গাজায় ত্রাণ প্রবেশের জন্য কেরেম শালম ক্রসিং পুনরায় খুলে দেওয়ার কথা জানিয়েছে ইসরায়েল। হামাসের রকেট হামলায় তিন ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার পর চার দিন এ ক্রসিংটি বন্ধ রেখেছিল ইসরায়েল। গতকাল বুধবার ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়, মিসর থেকে খাবার, পানি ও ওষুধ নিয়ে কয়েকটি লরি কেরেম শালম ক্রসিংয়ে এসেছে।
এদিকে ক্রসিং খুলে দিলেও হামলা অব্যাহত রেখে ইসরায়েলি বাহিনী। আগের ২৪ ঘণ্টায় সেখানে বেশ কয়েক জায়গায় হামলা চালিয়ে ৫৯ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে তারা। এ ছাড়া যুদ্ধবিরতি আলোচনা ফের শুরু হলেও ইসরায়েল মধ্যস্থতাকারীদের প্রস্তাব মানতে রাজি নয়। তারা জানিয়েছে, মধ্যস্থতাকারীরা যুদ্ধবিরতি চুক্তির জন্য যে প্রস্তাব দিয়েছে তার চারটি বিষয় নিয়ে আপত্তি আছে তাদের।
গতকাল বিবিসি জানায়, মিসরের সঙ্গে গাজার একমাত্র সীমান্ত পথ রাফাহ ক্রসিংয়ের গাজা অংশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর কেরেম শালম ক্রসিং খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসরায়েল। গত রবিবার হামাস কেরেম শালম ক্রসিংয়ের গাজা অংশে রকেট হামলা চালায়। যাতে চার ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়। ওই হামলার পর নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে ইসরায়েল অনির্দিষ্টকালের জন্য কেরেম শালম ক্রসিং বন্ধ ঘোষণা করে। সোমবার রাফাহ থেকে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয় এবং সেই নির্দেশ দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর সেখানে বিমান হামলা শুরু করে।
ইসরায়েলি বাহিনী কেরেম শালম ক্রসিং বন্ধ করে দিয়ে তারপর রাফাহ শহরে হামলা এবং রাফাহ ক্রসিংয়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেওয়ায় জাতিসংঘ এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব ইসরায়েলের সমালোচনা শুরু করে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেস মঙ্গলবার বলেছিলেন, গাজায় ত্রাণ প্রবেশের দুটি প্রধান ক্রসিং বন্ধ করে দিয়ে ইসরায়েল সেখানে থাকা ফিলিস্তিনিদের শ্বাসরোধ করছে। গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর চলমান কর্মকাণ্ডে তিনি বিরক্ত এবং হতাশ। জাতিসংঘ মহাসচিব বলেছিলেন, গাজায় ইতিমধ্যেই একটি ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এর মধ্যে সেখানে ত্রাণ পাঠাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই সীমান্ত রাফাহ ও কেরেম শালম ক্রসিং বন্ধ করে দিলে তা আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। তিনি অবিলম্বে ক্রসিং দুটি খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন।
চুক্তির জন্য ইসরায়েলকে চাপ দিতে জিম্মি পরিবারের চিঠি : হামাসের হাতে জিম্মি থাকা ব্যক্তিদের দেশে ফেরাতে যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশের কাছে সহায়তা চেয়েছে তাদের পরিবার। এ লক্ষ্যে হামাসের সঙ্গে একটি চুক্তিতে যেতে ইসরায়েল সরকারের ওপর চাপ দেওয়ার জন্য ওই দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা। গত মঙ্গলবার হামাসের হাতে জিম্মি থাকা ব্যক্তিদের পরিবারের সংগঠন ‘হোস্টেজ অ্যান্ড মিসিং ফ্যামিলিস ফোরাম’ বিদেশি সরকারের প্রতি তাদের আহ্বান জানায়।
আলজাজিরা বলছে, ইসরায়েল ছাড়া অন্য যেসব দেশের নাগরিক এখনো হামাসের হাতে জিম্মি, ওই দেশগুলোর দূতাবাসে চিঠি পাঠায় হোস্টেজ অ্যান্ড মিসিং ফ্যামিলিস ফোরাম। তাতে বলা হয়, বর্তমানে সংকটের সময় চলছে। এরই মধ্যে জিম্মিদের মুক্তির বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাই এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে আপনাদের সরকার যেন (হামাসের সঙ্গে) চুক্তির প্রতি সমর্থন জানায়।
চিঠিতে বলা হয়, একটি চুক্তি নিশ্চিত করার জন্য ইসরায়েল সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ওপর আপনাদের প্রভাব খাটানোর এখনই সময়। এমন কোনো চুক্তি হলে আমাদের প্রিয়জনেরা শেষ পর্যন্ত বাড়ি ফিরতে পারবে।
হামাসের হাতে জিম্মিদের মধ্যে ইসরায়েলি ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, থাইল্যান্ড, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও রাশিয়ার নাগরিকেরা রয়েছেন। এর মধ্যে গত নভেম্বরে সাত দিনের যুদ্ধবিরতির সময় বেশ কয়েকজনকে মুক্তি দেওয়া হয়। এরপরও এখনো গাজায় ১২৮ জন জিম্মি। তাদের মধ্যে অন্তত ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে আশঙ্কা ইসরায়েলি বাহিনীর।
যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের চার শর্তে ইসরায়েলের আপত্তি : যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের যেসব শর্তে হামাস রাজি হয়েছে, সেগুলো মেনে নেয়নি ইসরায়েল। এরপরও চুক্তির বিষয়ে আলোচনা করতে মঙ্গলবার একটি প্রতিনিধিদল মিসরের রাজধানীয় কায়রোয় পাঠিয়েছে তারা। তবে দুই পক্ষই রাজি হয় এমন একটি প্রস্তাব মধ্যস্থতাকারীরা এখনো দিতে পারেননি বলে দাবি ইসরায়েলের। কায়রোয় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আলোচনায় উপস্থিত হয়ে ইসরায়েলের প্রতিনিধিরা মধ্যস্থতাকারীদের দেওয়া প্রস্তাবের চারটি বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে। এর মধ্যে প্রথমেই আছে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি করার বিষয়টি।
আলজাজিরা বলছে, ইসরায়েলের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রস্তাবে যুদ্ধ অবসানের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এমন হলে নারী সেনারা অনেক দেরিতে মুক্তি পেতে পারে। ফলে এতে আপত্তি আছে তাদের।
প্রস্তাবে প্রথম ধাপে ৩৩ জিম্মিকে জীবিত কিংবা মৃত যেভাবেই হোক মুক্তি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ইসরায়েল চায় ৩৩ জিম্মিকে জীবিত মুক্তি দিক হামাস।
এ ছাড়া প্রস্তাবে হামাসের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী, ইসরায়েলের জেলে থাকা ফিলিস্তিনিদের মুক্তি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যেখানে কারও মুক্তির ক্ষেত্রে ইসরায়েলের কোনো ভেটো ক্ষমতা থাকবে না। কিন্তু ইসরায়েল বলছে, তারা কোনো বন্দিকে মুক্তি দেবে বা দেবে না, তা নির্ধারণ করতে তাদের ভেটো ক্ষমতা থাকতে হবে।
প্রস্তাবে উত্তর গাজায় ফিরে যাওয়া অধিবাসীদের কোনো নিরাপত্তা তল্লাশি ছাড়া অবাধে চলাফেরা করতে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ইসরায়েল বলছে, হামাস বন্দুকধারীদের প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে নিরাপত্তা তল্লাশির প্রয়োজন রয়েছে।
বিষয়গুলো নিয়ে ইসরায়েলের আপত্তির কারণে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি চুক্তি হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। গত বছরের নভেম্বরে লড়াইয়ে এক সপ্তাহের বিরতির পর থেকে গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনায় এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান বেরিয়ে আসেনি।
গত বছরের ৭ অক্টোবর হামাসের যোদ্ধারা ইসরায়েলে নজিরবিহীন হামলা চালিয়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ জনকে হত্যা করে। ওই দিন থেকেই হামাসকে নির্মূল করার ঘোষণা দিয়ে ইসরায়েল গাজায় পাল্টা হামলা শুরু করে। তারপর থেকে সাত মাস ধরে চলা তাদের নির্মম হামলায় গাজায় ৩৪ হাজার ৮০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।