বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ অংশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি বড় কোম্পানিগুলো আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এবারের দরপত্রে দেশের এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থও দেখা হয়েছে। ইতিমধ্যে সাতটি আন্তর্জাতিক কোম্পানি দরপত্রে অংশ নিতে বিড ডকুমেন্ট এবং প্রমোশনাল প্যাকেজ কিনেছে। সব প্রক্রিয়া শেষে গ্যাস উত্তোলন পর্যন্ত সাত থেকে আট বছর সময় লাগবে।
গতকাল বুধবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড ২০২৪’-এর প্রচারমূলক সেমিনার শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।
উল্লেখ্য, গত মার্চে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিডিং রাউন্ড শেষ হবে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পরবর্তী অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষে নির্বাচিত কোম্পানির সঙ্গে দ্রুত চুক্তি করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের, যাতে আগামী বছরের মধ্যে তারা সাগরে অনুসন্ধান কাজ শুরু করতে পারে। অফশোরের (সাগর) পাশাপাশি অনশোর বা ভূমিতে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম আর জোরদার করতে মডেল পিএসসি হালনাগাদের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী।
বঙ্গোপসাগরকে এ অঞ্চলের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ এলাকা হিসেবে অভিহিত করে হাইড্রোকার্বন তথা তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য দেশের অফশোর এলাকায় বিনিয়োগের জন্য আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোকে (আইওসি) আমন্ত্রণ জানান তিনি।
তৌফিক-ই-ইলাহী বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন স্থানে অস্থিরতা বিরাজ করলেও, দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ হিসেবে রয়ে গেছে। আমাদের সমুদ্রের আশপাশেই গ্যাসের অনেক বড় বাজার আছে। সুতরাং বিনিয়োগকারীদের ব্যবসায় কোনো ঝুঁকি নেই। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের পরিস্থিতির কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। সার্বিক দিক বিবেচনায় আমাদের মনে হচ্ছে অনেকেই দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘শেভরন আমাদের দেশে ৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এটাই প্রমাণ করে আমাদের দেশ কতটা সম্ভাবনাময়।’
প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে সেখানে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর বিপুল উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ সরকারের ওপর তাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। চলতি বছরে আহ্বান করা দরপত্রে দেশের স্বার্থের পাশাপাশি বিনিয়োগকারী কোম্পানির স্বার্থও দেখা হয়েছে। ফলে আমরা এবারের দরপত্র নিয়ে বেশ আশাবাদী, আত্মবিশ্বাসী।’
জ্বালানি সচিব মো. নুরুল আলমের সভাপতিত্বে সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. জিয়াউর রহমান, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জনেন্দ্র নাথ সরকার, শেভরন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট এরিক এম ওয়াকার ও যুক্তরাজ্যভিত্তিক জ্বালানি কোম্পানি টিজিএসের সিনিয়র জিওলজিস্ট এলিজাবেথ গিলবার্ড।
সেমিনারে বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড-২০২৪ সম্পর্কে বিস্তারিত উপস্থাপন করে পেট্রোবাংলার মহাব্যবস্থাপক (এক্সপ্লোরেশন) ফারহানা শাওন।
তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী বলেন, ‘বিনিয়োগ আকর্ষণ করার জন্য আমরা একটি মধ্যমপন্থা অনুসরণ করেছি। মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট-পিএসসি (উৎপাদন ও বণ্টন চুক্তি) হালনাগাদ করার পাশাপাশি নতুন কিছু বিষয় সংযোজন করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোকে আরও সুবিধা দেবে। এর মধ্যে রয়েছে আর-ফ্যাক্টর, যার মাধ্যমে যৌক্তিক উপায়ে সরকার এবং আইওসি উভয়ই লাভবান হবে।’
তিনি উল্লেখ করেন, অফশোর এলাকায় একটি মাল্টিক্লায়েন্ট (বহুমাত্রিক) জরিপ করা হয়েছিল যার মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের ব্লকগুলোতে গ্যাসের সম্ভাবনা সম্পর্কে বিনিয়োগকারীরা বিভিন্ন ধরনের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে পারবেন।
বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে গত ১০ মার্চ আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর দরপত্র জমা দেওয়া শেষ হলে আগ্রহী কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বৈঠক করবে পেট্রোবাংলা। এরপর সেগুলো মূল্যায়ন করে প্রতিষ্ঠান নির্বাচন চূড়ান্ত হলে তাদের সঙ্গে চুক্তি সই করা হবে। তবে এর আগেও দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করবে পেট্রোবাংলা। এবার প্রায় ৫৫টি কোম্পানিকে দরপত্রে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
সেমিনারে অংশ নিয়ে এক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম তামিম সাংবাদিকদের বলেন, ‘অফশোর বিডিং নিয়ে সেমিনারে যে প্রেজেন্টেশন হলো সেটা খুবই ভালো এবং আকর্ষণীয় বিডিং ডকুমেন্ট। আমাদের বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাসের সম্ভাবনা অনেক বেশি মনে হয়েছে। এর অর্ধেকও যদি পূরণ হয় তাহলে অফশোরে গ্যাস পাওয়ার বিপুল সুযোগ রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, এখানে আর্থিক যেসব শর্তগুলো রয়েছে সেগুলোও আকর্ষণীয়, যুগোপযোগী ও বিনিয়োগবান্ধব। তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের এ দরপত্রে আন্তর্জাতিক সব কোম্পানি অংশ নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন ড. তামিম।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, বিডিং রাউন্ডবিষয়ক ওই সেমিনারে পেট্রোনাস, এক্সনমোবিল, শেভরন, ইনপেক্স করপোরেশন, জাপানের জগমেক, সিএনওওসি, ইতালির ইএনআই স্পা, ক্রিস এনার্জি, ওএনজিসি, টিজিএস ও স্ল্যামবার্জারের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।