৬ ডোজ করোনার টিকা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ ডোজ মিলে অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা দেওয়া হয়েছে ৫ কোটি ৬২ লাখ ৮০ হাজার ৭৬৮ ডোজ, যা মোট টিকার ১৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ। এটি বাংলাদেশে দেওয়া চতুর্থ সর্বোচ্চ টিকার সংখ্যা।

দেশে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ দেওয়া হয়েছে সিনোফার্ম টিকা ১১ কোটি ৪১ লাখ ৪৮ হাজার ২৫৮ ডোজ, যা মোট টিকার ৩১ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ টিকা দেওয়া হয়েছে ফাইজার, ৮ কোটি ৬ লাখ ২০ হাজার ১৯০ ডোজ, যা মোট টিকার ২২ শতাংশ ও তৃতীয় সর্বোচ্চ ৬ কোটি ১৩ লাখ ৮ হাজার ২৬ ডোজ দেওয়া হয়েছে সিনোভ্যাক, যা মোট টিকার ১৭ শতাংশ। 

এছাড়া ফাইজার পিএফ (কমিরনিটি) ১০ শতাংশ ও মডার্না দেওয়া হয়েছে মোট টিকার ৪ শতাংশ। সবচেয়ে কম দেওয়া হয়েছে জনসন অ্যান্ড জনসন টিকা, শূন্য দশমিক ১৬ শতাংশ।

যেভাবে দেওয়া হয় অ্যাস্ট্রাজেনেকা : বাংলাদেশে ২০২০ সালের ৮  মার্চ প্রথম করোনা মহামারী দেখা দেয়। প্রথম প্রাদুর্ভাব হয় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে। বিশ্বের প্রথম করোনা টিকা হিসেবে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা প্রথম মানবদেহে প্রয়োগ করা হয় ২০২১ সালের জানুয়ারিতে। সপ্তাহ তিনেকের মাথায় বাংলাদেশেও পরীক্ষামূলকভাবে এর প্রয়োগ শুরু করে সরকার। এর ১০ দিন পরই গণপরিসরে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা দেওয়া হয়। প্রথমে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট ও পরে অন্য উৎস থেকেও অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা পায় বাংলাদেশ।