সহিংসতামুক্ত ভোট করতে সক্ষম হলেও উপজেলা নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি সন্তোষজনক নয় আওয়ামী লীগের কাছেও। ভোটের হার নিয়ে প্রকাশ্যে সন্তোষজনক দাবি করা হলেও দলের অভ্যন্তরে এ নিয়ে দুশ্চিন্তা রয়েছে।
এ ছাড়া দলীয় সংসদ সদস্যরাই (এমপি) উপজেলা ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। ধরাশায়ী হয়েছেন এমপি বলয়ের বাইরে যেসব আওয়ামী লীগ নেতা জনপ্রতিনিধি হওয়ার স্বপ্নে প্রার্থী হয়েছেন। এ ঘটনায় দলের দ্বন্দ্ব-কোন্দল প্রকাশ্য হওয়ার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যাবে বলেও মনে করা হচ্ছে।
বুধবার উপজেলার পরিষদ নির্বাচনের প্রথম ধাপে ১৩৯ উপজেলায় ভোট হয়েছে। ভোটের হার মাত্র ৩৬ দশমিক ১ শতাংশ। নির্বাচন কমিশন, ধান কাটার মৌসুমকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করার পাশাপাশি এটাও বলেছে, একটি বড় রাজনৈতিক দিল নির্বাচনে অংশ না নেওয়াও ভোটার উপস্থিতিতে প্রভাব ফেলেছে। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের মতো মাঠের বিরোধী দল বিএনপি উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বর্জন করে। তারা ভোট বর্জনের জন্য জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্নভাবে প্রচারও চালায়।
আওয়ামী লীগ এবার কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর কৌশল হিসেবে প্রতীকবিহীন নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। পাশাপাশি প্রার্থী বাড়াতে দলীয় সংসদ সদস্য (এমপি) ও মন্ত্রীদের স্বজনদের নির্বাচনে প্রার্থী না হতে নির্দেশনা দেয়। এ সিদ্ধান্তকে নীতিগত বলেও জানায় আওয়ামী লীগ। মন্ত্রী-এমপিদের স্বজনদের নির্বাচনের বাইরে রাখতে এবং নির্বাচনে তাদের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে একাধিকবার হুঁশিয়ার করেছে, নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু বুধবারের ভোটে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে জয়ী আওয়ামী লীগ নেতাদের বেশিরভাগই এমপি-মন্ত্রীদের স্বজন ও অনুসারী। ভোটে মাত্র দুজন এমপির স্বজন পরাজিত হয়েছেন। তাদের একজন হলেন টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীর হারুনুর রশীদ। তিনি স্থানীয় এমপি ও আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য আবদুর রাজ্জাকের খালাতো ভাই। মৌলভীবাজারের বড়লেখায় পরাজিত হয়েছেন স্থানীয় এমপি শাহাব উদ্দিনের ভাগ্নে সোয়েব আহমেদ।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবারের উপজেলা ভোটে বলার মতো অর্জন বা বিসর্জন কোনোটাই হয়নি। তবে কৌশল বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে আওয়ামী লীগ। তারা বলেন, যে কৌশলে প্রতীকবিহীন নির্বাচনের দিকে পথ চলেছে আওয়ামী লীগ সেই কৌশলও কাজ করেনি। কমপক্ষে ৫০ শতাংশ ভোট কাস্টিং করার কৌশল নিয়ে এগিয়ে ছিল আওয়ামী লীগ। আর ৪৫ শতাংশ ভোট কাস্ট হবে এমন ভাবনা ছিল ক্ষমতাসীন দলের। স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ায় ভোটে কোন দল গেল কি গেল না, সেটা তেমন প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করেছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু তাদের সেই অনুমান যে ঠিক ছিল ভোট পড়ার হার তার প্রমাণ।
ভোটের হার নিয়ে দলের ভেতরে অস্বস্তি থাকলেও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উপজেলার ভোট নিয়ে আপনাদের অনেক প্রশ্ন রয়েছে জানি। কোনো প্রশ্নেরই উত্তর দেব না। তবে ভোটের হার নিয়ে একটি কথাই বলব, আমরা মনে করি সন্তোষজনক ভোট কাস্ট হয়েছে।’
আওয়ামী লীগের আরেক সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পশ্চিমা যেসব দেশ ভোটের হার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তাদের দেশের সর্বশেষ নির্বাচনের ফল পর্যালোচনা করে দেখেন, প্লিজ।’
আওয়ামী লীগ দলীয় সূত্রমতে, মাঠের বিরোধী দল বিএনপিবিহীন এ উপজেলা ভোটে উৎসবের আমেজ সৃষ্টি করতে এবং ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে ও ভোট নিয়ে চলমান বিতর্ক দূর করতে মূলত দলীয় প্রতীক বরাদ্দ দেয়নি আওয়ামী লীগ। সূত্র জানায়, ভোট যেমনি হোক, ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি অন্তত ৪৫ শতাংশ হলে সব কৌশল সফল করা সম্ভব হতো। এ সূত্রগুলো আরও জানায়, দলের স্বস্তির জায়গা হলো সহিংসতামুক্ত নির্বাচন উপহার দিতে পারা।